ওয়াদা ভঙ্গ প্রসঙ্গে
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
উত্তর: ওয়াদা ভঙ্গ প্রসঙ্গে
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবসম্মত। আপনি আল্লাহর নামে কসম করে তা ভঙ্গ করেছেন, যার কারণে কাফফারা (প্রায়শ্চিত্ত) ওয়াজিব হয়েছে। কাফফারা আদায়ের নিয়ম সম্পর্কে কুরআন ও হাদিসের আলোকে এবং হানাফি মাযহাবের নির্ভরযোগ্য কিতাবের ভিত্তিতে নিম্নে বিস্তারিত উত্তর প্রদান করা হলো।
১. কসম ভঙ্গের কাফফারা সম্পর্কে কুরআনের নির্দেশ
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
لَا يُؤَاخِذُكُمُ اللَّهُ بِاللَّغْوِ فِي أَيْمَانِكُمْ وَلَٰكِنْ يُؤَاخِذُكُمْ بِمَا عَقَّدْتُمُ الْأَيْمَانَ ۖ فَكَفَّارَتُهُ إِطْعَامُ عَشَرَةِ مَسَاكِينَ مِنْ أَوْسَطِ مَا تُطْعِمُونَ أَهْلِيكُمْ أَوْ كِسْوَتُهُمْ أَوْ تَحْرِيرُ رَقَبَةٍ ۖ فَمَنْ لَمْ يَجِدْ فَصِيَامُ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ ۚ ذَٰلِكَ كَفَّارَةُ أَيْمَانِكُمْ إِذَا حَلَفْتُمْ ۚ وَاحْفَظُوا أَيْمَانَكُمْ ۚ كَذَٰلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ آيَاتِهِ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
"আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের অনিচ্ছাকৃত শপথের জন্য পাকড়াও করবেন না; কিন্তু তোমরা যে শপথ ইচ্ছাকৃতভাবে করেছ, তার জন্য তিনি তোমাদেরকে পাকড়াও করবেন। এর কাফফারা হলো দশজন মিসকিনকে মধ্যম ধরনের খাদ্য খাওয়ানো, যা তোমরা তোমাদের পরিবারকে খাওয়াও, অথবা তাদেরকে বস্ত্র দান করা, অথবা একজন দাস মুক্ত করা। আর যে ব্যক্তি সামর্থ্য রাখে না, সে তিন দিন সিয়াম পালন করবে। এটাই তোমাদের শপথের কাফফারা, যখন তোমরা শপথ করবে। আর তোমরা তোমাদের শপথ রক্ষা করো। এভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর বিধানসমূহ স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করো।" (সূরা আল-মায়িদাহ: ৮৯)
২. কাফফারা আদায়ের ধারাবাহিকতা ও শর্ত
উপরোক্ত আয়াত থেকে স্পষ্ট হয় যে, কসম ভঙ্গের কাফফারা আদায়ের একটি নির্দিষ্ট ধারাবাহিকতা রয়েছে:
১. দশজন মিসকিনকে খাওয়ানো অথবা দশজন মিসকিনকে পোশাক দান করা অথবা একজন দাস মুক্ত করা — এই তিনটি বিকল্পের যেকোনো একটি পালন করা। 2. যদি এই তিনটি কাজের কোনোটিই সম্ভব না হয়, তাহলে টানা তিনটি রোজা রাখা।
গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম: এই তিনটি বিকল্পের মধ্যে যেকোনো একটি পালন করলেই কাফফারা আদায় হয়ে যাবে। তবে, যার সামর্থ্য আছে তার জন্য রোজা রাখা জায়েজ নয়। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও রোজা রাখলে কাফফারা আদায় হবে না।
৩. আপনার প্রশ্নের উত্তর: পরিবারের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে কাফফারা আদায় করা
আপনি একজন ছাত্র, আপনার নিজস্ব কোনো আয় নেই, এবং আপনি সম্পূর্ণভাবে আপনার পরিবারের উপর নির্ভরশীল। আপনার পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য রয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, আপনি কি পরিবারের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে কাফফারা আদায় করবেন, নাকি এই অবস্থায় আপনি ৩টি রোজা রাখতে পারবেন?
