তালাক দিবো বললে তালাক হয়?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
দয়া করে আমাকে কোনো বিভ্রান্তির মধ্যে না রেখে সুন্দর করে বুঝিয়ে বলবেন ।
জবাব টা আহেল হাদীস ও হানাফী দুই মত অনুযায়ী ই বলবেন।
1.একদিন তর্ক বিতর্ক হচ্ছিল তখন আমি তাকে রেগে বলি আমি তোমাকে ডিভোর্স দিবো । এবং বলি তুমি আমাকে ডিভোর্স দিবা কি?" তোমার বাড়ির লোকের সাতে কথা বলব ??
*যেহেতু আমি বলেছি ডিভোর্স দিবো* । এটা ভবিষ্যৎ সূচক বাক্য এর দরুন কোনো সমস্যা নেই নিয়ত থেকেও হবে না । কারণ বাক্য টা ভবিষ্যৎ সূচক।
*তুমি আমাকে ডিভোর্স দিবা কি* । এই কথা স্ত্রী কে জিজ্ঞাসা করেছি স্ত্রী তখন কোনো কথাই বলেনি এই বিষয় এ।
:-এই 1 নম্বর প্রশ্নটিতে আমার নিয়ত ছিল, আমি রেগে গিয়েছিলাম এবং ভেবেছিলাম ডিভোর্স দিবো। এবং স্ত্রী কেও সেই জন্য জিজ্ঞাসা করেছিলাম সেও দিবে কিনা। কিন্তু সে কোনো কথা বলেনি এই বিষয় এ।
২.তারপর ফোনে একদিন ঝামেলা হচ্ছিলো আমি বলি ""*তোমার আমাকে নিয়ে সমস্যা হলে এক্ষনি ছাড় পত্র করে নাও, প্রয়োজন এ তোমার বাড়ির লোকের সাতে কথা বলো।****"""
তারপর কিছুক্ষণ পরে রেগে গিয়ে এক তালাক বলেছিলাম তাকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য কারণ আমি জানতাম তিন বার বললে তালাক হয় জানতাম না একবার বললেও হয় ।
:- এই ক্ষেত্রে আমার নিয়ত ছিল এমন যে স্ত্রী বেশি বলছে যা আমার ভালো লাগছিল না কারণ সে তার প্রবলেম দেখাচ্ছিল তাই আমি রেগে *তোমার আমাকে নিয়ে সমস্যা হলে এক্ষনি ছাড় পত্র করে নাও, প্রয়োজন এ তোমার বাড়ির লোকের সাতে কথা বলো।****""" এই কথা টা বলেছি। আসলে আমার নিয়ত এমন যে , স্ত্রী যদি ভাবে যে ডিভোর্স করতে হবে তাহলে আমিও ডিভোর্স করে নিবো। আমি ভেবেছিলাম আমি কিছু করব না , স্ত্রীর সমস্যা হলে সে করে নেক।
আমার মনের ভাবনা আমি ও ডিভোর্স দিবো। সে ডিভোর্স নিয়ে চাইলে আমার কোনো আপত্তি থাকবে না, আমি ডিভোর্স দিয়ে দিবো। কিন্তু ওই কথা বলার দরুন তাৎক্ষণিক তালাক হবে এমন কোনো নিয়ত ছিল না। আরও একটি কথা আমি ভেবেছি আমি ডিভোর্স দিবো ।
জানতে চাইছি আমার কি কোনো অতিরিক্ত তালাক হয়েছে আমার উক্ত কথা বলার জন্য। আর আমার নিয়ত এর বিষয় টা কি বোঝায় ? কোনো তালাক হবে ?
আমাকে আহেল হাদীস ও হানাফী মত অনুযায়ী সমস্ত দিক টা বলো।
**** আর একটি বিশেষ কথা আমার কি কোনো মুফতি আর মুফতি জানার দরকার আছে এইখানে ফতোয়া নেওয়ার পর।
*** আমাকে নিয়ে সমস্যা হলে ছাড় ফার করে নাও উক্ত কথার জন্য কি স্ত্রী তালাকের অধিকার পাবে??
দয়া করে বিষয় টা সহণভূতি এর সঙ্গে বিষয় টা দেখে ভালো ভাবে দুই মত অনুযায়ী জবাব দিয়েন, আহেল হাদীস ও হানাফী মত অনুযায়ী। ভেঙে ভেঙে দুই মত অনুযায়ী জবাব দিয়েন ।
আমাকে আর কোনো মুফতির কাছে যাওয়ার দরকার আছে?
