তালাক নামায় সই করলে কয় তালাক পতিত হয়?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
১/ কাগজে সই করার দ্বারা কি তিন তালাক হবে? (কাগজে কোনো সংখ্যা উল্লেখ নেই। মেয়ে পক্ষ থেকে কাগজ দেওয়া হয়েছে) এবং জানা আছে এটা ডিভোর্স পেপার। তালাক দিতে বা*ধ্য হয়েছে। ছেলের সমস্যা তাই মেয়েপক্ষ জোর করেই নিয়েছে।
যদি সই করে মজলিস পরিবর্তন করার পর অন্য রুমে গিয়ে মুখে এক তালাক দেয়?
এমন অবস্থায় কয় তালাক ধর্তব্য হবে?
২/ ইদ্দত চলাকালীন এক জায়গায় অবস্থান করতে হয়। বর্তমানে সাধারণত বাবার বাড়িতে থাকে মেয়েরা।
কিন্তু কেউ যদি মাদ্রাসায় থাকা অবস্থায় তালাক হয়, এরপর মাদরাসার ছুটিতে কী বাড়ি যেতে পারবে? শুধু বন্ধের দিনগুলো বাড়িতে কাটিয়ে পুরো সময় মাদ্রাসায়?
(মাদ্রাসায় নিরাপত্তাহীনতার ভয় নেই। খাদেমারা থাকে)
অফলাইনে জিজ্ঞেস করার মতো পরিস্থিতি, সুযোগ নেই। কাছাকাছি নির্ভরযোগ্য আলেম নেই। তাই অনলাইনে জিজ্ঞেস করলাম।
অনুগ্রহ করে উত্তর দিলে কৃতজ্ঞ থাকবো।
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নটি দুটি ভাগে বিভক্ত। নিচে প্রতিটি অংশের বিস্তারিত জবাব দেওয়া হলো।
১. কাগজে সই ও মুখে তালাক দেওয়ার বিধান
কাগজে সই-এর মাধ্যমে কী তালাক পতিত হয়?
হানাফি মতে, যদি কোনো ব্যক্তি তালাকের কাগজে সই করে এবং সে জানে যে এটি তালাকের কাগজ, তাহলে তা দ্বারা তালাক পতিত হয়। তবে সংখ্যা উল্লেখ না থাকলে তা এক তালাক গণ্য হবে (ইমাম আবু হানিফার মতে)। যদি সই করার সময় তার নিয়ত থাকে যে তিন তালাক দিচ্ছে, তবে তিন তালাক হবে। কিন্তু যেহেতু প্রশ্নে সংখ্যা উল্লেখ নেই এবং কোনো নিয়তের কথা বলা হয়নি, তাই সাধারণত এক তালাকই পতিত হয়।
(সূত্র: রদ্দুল মুহতার ৩/২৭০; ফাতাওয়া হিন্দিয়্যা ১/৩৭২)
জোর-জবরদস্তির (ইকরাহ) কারণে তালাক কি পতিত হয়?
হানাফি ফিকহে জোর-জবরদস্তি (ইকরাহ) শুধু তখনই তালাককে বাতিল করে যখন তা প্রাণ বা অঙ্গহানির ভয়ে হয়। সাধারণ চাপ বা পারিবারিক জোর-জবরদস্তি (যেমন: স্ত্রীর পক্ষ থেকে কাগজ জোর করে নেওয়া) বৈধ ইকরাহ-এর অন্তর্ভুক্ত নয়। তাই এক্ষেত্রে তালাক পতিত হবে। তবে যদি সত্যিই প্রাণনাশের ভয় ছিল, তবে তালাক পতিত হবে না।
(সূত্র: ইমদাদুল ফাতাওয়া ২/৪২৫; ফাতাওয়া উসমানী ২/২৮০)
সই করার পর অন্য রুমে গিয়ে মুখে এক তালাক দেওয়া: কয় তালাক হবে?
