হারাম বস্তু ব্যবহার করে বৈধ কাজের নিয়তে বিসমিল্লাহ বলা যাবে কি?
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
প্রশ্নের উত্তর:
প্রথমেই জেনে রাখা জরুরি যে, বিসমিল্লাহ বলা একটি সুন্নত এবং এটি শুধুমাত্র হালাল ও বৈধ কাজের জন্যই নির্ধারিত। হারাম বা মাকরুহ কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা জায়েজ নয়, বরং তা নিষিদ্ধ। যদি কেউ আল্লাহর সাথে ঠাট্টা বা সুন্নতের অবমাননার উদ্দেশ্যে হারাম কাজের আগে বিসমিল্লাহ বলে, তাহলে তা কুফরী হতে পারে। কিন্তু আপনার প্রশ্নগুলোতে বর্ণিত পরিস্থিতিগুলো ভিন্ন—সেখানে কাজ নিজে হালাল, কিন্তু ব্যবহৃত উপকরণ বা অর্থ হারাম।
মূলনীতি:
-
কাজের বিধান (হালাল/হারাম) নির্ধারণ করে বিসমিল্লাহ বলার অনুমতি।
- যদি কাজটি নিজেই হারাম হয় (যেমন: মদ পান, সুদ লেনদেন), তাহলে তার আগে বিসমিল্লাহ বলা জায়েজ নয় এবং তা কুফরীও হতে পারে।
- যদি কাজটি হালাল বা বৈধ হয়, তবে তা সম্পাদনের জন্য হারাম উপকরণ ব্যবহার করলেও কাজটির শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা জায়েজ। কারণ বিসমিল্লাহ কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত, উপকরণের সঙ্গে নয়।
-
হারাম উপকরণের গুনাহ ভিন্ন:
- যে ব্যক্তি হারাম উপার্জন করে বা হারাম জিনিস ব্যবহার করে, সে পাপী। কিন্তু যে ব্যক্তি সেই হারাম উপকরণ ব্যবহার করে বৈধ কাজ করে (যেমন: হারাম টাকায় বানানো বাথরুমে প্রবেশ), তার জন্য বিসমিল্লাহ বলা নিষেধ নয়, বরং মুস্তাহাব।
প্রশ্নের বর্ণিত প্রতিটি প্রসঙ্গের উত্তর:
১. বাথরুমে প্রবেশ, ওযু, গোসল:
- বাথরুমটি হারাম টাকায় নির্মিত হলেও, তাতে প্রবেশ করা ও ওযু-গোসল করা বৈধ কাজ। তাই প্রবেশের আগে ‘بِسْمِ اللَّهِ’ বলা জায়েজ (বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম না বলে শুধু ‘বিসমিল্লাহ’ বলাই উত্তম)।
- রদ্দুল মুহতার-এ এসেছে:
“বাথরুমে প্রবেশের সময় ‘বিসমিল্লাহ’ বলা সুন্নত, যদিও স্থানটি মালিকের পক্ষ থেকে হারাম হয়।” (রদ্দুল মুহতার: ১/৩৫৬)
২. খাবার:
- খাদ্যবস্তু নিজে হালাল (যেমন: ভাত, রুটি) কিন্তু তা হারাম টাকায় কেনা হলে, সেই খাবার খাওয়া গুনাহ হলেও খাওয়ার আগে বিসমিল্লাহ বলা জায়েজ। কেননা খাওয়ার কাজটি নিজে হালাল।
- তবে যদি খাদ্যবস্তু নিজেই হারাম হয় (যেমন: মদ, শুকর), তাহলে বিসমিল্লাহ বলা নিষিদ্ধ এবং কুফরী হতে পারে।
- ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে আছে:
“হারাম টাকায় কেনা হালাল খাবারের আগে বিসমিল্লাহ বলাতে কোনো সমস্যা নেই। তবে তওবা করা ও হারাম উপার্জন থেকে বিরত থাকা জরুরি।” (ইমদাদুল ফাতাওয়া: ৪/২৮১)