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
উত্তর প্রদানে: আমি আপনার পুরো ঘটনা মনোযোগ সহকারে পড়েছি এবং আপনার প্রতিটি বক্তব্য ও নিয়ত বিশ্লেষণ করেছি। নিচে হানাফী ও আহলে হাদীস (সালাফী) উভয় মাজহাব অনুযায়ী পরিষ্কারভাবে উত্তর দেওয়া হলো।
➤ প্রথম ঘটনা (তর্কের সময়):
“আমি তোমাকে ডিভোর্স দিবো” (ভবিষ্যৎ সূচক)
“তুমি আমাকে ডিভোর্স দিবা কি?” (প্রশ্ন)
“তোমার বাড়ির লোকের সাথে কথা বলব?” (প্রশ্ন)
● হানাফী মত:
- “দিবো” (سأطلقك) ভবিষ্যৎ সূচক বাক্য। এটি তালাক নয়, যতক্ষণ না তাৎক্ষণিক তালাকের নিয়ত থাকে। আপনি নিয়ত করেননি তাৎক্ষণিক তালাকের, বরং ভেবেছিলেন ভবিষ্যতে দিবেন। তাই এখানে কোনো তালাক হয় না।
(রদ্দুল মুহতার, ৩/২৭২; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৭২) - “তুমি আমাকে ডিভোর্স দিবা কি?” – এটি স্ত্রীকে প্রশ্ন, তালাক নয়। স্ত্রী কিছু বলেননি, তাই কিছুই হয়নি।
- “তোমার বাড়ির লোকের সাথে কথা বলব?” – এটিও প্রশ্ন বা পরামর্শ, তালাকের স্পষ্ট শব্দ নয়।
সিদ্ধান্ত: প্রথম ঘটনায় কোনো তালাক হয়নি।
● আহলে হাদীস (সালাফী) মত:
- সালাফী ফিকহেও ভবিষ্যৎ সূচক বাক্য তালাক গণ্য হয় না, যতক্ষণ না স্পষ্টভাবে ‘তালাক’ বলা হয় বা নিয়তে তাৎক্ষণিকতা থাকে।
(ইবনে কুদামা, আল-মুগনী, ৭/২৬২; ফাতাওয়া লাজনা দায়িমা, ২০/১৬১) - প্রশ্ন ও পরামর্শমূলক বাক্য তালাক নয়।
সিদ্ধান্ত: কোনো তালাক হয়নি।
➤ দ্বিতীয় ঘটনা (ফোনে ঝামেলা):
“তোমার আমাকে নিয়ে সমস্যা হলে এক্ষনি ছাড় পত্র করে নাও, প্রয়োজন এ তোমার বাড়ির লোকের সাথে কথা বলো।”
● হানাফী মত:
- “ছাড় পত্র করে নাও” – এটি স্পষ্ট তালাকের শব্দ নয়। বরং এটি একটি নির্দেশ/অনুমতি যে “তুমি চাইলে ডিভোর্স নিয়ে নাও” (তালাকের অধিকার দেওয়া) – কিন্তু শর্ত হলো: যদি স্বামী তাকে তালাকের মালিকানা (তাফবীয) দেওয়ার নিয়ত করেন, তাহলে স্ত্রী সেই মজলিসে নিজেকে তালাক দিলে এক তালাক হয়। কিন্তু আপনি বলেছেন, আপনার নিয়ত ছিল: “যদি স্ত্রী মনে করে ডিভোর্স করতে হবে, তাহলে আমি ডিভোর্স দিয়ে দিবো – স্ত্রী যা করবে”। অর্থাৎ আপনি তাকে তালাকের মালিকানা দেননি, বরং বলেছেন সে চাইলে তালাক নিতে পারে (তবে আপনি নিজে দেবেন)। এ ধরনের বাক্য দ্বারা তাফবীয হয় না।
(রদ্দুল মুহতার, ৩/৩০১; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৭৮) - আর স্ত্রী কোনো উত্তর না দেওয়ায় কোনো তালাক হয় না।
- গুরুত্বপূর্ণ: এই বাক্য দ্বারা স্ত্রী তালাকের অধিকার পায় না। কারণ আপনি তাকে ‘তালাক দেওয়ার মালিকানা’ প্রদান করেননি। এটি কেবল একটি কথার মাধ্যমে ইঙ্গিত করেছেন যে তার ইচ্ছা থাকলে আপনি দেবেন, কিন্তু তা তাফবীয নয়।
● আহলে হাদীস মত:
