বিয়ে বৈধ হওয়ার শর্ত কি? বিস্তারিত জানতে চাই।
Marriage and Divorce · Ahle Hadith / Salafi
Question
Answer
বিবাহ বৈধ হওয়ার শর্ত ও সংশ্লিষ্ট মাসায়েল
বিবাহ বৈধ হওয়ার শর্তসমূহ
আহলে হাদীস / সালাফী ফিকহ অনুযায়ী বিবাহ বৈধ হওয়ার জন্য নিম্নোক্ত শর্তসমূহ আবশ্যক:
১. উভয় পক্ষের সম্মতি - বর ও কনের ইচ্ছা ও সম্মতি থাকতে হবে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: "বিবাহিত নারীকে তার অনুমতি ব্যতিরেকে বিবাহ দেওয়া যাবে না, আর কুমারীকে তার অনুমতি নিতে হবে।" (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫১৩৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৪১৯)
২. অভিভাবকের উপস্থিতি (ولي) - নারীর অভিভাবক ছাড়া বিবাহ বৈধ নয়। রাসূল (ﷺ) বলেছেন: "যে নারী অভিভাবক ছাড়া বিবাহ করে, তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল।" (সুনানে তিরমিযী, হাদীস: ১১০১; আবু দাউদ, হাদীস: ২০৮৩ - শায়খ আলবানী সহীহ বলেছেন)
৩. দুইজন সাক্ষী - বিবাহের সময় সুবিচারক (عدل) দুইজন মুসলিম পুরুষ সাক্ষী থাকতে হবে। ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত: "বিবাহ সুসম্পন্ন হয় অভিভাবক, দুইজন সাক্ষী ও মোহরের মাধ্যমে।" (মুস্তাদরাক হাকিম, হাদীস: ২৭৪৭; সহীহ ইবনু হিব্বান, হাদীস: ৪০৭৪)
৪. ইজাব (প্রস্তাব) ও কবুল (গ্রহণ) - বিবাহের প্রস্তাব ও তা গ্রহণ করতে হবে। এটি সাধারণত ماضى (অতীতকাল) বা مستقبل (ভবিষ্যৎকাল) শব্দে সম্পন্ন হতে পারে, তবে মজলিস একত্রিত থাকতে হবে। ইমাম ইবনু তাইমিয়্যা (রহঃ) বলেন: "বিবাহের ইজাব ও কবুল বিবাহের অপরিহার্য অংশ, যা মৌখিকভাবে সম্পন্ন করতে হবে।" (মাজমু' ফাতাওয়া, ৩২/৪৭)
৫. মোহর (مهر) - বরকে কনেকে মোহর দিতে হবে। আল্লাহ বলেন: "আর তোমরা নারীদেরকে তাদের মোহর সন্তুষ্টচিত্তে দিয়ে দাও।" (সূরা আন-নিসা, ৪:৪)
"বিবাহ করার উদ্দেশ্য না থাকলে কবুল বলা" - এ বিষয়ে বিধান
যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে বিবাহের শর্ত পূরণের সময় (ইজাব-কবুলের সময়) মনে মনে বিবাহ না করার সংকল্প রাখে, তাহলে এটি বিবাহের বৈধতাকে প্রভাবিত করে না, যদি বাহ্যিকভাবে বিবাহের শর্তসমূহ পূর্ণ হয়। কেননা ইসলামী দৃষ্টিতে বিবাহের বৈধতা নির্ধারিত হয় বাহ্যিক আমল ও শব্দের ওপর ভিত্তি করে, অন্তরের নিয়তের ওপর নয়। যেমন আল্লাহ বলেন: "তোমরা কি তাদেরকে বিবাহ করবে না, যদিও তারা ঈমান এনেছে?" (সূরা আল-মুমতাহিনা, ৬০:১০)
তবে এটি একটি প্রতারণামূলক কাজ ও গুনাহ, যা থেকে তাওবা ওয়াজিব। শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যা (রহঃ) বলেন: "ইসলামী আইনে বিবাহের চুক্তির বৈধতা নির্ধারিত হয় বাহ্যিক শর্ত পূরণের ওপর, অন্তরের ইচ্ছা বা উদ্দেশ্যের ওপর নয়। তবে প্রতারণা বা মিথ্যা উদ্দেশ্য থাকলে তা গুনাহ।" (মাজমু' ফাতাওয়া, ২৯/২২৬)
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ) আরও বলেন: "শরীয়তে বিবাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি শুধুমাত্র বাহ্যিক শর্ত পূরণের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়... যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে বিবাহের নিয়ত না করেও শর্তপূর্ণ করে, তবুও বিবাহ বৈধ হবে, তবে তার এই প্রতারণা গুনাহ।" (ই'লামুল মুওয়াক্কিঈন, ৩/১০২)
বিয়ের কাগজ ছিড়ে ফেললে কি বিবাহ বহাল থাকে?
জ্বী, বিবাহের কাগজ (marriage certificate/document) ছিড়ে ফেললে বা ধ্বংস করলে শারীরিক বিবাহ বাতিল হয় না। বিবাহ একটি আইনগত চুক্তি (عقد), যা মৌখিকভাবে সম্পন্ন হয় এবং সাক্ষীদের উপস্থিতিতে শর্ত পূরণ করে সুসম্পন্ন হয়। কাগজপত্র শুধু নথি বা প্রমাণ হিসাবে কাজ করে। আল্লাহ বলেন: "আর তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না।" (সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৮)
শায়খ আব্দুল আজিজ বিন বায (রহঃ) বলেন: "বিবাহের কাগজ ছিড়ে ফেলা বা পুড়িয়ে ফেলা বিবাহকে বাতিল করে না। বিবাহ ততক্ষণ বলবৎ থাকে যতক্ষণ না তালাক বা ফাসখের মাধ্যমে বিচ্ছেদ ঘটে। শুধু কাগজ নষ্ট করা বিবাহ বাতিলের কারণ নয়।" (মাজমু' ফাতাওয়া ইবন বায, ২১/২৬১)
ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালেহ আল-উসাইমীন (রহঃ) বলেন: "বিবাহের দলিল কেবল একটি নথি, তা ধ্বংস করলে বিবাহের চুক্তি নষ্ট হয় না। বিবাহের চুক্তি ততক্ষণ বলবৎ থাকে যতক্ষণ না শরয়ী পদ্ধতিতে তালাক, ফাসখ বা মৃত্যু না ঘটে।" (ফাতাওয়া নূরুন আলাদ-দার্ব, ১৮/৩৬৭)
সারসংক্ষেপ
১. বিবাহ বৈধ হওয়ার শর্ত: অভিভাবক, দুই সাক্ষী, ইজাব-কবুল ও মোহর। ২. বিবাহের নিয়ত না থাকলে: বাহ্যিক ইজাব-কবুল সম্পন্ন হলে বিবাহ বৈধ হবে, কিন্তু প্রতারণার কারণে গুনাহ হবে এবং তাওবা করা ওয়াজিব। ৩. বিবাহের কাগজ ছিড়ে ফেললে: বিবাহ বহাল থাকবে। বিবাহ বাতিল করতে হলে তালাক, ফাসখ বা শরয়ী পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।