স্বামি দায়িত্ব নেওয়ার শর্ত দিতে পারে
Marriage and Divorce · Ahle Hadith / Salafi
Question
Answer
প্রশ্ন: কোনো স্বামী যদি স্ত্রীর দায়িত্ব (খোরপোষ, ভরণপোষণ ইত্যাদি) নিতে অস্বীকার করে এবং শর্ত দেয় যে, সে যদি তার বাবা-মায়ের সাথে কথা বলে তাহলে সে দায়িত্ব নেবে না, অন্যথায় নেবে— তাহলে দায়িত্ব না নেওয়ার জন্য এই শর্ত কতটা যুক্তিপূর্ণ?
উত্তর:
এই শর্ত সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য (বাতিল) এবং ইসলামী শরিয়তের পরিপন্থী। নিম্নে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উল্লেখ করা হলো:
১. স্বামীর উপর স্ত্রীর ভরণপোষণ ফরজ
স্বামীর জন্য তার স্ত্রীর খোরপোষ, বাসস্থান ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় দায়িত্ব পালন করা ওয়াজিব। আল্লাহ বলেন:
"আর যাদের সন্তান আছে, তাদের কর্তব্য হল মা'কে যথাযথভাবে খোরপোষ ও পোশাক প্রদান করা।" (সূরা বাকারা: ২৩৩)
এছাড়া রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: "তোমাদের উপর তাদের (স্ত্রীদের) খোরপোষ ও পোশাক প্রদান করা ন্যায়সংগতভাবে ওয়াজিব।" (সহীহ মুসলিম: ১২১৮)
এ দায়িত্ব কোনো শর্তের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং এটি স্বামীর উপর আল্লাহর হক ও স্ত্রীর অধিকার।
২. শর্তের বৈধতা সম্পর্কে ইসলামী নীতি
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: "মুসলিমরা তাদের শর্তের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে, তবে যে শর্ত হারামকে হালাল করে বা হালালকে হারাম করে তা ব্যতীত।" (সুনানে আবু দাউদ: ৩৫৯৪, তিরমিযি: ১৩৫২, আলবানী সহীহ বলেছেন)
উক্ত শর্তটি স্ত্রীকে তার পিতা-মাতার সাথে কথা বলা থেকে বিরত রাখছে, অথচ পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ ও সম্পর্ক রক্ষা করা ইসলামে ফরজ (সুরা বাকারা: ৮৩, সুরা নিসা: ৩৬) এবং তা হালাল ও মুস্তাহাব। তাই এটি একটি হারাম কাজকে উৎসাহিত করে এবং হালালকে বাধা দেয়— ফলে শর্তটি বাতিল।
৩. ইমাম ও প্রসিদ্ধ আলেমদের মতামত
- শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেছেন: "প্রত্যেক শর্ত যা আল্লাহর কিতাবের বিপরীত, তা বাতিল।" (মাজমু‘ ফাতাওয়া: ৩১/২৪৫)
- ইমাম ইবনুল কাইয়িম (রহ.) বলেছেন: "স্বামী যদি স্ত্রীর ওপর এমন শর্ত আরোপ করে যা শরিয়তসম্মত নয়, তবে সেই শর্ত পূরণ করা ওয়াজিব নয়; বরং স্ত্রী তার অধিকার পাবেন।" (ই‘লামুল মুওয়াক্কিঈন: ২/৫৩)
- শাইখ ইবন বায (রহ.)-এর ফতোয়া: স্বামীর জন্য স্ত্রীকে তার পিতা-মাতার সাথে যোগাযোগ থেকে নিষেধ করা জায়েজ নয়, যদি না তা দ্বীনি কোনো ক্ষতি ডেকে আনে। শুধু কথা বলার কারণে ভরণপোষণ বন্ধ করা জুলুম। (মাজমু‘ ফাতাওয়া ইবন বায: ২১/৩২৫)
- শাইখ আলবানী (রহ.) বলেছেন: "স্ত্রী তার পিতা-মাতার সাথে সম্পর্ক রাখতে পারে এবং স্বামী এর জন্য তাকে শাস্তি দিতে পারে না বা খোরপোষ বন্ধ করতে পারে না।" (আসাসুল সুন্নাহ)
- শাইখ ইবন উসাইমীন (রহ.) বলেছেন: "যদি স্বামী শর্ত দেয় যে স্ত্রী তার পরিবারের সাথে কথা বলবে না, এটি হারাম শর্ত; কারণ এর মাধ্যমে আত্মীয়তা ছিন্ন করা হয় যা হারাম। স্ত্রী এ শর্ত মেনে চলতে বাধ্য নয়, এবং স্বামী তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে স্ত্রী তার অধিকার আদায়ের জন্য বিচার চাইতে পারে।" (লিকা‘আতুল বাব আল-মাফতুহ: ৪৫/২২)
- শাইখ সালেহ আল-ফাওজান (হাফি.) বলেছেন: "স্ত্রীর পিতা-মাতার সাথে সাক্ষাৎ ও কথা বলা জায়েজ, যতক্ষণ না তা স্বামীর অধিকার ও ঘরের শান্তি বিনষ্ট করে। স্বামী এজন্য খোরপোষ বন্ধ করতে পারে না।" (আল-মুনতাকা মিন ফাতাওয়া আল-ফাওজান: ২/২৭৪)
৪. দায়িত্ব না নেওয়ার যৌক্তিকতা
স্বামীর উল্লিখিত শর্ত শরিয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং জুলুম। স্ত্রী তার পিতা-মাতার সাথে কথা বললে তা বৈধ, বরং মুস্তাহাব (উত্তম) পর্যন্ত হতে পারে। তাই স্বামী এই অজুহাতে দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারে না। তিনি যদি তবুও দায়িত্ব না নেন, তাহলে স্ত্রী ইসলামী বিচারকের (কাজী) নিকট ফরজে যেতে পারে এবং স্বামীকে আদায় করতে বাধ্য করা হবে।
সারসংক্ষেপ
- উক্ত শর্ত বাতিল ও শরিয়তবিরোধী।
- স্বামীকে অবশ্যই স্ত্রীর ভরণপোষণ দিতে হবে, তার পিতা-মাতার সাথে কথা বলার কারণে তা থামানো যাবে না।
- স্ত্রীর অধিকার সুরক্ষিত রাখতে সাহাবা ও তাবিয়ীনগণ জোর দিয়েছেন। ইমাম মালিক (রহ.) বলেন: "স্ত্রী স্বামীর না চাইলেও তার পিতা-মাতার সাথে দেখা করতে পারে, যদি তা স্বামীর কোনো ক্ষতি না করে।"
- অতএব, স্বামীর এই আচরণ বৈধ নয় এবং তিনি তার দায়িত্ব এড়াতে পারেন না।
সুপারিশ: স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই উচিত আল্লাহর বিধান অনুযায়ী জীবনযাপন করা এবং পারস্পরিক সহানুভূতি ও সম্মানের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলা। স্ত্রীর পিতা-মাতার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা ইসলামে নিষিদ্ধ (সূরা মুহাম্মাদ: ২২-২৩)।