- সালাফী ফিকহেও “ছাড় পত্র করে নাও” তাফবীয হিসেবে গণ্য হবে যদি স্বামী তা উদ্দেশ্য করে। কিন্তু যেহেতু আপনার উদ্দেশ্য ছিল “যদি সে চায় তাহলে আমি দেব” – এটি তাফবীয নয়। বরং ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি। তাই স্ত্রীর কোনো অধিকার সৃষ্টি হয় না।
(শারহুল মুমতি’, ৫/৪৫০; ফাতাওয়া ইবনে বায, ২১/২৬৫) - সুতরাং স্ত্রী তালাকের অধিকার পাবে না।
➤ “এক তালাক” বলার ঘটনা:
“রেগে গিয়ে এক তালাক বলেছিলাম তাকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য কারণ আমি জানতাম তিন বার বললে তালাক হয় জানতাম না একবার বললেও হয়।”
● হানাফী মত:
- এক তালাক স্পষ্ট ও সুস্পষ্ট তালাকের শব্দ। রাগ অবস্থায় বললেও, যতক্ষণ না ব্যক্তি জ্ঞান হারান (পাগল বা অচেতন না হন), তালাক পতিত হয়। আপনি শিক্ষা দেওয়ার জন্য বলেছেন, কিন্তু তালাকের শব্দ উচ্চারণ করেছেন। শুধু ‘একবার হলেও তালাক হয়’ এটা না জানা তালাক পড়াকে রোধ করে না।
(ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৫৫; রদ্দুল মুহতার, ৩/২৪৫) - ফল: এক তালাকে বায়েন (রাজ‘ঈ) তালাক পতিত হয়েছে। অর্থাৎ আপনি আপনার স্ত্রীকে এক তালাক দিয়েছেন। এই তালাক রাজ‘ঈ (ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ আছে)। ইদ্দতের (তিন মাসিক বা তিন মাস) মধ্যে আপনি স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারেন (মৌখিকভাবে বা সহবাসের মাধ্যমে) অন্য কোনো তালাকের প্রয়োজন নেই। ইদ্দত পার হলে তালাক পূর্ণ হবে এবং পুনরায় নতুন নিকাহ করতে হবে।
● আহলে হাদীস মত:
- সালাফী ফিকহেও এক তালাক স্পষ্ট উচ্চারণে পতিত হয়। রাগ বা অজ্ঞতা তালাক পড়াকে বাঁধা দেয় না (যতক্ষণ মানুষ সজ্ঞান ছিল)।
(ফাতাওয়া লাজনা দায়িমা, ২০/৮৮; ইবনে কুদামা, ৭/৩৭২) - ফল: এক তালাক পতিত হয়েছে, যা রাজ‘ঈ (ইদ্দতের মধ্যে ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ)।
➤ আপনার নিয়ত সম্পর্কে যা বুঝায়:
- আপনি লিখেছেন: “আমার মনের ভাবনা আমি ও ডিভোর্স দিবো। সে ডিভোর্স নিয়ে চাইলে আমার কোনো আপত্তি থাকবে না, আমি ডিভোর্স দিয়ে দিবো। কিন্তু ওই কথা বলার দরুন তাৎক্ষণিক তালাক হবে এমন কোনো নিয়ত ছিল না।”
হানাফী ও সালাফী উভয় মতে: নিয়ত শুধুমাত্র অস্পষ্ট বাক্যের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে। কিন্তু “এক তালাক” স্পষ্ট শব্দ – এতে নিয়তের প্রয়োজন হয় না। তাই আপনি তাৎক্ষণিক তালাক না চাইলেও তালাক পতিত হয়েছে। তবে আগের “ছাড় পত্র করে নাও” বাক্যটিতে নিয়ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনার নিয়ত ছিল যে স্ত্রী চাইলে আপনি দেবেন – এটি তাকে তালাকের মালিকানা দেয় না, তাই ওই বাক্যে তালাক হয়নি।
➤ “আমাকে নিয়ে সমস্যা হলে ছাড় ফার করে নাও” – এতে স্ত্রী কি তালাকের অধিকার পাবে?