- যদি সই দ্বারা এক তালাক পতিত হয় (যেহেতু সংখ্যা ও নিয়ত নেই), তাহলে পরে মুখে আরেক তালাক দেওয়া মোট দুই তালাক হবে।
- যদি সই করার সময় তার নিয়ত তিন তালাকের ছিল, তাহলে উপরন্তু মুখে এক তালাক দেওয়া কোনো প্রভাব ফেলবে না, কারণ তিন তালাক ইতিমধ্যে পতিত হয়েছে।
সতর্কতা: স্ত্রী যদি পূর্বে কোনো তালাক না পেয়ে থাকে, তবে দুই তালাক হওয়ার পর রজয়ী তালাক গণ্য হবে এবং ইদ্দত শেষে পুনরায় বিয়ে করা সম্ভব। কিন্তু তিন তালাক হয়ে গেলে পুনরায় বিয়ে হালাল হবে না (মহল্লা ছাড়া)।
সারসংক্ষেপ:
- কাগজে সই (নম্বর ছাড়া) = এক তালাক রজয়ী।
- পরে মুখে এক তালাক = আরেক তালাক। মোট দুই তালাক।
- জোর-জবরদস্তি প্রাণহানির পর্যায়ের না হলে তা শরয়ি ইকরাহ নয়, তাই তালাক পতিত হবে।
২. মাদ্রাসায় থাকা অবস্থায় তালাক হলে ইদ্দতের স্থান
ইদ্দতের সময় স্ত্রীর অবস্থান:
মূলত নিয়ম হলো ইদ্দতের সময় স্ত্রী স্বামীর বাসায় থাকবে।
প্রশ্নে উল্লেখিত ছুরতে স্ত্রী যদি বিয়ের পর স্বামীর বাড়িতেই না গিয়ে থাকে,বরং মাদ্রাসাতেই থাকে,স্বামীর সাথে নিজের বাবার বাসায় সময় কাটায়,সেক্ষেত্রে উক্ত স্ত্রী মাদ্রাসায় ইদ্দত পালন করতে পারবে।
তবে যদি সে নিরাপত্তাহীনতা বা অন্য কোনো বৈধ শরয়ি ওজর (যেমন: ঘর ভাড়া হয়ে যাওয়া, সঙ্গীদের মধ্যে পাপাচার ইত্যাদি) থাকে, তবে সে অন্য জায়গায় যেতে পারে।
প্রশ্নে মাদ্রাসা নিরাপদ এবং খাদেমা আছে, অর্থাৎ নিরাপত্তাহীনতার ভয় নেই। তাই এই অবস্থায় স্ত্রী ইদ্দত পুরোটা মাদ্রাসায় কাটাবে। ছুটির দিনে বাপের বাড়ি যাওয়া জায়েজ হবে না, কারণ ইদ্দতে বাড়ি থেকে বের হওয়া শুধু প্রয়োজনে (যেমন: চিকিৎসা, জরুরি কাজ) অনুমোদিত। বিনা প্রয়োজনে বাইরে যাওয়া গুনাহ এবং ইদ্দতের হুকুম লঙ্ঘন।
হ্যাঁ, নিম্নলিখিত ক্ষেত্রে বাড়ি যেতে পারবে:
১. যদি মাদ্রাসায় তার থাকা নিরাপদ না হয় (যা আপনি বলছেন না)।
২. যদি তার বাপের বাড়ি তালাকের সময়ের বাসস্থান হয় (অর্থাৎ সে মাদ্রাসায় থাকাকালীন তার স্থায়ী বাসা বাপের বাড়ি হলেই কেবল সেখানে ইদ্দত পালন করবে)। কিন্তু যেহেতু সে মাদ্রাসায় থাকাকালীন তালাক হয়েছে, তাই মাদ্রাসাই তার ইদ্দতের স্থান।
(সূত্র: রদ্দুল মুহতার ৩/৫৩৮; বেহেশতি জেওর ২/৩৪)
সারসংক্ষেপ:
- মাদ্রাসায় নিরাপত্তা থাকলে পুরো ইদ্দত সেখানেই কাটাতে হবে।
- ছুটির দিনে বাপের বাড়ি যাওয়া অনুমোদিত নয়, যদি না কোনো জরুরি প্রয়োজন হয় (যেমন: অভিভাবকের অসুস্থতা) এবং তা স্বল্প সময়ের জন্য হয়।
ফতওয়া উসমানী, ইমদাদুল ফাতাওয়া, রদ্দুল মুহতার ও ফাতাওয়া হিন্দিয়্যার আলোকে উত্তর প্রদান করা হলো।
যদি বাস্তব অবস্থা ভিন্ন হয় (যেমন: জোর-জবরদস্তি প্রাণহানির পর্যায়ের ছিল), তবে স্থানীয় কোনো আলেমের শরণাপন্ন হওয়া উত্তম।
والله أعلم بالصواب