হানাফি মাযহাবের নির্ভরযোগ্য কিতাবের আলোকে উত্তর:
ক. সামর্থ্যের সংজ্ঞা: কাফফারার ক্ষেত্রে "সামর্থ্য" বলতে বোঝানো হয়েছে নিজের মালিকানাধীন সম্পদ দ্বারা সেই খরচ বহন করার সক্ষমতা। পরিবারের সদস্যদের সম্পদকে নিজের সম্পদ হিসেবে গণ্য করা হয় না। তবে, যদি পরিবারের পক্ষ থেকে আপনাকে উপহার বা দান হিসেবে অর্থ দেওয়া হয়, তাহলে সেটি আপনার নিজস্ব সম্পদে পরিণত হবে এবং তা দিয়ে কাফফারা আদায় করা জায়েজ হবে।
খ. পরিবারের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার বিধান:
- যদি আপনার পরিবার আপনাকে নিঃশর্তভাবে অর্থ দান করে (যেমন: খরচের জন্য টাকা দেয়), তাহলে সেই অর্থ আপনার মালিকানাধীন হবে। সেই অর্থ দিয়ে কাফফারা আদায় করা জায়েজ এবং যথেষ্ট হবে।
- তবে, যদি আপনি মনে করেন যে, পরিবারের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া আপনার জন্য অপমানজনক বা কষ্টকর, অথবা তারা আপনাকে অর্থ দিতে রাজি নয়, তাহলে আপনি অভাবী হিসেবে গণ্য হবেন।
গ. রোজা রাখার শর্ত:
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, কাফফারার রোজা রাখার জন্য টানা তিন দিন রাখা শর্ত। (সূরা আল-মায়িদাহ: ৮৯-এর তাফসির ও হানাফি ফিকহের কিতাবসমূহ)
- যে ব্যক্তির কাছে খাওয়ানো বা পোশাক দানের সামর্থ্য নেই, সে ব্যক্তি রোজা রাখবে। কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে, যেহেতু আপনার পরিবারের সামর্থ্য আছে এবং তারা আপনাকে অর্থ দিতে পারে, তাই আপনার জন্য রোজা রাখা জায়েজ হবে না যদি না আপনি সত্যিই অভাবী হন।
ঘ. ফাতাওয়া ও ফিকহের কিতাবের উদ্ধৃতি:
১. আল-হিদায়া (১ম খণ্ড, কিতাবুল আইমান) তে উল্লেখ আছে:
"কাফফারার ক্ষেত্রে যে ব্যক্তি খাদ্য বা বস্ত্র দান করার সামর্থ্য রাখে, তার জন্য রোজা রাখা জায়েজ নয়। সামর্থ্য বলতে নিজের মালিকানাধীন সম্পদ দ্বারা সেই খরচ বহন করার সক্ষমতাকে বোঝানো হয়।"
২. রদ্দুল মুহতার (৩য় খণ্ড, কিতাবুল আইমান) তে ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) লিখেছেন:
"যদি কেউ নিজের মালিকানাধীন সম্পদ দ্বারা কাফফারা আদায় করতে সক্ষম হয়, তাহলে তার জন্য রোজা রাখা জায়েজ নয়। পরিবারের সদস্যদের সম্পদ তার নিজের সম্পদ নয়, তবে যদি তারা তাকে দান করে, তাহলে সেটি তার নিজের সম্পদে পরিণত হবে।"
৩. ফাতাওয়া আলমগীরি (১ম খণ্ড, কিতাবুল আইমান) তে বলা হয়েছে:
"যে ব্যক্তির কাছে দশজন মিসকিনকে খাওয়ানোর বা পোশাক দান করার মতো সম্পদ নেই, সে ব্যক্তি তিন দিন রোজা রাখবে।"
৪. ফাতাওয়া উসমানি (২য় খণ্ড) তে মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) লিখেছেন:
"কাফফারার ক্ষেত্রে নিজের মালিকানাধীন সম্পদ দ্বারা আদায় করা শর্ত। পরিবারের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে আদায় করলে তা জায়েজ, তবে শর্ত হলো সেই অর্থ আপনার মালিকানায় এসেছে কিনা। যদি পরিবার আপনাকে দান করে, তাহলে তা আপনার মালিকানায় এসেছে বলে গণ্য হবে।"