● হানাফী ও আহলে হাদীস উভয় মতেই:
- না, পাবে না। কারণ:
- আপনি তাকে তালাকের মালিকানা (তাফবীয) দেননি। বরং বলেছেন, “যদি সমস্যা হয় তবে তুমি তালাক নিয়ে নাও” – এটি একটি অনুমতি বা পরামর্শ মাত্র।
- তালাকের অধিকার পেতে হলে স্পষ্টভাবে বলতে হবে: “তোমার ইচ্ছা হলে নিজেকে তালাক দাও” অথবা “আমি তোমাকে তালাকের মালিকানা দিলাম”। আপনার বাক্যে তা নেই।
- তাই স্ত্রী নিজ থেকে তালাক দিতে পারবে না। শুধু আপনার দেওয়া তালাক (এক তালাক) কার্যকর হয়েছে।
➤ আপনার প্রশ্ন: “আমাকে আর কোনো মুফতির কাছে যাওয়ার দরকার আছে?”
- হ্যাঁ, প্রয়োজন আছে। কারণ:
- এই ফতোয়া অনলাইনে দেওয়া হচ্ছে, যা সাধারণ জ্ঞান ও গ্রন্থের ভিত্তিতে। কিন্তু আপনার অবস্থান, স্থানীয় হানাফী আলেম বা মুফতি সরাসরি আপনার সাথে বসে সব খুঁটিনাটি (যেমন রাগের মাত্রা, শারীরিক অবস্থা) যাচাই করতে পারবেন।
- তালাকের মাসআলা অত্যন্ত স্পর্শকাতর। তাই স্থানীয় কোনো আলেম বা মুফতির কাছে সরাসরি গিয়ে বিস্তারিত বলুন এবং তার কাছ থেকে ফতোয়া নিন। তিনি আপনার অবস্থা বুঝে আরও নির্ভুল সিদ্ধান্ত দিতে পারবেন।
- বিশেষ করে ‘এক তালাক’ বলার ক্ষেত্রে আপনি যদি রাগে এমন ছিলেন যে আপনার উপর নিয়ন্ত্রণ ছিল না (প্রায় পাগলের মতো), তবে কোনো কোনো হানাফী ফতোয়ায় তালাক না হওয়ার সম্ভাবনাও আছে। সুতরাং সরাসরি আলেমের শরণাপন্ন হোন।
➤ সংক্ষিপ্ত সিদ্ধান্ত (সারসংক্ষেপ):
| ঘটনা | হানাফী | আহলে হাদীস | |-------|--------|-------------| | ১. ভবিষ্যৎ সূচক “দিবো” | তালাক হয়নি | তালাক হয়নি | | ২. “ছাড় পত্র করে নাও” | তালাক হয়নি, স্ত্রীর অধিকার তৈরি হয়নি | একই | | ৩. “এক তালাক” | এক তালাকে রাজ‘ঈ পতিত হয়েছে | এক তালাক পতিত | | ৪. স্ত্রী কি তালাকের অধিকার পাবে? | না | না |
➤ বর্তমান অবস্থা:
আপনি আপনার স্ত্রীকে এক তালাক দিয়েছেন। এটি রাজ‘ঈ তালাক। আপনি ইচ্ছা করলে ইদ্দতের (তিন মাসিক বা তিন মাস) মধ্যে তাকে ফিরিয়ে নিতে পারেন (মৌখিকভাবে বলবেন: “আমি তোমাকে ফিরিয়ে নিলাম” অথবা সহবাস করলেই ফিরিয়ে নেওয়া হয়)। এরপর আর কোনো তালাকের প্রয়োজন নেই। ইদ্দত পার হলে তালাক চূড়ান্ত হবে এবং পুনরায় নিকাহ করতে হবে (নতুন মোহর ও সম্মতি)।
সতর্কতা: এখন থেকে তালাকের শব্দ ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন। পরিবারের সাথে শান্তিপূর্ণ সমাধান করুন।
وَاللهُ أَعْلَمُ بالصواب
আপনার জন্য পরামর্শ:
অনুগ্রহ করে আপনার নিকটবর্তী কোনো বিশ্বস্ত মুফতি বা ইসলামিক স্কলারের কাছে সরাসরি যান এবং পুরো ঘটনা খুলে বলুন। তিনি আপনার রাগের প্রকৃতি ও স্থানীয় রীতি অনুযায়ী চূড়ান্ত ফতোয়া দেবেন।