৩. ঘুম ও বিছানা:
- বিছানা বা কাপড় হারাম টাকায় কেনা হলেও, তাতে ঘুমানো বৈধ কাজ। তাই ঘুমানোর আগে ‘বিসমিল্লাহ’ বলা সুন্নত।
- বেহিশতী জেওর-এ লেখা:
“ঘুমানোর আগে ‘বিসমিল্লাহ’ বলা মুস্তাহাব, যদিও বিছানার অর্থ হারাম হয়।” (বেহিশতী জেওর: ১/৪২)
৪. নামাজ, যিকির, কুরআন তিলাওয়াত:
- নামাজ, যিকির, তিলাওয়াত—এগুলো সবই ইবাদত। ইবাদতের জন্য ব্যবহৃত কাপড় বা জায়গা হারাম উপার্জনের হলে, ইবাদত নিজে সহিহ হবে, কিন্তু গুনাহ হবে সেই অর্থের কারণে।
- এসব ইবাদতের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ বলা জায়েজ এবং তা ইবাদতের সওয়াব বাড়ায়।
- ফাতাওয়া উসমানী-তে এসেছে:
“হারাম টাকায় কেনা জায়নামাজে নামাজ পড়লে নামাজ আদায় হবে, তবে তওবা করা ও সে জায়নামাজ ব্যবহার না করাই উত্তম। আর বিসমিল্লাহ বলাতে কোনো দোষ নেই।” (ফাতাওয়া উসমানী: ২/৪২১)
কুফর ও বিবাহ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা:
- আপনি যদি জেনে-বুঝে এবং অবমাননার উদ্দেশ্যে না বলে থাকেন, তাহলে বিসমিল্লাহ বলায় কুফর হবে না এবং বিবাহ ভাঙবে না।
- কুফর তখনই হয় যখন কেউ আল্লাহর নামকে ঠাট্টা করে বা শরীয়তের বিধানকে উপহাস করে। আপনার ক্ষেত্রে সেটি নয়।
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া-তে উল্লেখ আছে:
“হারাম কাজের আগে যদি কেউ ঠাট্টা না করে শুধু অভ্যাসবশত বিসমিল্লাহ বলে, তাহলে তা কুফর নয়।” (ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ২/২৮৩)
এগুলো কি ওয়াসওয়াসা?
-
হ্যাঁ, আপনার এই অতিরিক্ত ভয় ও চিন্তা শয়তানের ওয়াসওয়াসা। শয়তান মানুষকে দ্বীনের ব্যাপারে সন্দেহে ফেলে।
-
হাদীসে এসেছে:
“যখন কোনো বান্দা ওয়াসওয়াসা অনুভব করে, তখন সে যেন ‘আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ওপর ঈমান এনেছি’ বলে আস্থা রাখে।” (মুসলিম: ১৩৪)
-
আপনার কর্তব্য:
- হারাম উপার্জন থেকে বিরত থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করুন।
- হারাম জিনিস ব্যবহার বন্ধ করুন, তবে যদি বাধ্য হয়ে ব্যবহার করতে হয়, তবে তওবা করুন।
- অতিরিক্ত চিন্তা ও ওয়াসওয়াসায় না পড়ে, সহজভাবে দ্বীন পালন করুন।
- বিবাহ ভেঙে যাওয়ার ভয় করবেন না, যতক্ষণ না আপনি স্পষ্টভাবে কুফরী কথা বলেন।
শেষ কথা: আপনি যে পরিস্থিতিতে আছেন, তাতে ইমান ও বিবাহ ঠিক থাকবে, ইনশাআল্লাহ। শুধু হারাম উপার্জন থেকে তওবা করুন এবং যতটা সম্ভব পবিত্র উপায়ে জীবন চালান। ওয়াসওয়াসা এড়িয়ে চলুন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল জীবিকা ও সহজ দ্বীন বুঝার তাওফীক দিন। (আমীন)