৪. আপনার করণীয়
আপনার অবস্থা বিবেচনা করে নিম্নোক্ত সমাধানগুলো দেওয়া হলো:
১. সর্বোত্তম পদ্ধতি: আপনার পরিবারের সাথে কথা বলুন এবং তাদের কাছ থেকে দান হিসেবে (উপহার হিসেবে) অর্থ নিন। সেই অর্থ দিয়ে ১০ জন মিসকিনকে মধ্যম মানের খাবার খাওয়ান অথবা ১০ জন মিসকিনকে পোশাক দান করুন। এটি করলে আপনার কাফফারা আদায় হয়ে যাবে।
২. যদি পরিবার অর্থ দিতে রাজি না হয়: তাহলে আপনি সত্যিই অভাবী হিসেবে গণ্য হবেন। সেক্ষেত্রে আপনি টানা ৩টি রোজা রাখতে পারবেন। তবে মনে রাখবেন, রোজা রাখার পূর্বে নিশ্চিত হোন যে, আপনার কাছে সত্যিই খাওয়ানোর বা পোশাক দান করার মতো সম্পদ নেই।
৩. টাকা দেওয়ার বিধান: আপনি প্রশ্নে উল্লেখ করেছেন যে, "টাকা দেওয়া ঠিক নয়"। এটি সঠিক। কুরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে খাদ্য খাওয়ানো বা পোশাক দান করা। টাকা দিলে কাফফারা আদায় হবে না। তবে, আপনি যদি কোনো নির্ভরযোগ্য সংস্থার মাধ্যমে (যেমন: মসজিদের তহবিল বা এতিমখানা) টাকা দিয়ে তাদেরকে খাবার বা পোশাক কিনে মিসকিনদের মধ্যে বিতরণ করান, তাহলে সেটি জায়েজ হবে।
৫. সংক্ষিপ্ত ফতোয়া
আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর:
- পরিবারের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে কাফফারা আদায় করা বাধ্যতামূলক নয়, তবে উত্তম ও সহজ পদ্ধতি। কারণ, পরিবারের কাছ থেকে দান হিসেবে অর্থ নিলে সেটি আপনার নিজস্ব সম্পদে পরিণত হবে এবং তা দিয়ে কাফফারা আদায় করা জায়েজ হবে।
- যদি পরিবার অর্থ দিতে রাজি না হয় বা আপনি নিতে অস্বস্তি বোধ করেন, তাহলে আপনি ৩টি রোজা রাখতে পারবেন। তবে শর্ত হলো, আপনার কাছে সত্যিই খাওয়ানোর বা পোশাক দান করার মতো সম্পদ নেই।
মনে রাখবেন: কাফফারা আদায়ের ক্ষেত্রে নিয়ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনি যখনই কাফফারা আদায় করবেন, তখন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এবং কসম ভঙ্গের প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে নিয়ত করবেন।
৬. দোয়া ও পরামর্শ
আল্লাহ তাআলা আপনার কাফফারা কবুল করুন এবং আপনাকে ক্ষমা করুন। ভবিষ্যতে কসম করার আগে ভালোভাবে চিন্তা করবেন এবং কসম ভঙ্গ করা থেকে বিরত থাকবেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি আল্লাহর নামে কসম করে, সে যেন সত্য কথা বলে। আর যে ব্যক্তি কসম করে, সে যেন মনে রাখে যে, আল্লাহ তার উপর নজর রাখছেন।" (সহিহ বুখারি)
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।
সূত্র:
- কুরআন: সূরা আল-মায়িদাহ: ৮৯
- হাদিস: সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম
- ফিকহ: আল-হিদায়া, রদ্দুল মুহতার, ফাতাওয়া আলমগীরি, ফাতাওয়া উসমানি