বেবি শাওয়ার কি ইসলামে জায়েজ?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
কোন দিন,মাস কিংবা নির্দিষ্ট যে সময় রিচুয়াল মেইন না করে করা যাবে?
এমনি বেবি শাওয়ারে কোন সাংঘর্ষিক এক্টিভিটি নেই শুধু মাত্র আত্মীয় স্বজনেরা আসে হাদিয়া নিয়ে নতুন মা কে দেখতে, এই উপলক্ষে খাওয়া দাওয়ার আয়োজন হবে ছোট পরিসরে যেখানে গান বাজনা হবেনা কিংবা হারাম কিছু হবেনা।
২. মা কে ভালোবেসে যদি ছোট একটা ইনডোর আয়োজন করা হয় যেখানে কয়েক পদের খাবার মায়ের সামনে আনা হয় এটা কি জায়েজ? হিন্দুদের সাধের সাথে এটার মিল নেই, তারা তো টিকা লাগায় ও পূজা করে। এটা করা হবে মায়ের কোন খাবার খাওয়ার ইচ্ছে থাকলে তার সামনে সবটা এনে তাকে ভালোবাসা প্রদর্শন।
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
উত্তর:
প্রশ্নে বর্ণিত ‘বেবি শাওয়ার’ (সন্তান জন্মের আগে বা পরে আত্মীয়স্বজনদের মিলন ও হাদিয়া প্রদানের অনুষ্ঠান) ইসলামী শরী‘আতের দৃষ্টিতে জায়েজ কিনা, তা নির্ভর করে এর আয়োজনের পদ্ধতি ও নিয়তের উপর। নিচে বিস্তারিত ফতোয়া প্রদান করা হলো।
১. বেবি শাওয়ারের মূল বিধান
ইসলামে সন্তান জন্মের পর ‘আকীকা’ করানো সুন্নত, যা সপ্তম দিনে বা পরে করা যায়। কিন্তু বেবি শাওয়ার নামে কোনো নির্দিষ্ট ইবাদত বা রীতির অস্তিত্ব নেই। তবে আত্মীয়স্বজনদের একত্রিত হয়ে নবজাতকের মা-বাবাকে অভিনন্দন জানানো, হাদিয়া দেওয়া, এবং খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করা যদি নিম্নোক্ত শর্তে হয় তবে তা জায়েজ:
- কোনো নির্ধারিত দিন, মাস বা সময় বাধ্যতামূলক না করা (যেমন ‘চাঁদ রাত’, ‘শনিবার’ ইত্যাদি)।
- রিচুয়াল বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের রূপ না দেওয়া (যেমন নির্দিষ্ট কোনো মন্ত্র পড়া, আগুন জ্বালানো, ইত্যাদি)।
- হারাম কাজ থেকে বিরত থাকা: গান-বাজনা, নাচ, মেয়ে-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, অপচয় ও অহেতুক খরচ।
- হিন্দু বা অন্য ধর্মের রীতির সাথে সাদৃশ্য না রাখা (যেমন টিকা লাগানো, পূজা অর্চনা ইত্যাদি)।
এই শর্তগুলো পূরণ করলে সাধারণ সাক্ষাৎ ও হাদিয়া বিনিময় জায়েজ। তবে এটাকে ‘সুন্নত’ বা ‘ওয়াজিব’ মনে করা যাবে না এবং এতে গুনাহের কাজ থাকলে তা নাজায়েজ হবে।
হানাফী কিতাবের উদ্ধৃতি:
ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) ‘রদ্দুল মুহতার’ এ লিখেছেন:
"জন্ম উপলক্ষে আনন্দ প্রকাশ করা জায়েজ, কিন্তু যে কাজগুলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অপছন্দনীয় তা পরিহার করতে হবে।" (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৯৮)
শায়খুল ইসলাম মুফতী তাকী উসমানী (দা.বা.) তাঁর ফতোয়ায় বলেন:
"বেবি শাওয়ার যদি কোনো ধর্মীয় রীতি না হয়, গান-বাজনা ও অশ্লীলতা না থাকে, এবং শুধু আত্মীয়-স্বজনদের মিলন ও হাদিয়া বিনিময় হয়, তবে তা জায়েজ, তবে আকীকাকে তার স্থানে রেখে দিতে হবে।" (ফতোয়া উসমানী, ২/৪৫৬-এর সারমর্ম)
সুতরাং প্রশ্নের প্রথম অংশের উত্তর:
আপনার বর্ণিত পদ্ধতিতে যদি গান-বাজনা, হারাম কোনো কার্যকলাপ, এবং হিন্দু বা অন্য ধর্মের রীতির অনুকরণ না থাকে, তবে তা জায়েজ। নির্দিষ্ট কোনো দিন বা মাস বাধ্যতামূলক নয়, যে কোনো দিনে করা যায়।
২. মায়ের জন্য ছোট ইনডোর আয়োজন ও খাবারের ব্যবস্থা
প্রশ্নের দ্বিতীয় অংশে বলা হয়েছে: মাকে ভালোবেসে একটি ছোট আয়োজনে কয়েক পদের খাবার তার সামনে আনা হয়, যেখানে কোনো টিকা লাগানো বা পূজা নেই। এটি সম্পূর্ণ জায়েজ। কারণ:
- ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শন ইসলামে প্রশংসিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে স্ত্রী ও পরিবারের প্রতি যত্নশীল ছিলেন।
- হিন্দুদের "সাধ" বা "টিকা" ইত্যাদির সাথে এর কোনো মিল নেই, বরং এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন নিয়ত ও পরিবেশের কাজ।
- নিয়ত শুদ্ধ থাকলে এ জাতীয় আয়োজনকে ‘উৎসাহ-উদ্দীপনা’ বা ‘খুশি প্রকাশ’ হিসেবে গণ্য করা হবে, যা বৈধ।
হানাফী ফিকহের মূলনীতি:
"الْأَصْلُ فِي الْأَشْيَاءِ الْإِبَاحَةُ حَتَّى يَدُلَّ دَلِيلٌ عَلَى التَّحْرِيمِ"
অর্থ: "সব বস্তু মূলত হালাল, যতক্ষণ না কোনো দলিল হারাম প্রমাণ করে।" (আল-হিদায়া, উসুলুল ফিকহ)
এখানে খাবার পরিবেশন ও ভালোবাসা প্রদর্শন হারাম নয়, সুতরাং তা হালাল।
উপসংহার ও পরামর্শ
- আকীকার সুন্নতকে গুরুত্ব দিন: বেবি শাওয়ারের চেয়ে সন্তানের ৭ম দিনে আকীকা করানো উত্তম। আকীকার পর আত্মীয়স্বজনদের দাওয়াত দেওয়া সুন্নত।
- অপচয় ও বাড়াবাড়ি থেকে বিরত থাকুন: অতিরিক্ত খরচ ও আড়ম্বর পরিহার করুন।
- গুনাহের পরিবেশ সৃষ্টি না হয় তা নিশ্চিত করুন: গান-বাজনা, মেয়ে-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, ফটোগ্রাফিতে সীমালঙ্ঘন ইত্যাদি থেকে দূরে থাকুন।
অতএব, প্রশ্নে বর্ণিত উভয় আয়োজনই যদি উপরোক্ত শর্তে হয়, তবে জায়েজ। তবে যদি কোনো সন্দেহ থাকে বা স্থানীয় আলেমদের থেকে নির্দেশনা নেওয়া উত্তম।
والله أعلم بالصواب