নিকাহনামায় তালাকের ক্ষমতা লেখার বিধান
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
শ্রদ্ধেয় মুফতি সাহেবগণ,
প্রচলিত আইনে বিয়ের সময় নিকাহ নামায় কাজিসাহেবরা পাত্রের অনুমতি না নিয়েই স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার অনুমতি দিয়ে দেন।
যেমন আমার কাবিনে/নিকাহ নামায় উল্লেখ আছে যে "আমি স্ত্রীকে ইসলামী শরীয়ত মোতাবেক তাহার সমস্ত হক আদায় করিব অন্যায় ভাবে নির্যাতন করিব না দেনমোহর চাহিবা মাত্র পরিষোধ করিব। অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিবাহ করিব না"
আরেকটা কথা লিখেছে যে, "স্ত্রীকে এক দুই ও তিন তালাক এবং বাইন তালাকের ক্ষমতা অর্পণ করিলাম"
এখন আমার প্রশ্ন হল এই যে কাজী সাহেব আমার আমার অনুমতি ছাড়াই এই স্পর্শকাতর জিনিসগুলো লিখে দিয়েছে শরীয়তের আলোকে এটার হুকুম এখন কি হবে এটা যদি জানাতেন খুবই ভালো হতো।
Answer
উত্তর: নিকাহনামায় পাত্রের অনুমতি ছাড়া শর্ত আরোপের বিধান
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নে বর্ণিত ঘটনায় কাজী সাহেব আপনার অনুমতি ও জ্ঞান ছাড়াই নিকাহনামায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ও ক্ষমতা অর্পণ করে দিয়েছেন। শরীয়তের আলোকে এ ধরনের কার্যের বিধান নিম্নরূপ:
১. তালাকের ক্ষমতা অর্পণ (তালাকে তাওয়ীজ)
নিকাহনামায় উল্লেখ আছে: "স্ত্রীকে এক দুই ও তিন তালাক এবং বাইন তালাকের ক্ষমতা অর্পণ করিলাম"।
হানাফি ফিকহের মূলনীতি হলো, স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা দেওয়া একটি তাবয়ীজ (delegation)। এই তাবয়ীজ কার্যকর হওয়ার জন্য স্বামীর স্পষ্ট ও স্বেচ্ছায় সম্মতি অপরিহার্য। ইমাম আবু হানীফা (রহ.) ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.)-এর মতে, স্বামীর ইখতিয়ার ও রাজি ছাড়া কেবল কাজী বা তৃতীয় পক্ষের লেখা দ্বারা এ ক্ষমতা বৈধ হয় না। (দেখুন: রদ্দুল মুহতার, ৩/২৬৯; ফতোয়ায়ে আলমগীরী, ১/৩৭৫; ইমদাদুল ফতোয়া, ৪/৩৪৯)
আপনি স্পষ্ট বলেছেন যে আপনি এ শর্তে রাজি ছিলেন না, বরং কাজী আপনার অজান্তেই লিখে দিয়েছেন। সুতরাং এটি বাতিল এবং কোনো আইনগত প্রভাব ফেলে না। আপনার স্ত্রী এ শর্তের ভিত্তিতে তালাক দেওয়ার অধিকারিণী হবেন না। তবে আপনি যদি পরে এ শর্ত সম্পর্কে জানার পরও চুপ থাকেন অথবা সম্মতি দেন, তাহলে তা বৈধ হয়ে যাবে। (ফতোয়া উসমানী, ২/২৭২)
২. দ্বিতীয় বিবাহ না করার শর্ত
নিকাহনামায় লেখা: "অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিবাহ করিব না"।
আপনি যেহেতু এতে সম্মত ছিলেন না, তাই আপনি শরীয়তের দৃষ্টিতে এ শর্ত পালনে বাধ্য নন। তবে উত্তম হলো স্ত্রীর সাথে আলোচনা করে বিষয়টি সমাধান করা।
৩. স্ত্রীর হক আদায় ও দেনমোহরের প্রতিশ্রুতি
"তাহার সমস্ত হক আদায় করিব, নির্যাতন করিব না, দেনমোহর চাহিবামাত্র পরিশোধ করিব" – এ ধরনের কথা নিকাহনামায় লেখা শরীয়তের দৃষ্টিতে ভালো। যদিও আপনার অনুমতি ছাড়া লেখা হয়েছে, তবুও এটি ইসলামের মৌলিক নির্দেশেরই অংশ। আপনি শরীয়তের বিধান অনুযায়ী স্ত্রীর হক (ভরণপোষণ, দেনমোহর, ন্যায়বিচার) আদায় করতে বাধ্য আছেন। এ শর্ত লেখা না থাকলেও এসব হক আদায় করা ফরজ। সুতরাং এ অংশটি আপনার জন্য কোনো নতুন বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করেনি, বরং তা শরীয়তের বিদ্যমান হুকুমের স্মারক মাত্র।
উপসংহার ও পরামর্শ
১. তালাকের ক্ষমতা অর্পণ – আপনার অজান্তে ও অনুমতি ছাড়া লেখা হওয়ায় তা বাতিল। আপনার স্ত্রী এ মর্মে তালাক দিতে পারবেন না।
২. দ্বিতীয় বিবাহ না করার শর্ত – যেহেতু আপনি এতে সম্মত নন, তাই এটি অবৈধ। আপনি ইচ্ছা করলে দ্বিতীয় বিবাহ করতে পারেন, তবে আদর্শ হলো প্রথম স্ত্রীর সাথে পারস্পরিক বোঝাপড়া করা।
৩. হক আদায়ের প্রতিশ্রুতি – এটি শরীয়তের দৃষ্টিতে স্বাভাবিক দায়িত্ব, লিখিত থাকা বা না থাকা একই।
৪. কাজীর ভুল – কাজী সাহেবের কর্তব্য ছিল প্রতিটি শর্ত আপনার কাছে পড়ে শুনিয়ে এবং আপনার স্পষ্ট সম্মতি নিয়ে লিখে দেওয়া। তিনি তা না করে দায়িত্বে শৈথিল্য প্রকাশ করেছেন। ভবিষ্যতে বিয়ে করলে নিকাহনামার প্রতিটি ধারা নিজে পড়ে নিশ্চিত হন এবং আপনার অসম্মত শর্ত কাটিয়ে স্বাক্ষর করুন।
উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), ৩/২৬৯-২৭৩
- ফতোয়ায়ে আলমগীরী (হিন্দিয়া), ১/৩৭২-৩৭৫
- ফতোয়া উসমানী (মুফতি তাকি উসমানী), ২/২৭০-২৭২
- ইমদাদুল ফতোয়া (আশরাফ আলী থানভী), ৪/৩৪৯-৩৫০
আল্লাহ তাআলা আপনাকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দিন। (আমিন)