স্বামীর সংস্কারের জন্য বৈধ তদবির
Faith and Belief · Hanafi
Question
এই অবস্থায় শেষ চেষ্টা হিসেবে আমার আব্বু একজন হাফেজের থেকে তদবির নিতে চাচ্ছে। তার তদবিরের নিয়ম হবে—
১/ পানি পড়া,
২/ চিনি পড়া,
৩/ কাগজে আমার হাজবেন্ড আর আমার নাম লিখে সেই কাগজ আগুনে পোড়ানো,
৪/ উনার পড়ে দেয়া পানি পাতিলে নিয়ে চুলায় আগুনের তাপে তা ফুটানো,
৫/ একটা টিনের কৌটার মধ্যে বালি নিয়ে তার মধ্যে উনার লিখে দেয়া কবজ নাড়াচাড়া করতে হবে।
এই তদবির নেয়ার ব্যাপারে আমার আব্বু মসজিদের একজন ইমামের সাথেও কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন যেহেতু এটা খারাপ উদ্দেশ্যে নেয়া হবে না, তাই এই তদবির নেয়া যেতে পারে। কিন্তু আমি যথেষ্ট সন্দিহান এই তদবিরের ব্যাপারে। আবার তদবির না নেয়ার কথা বললেও আব্বু রেগে যান। এখন আমার করণীয় কী?
Answer
উত্তর দেওয়ার আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ নোটিশ:
প্রিয় প্রশ্নকারী, আপনার বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন। আপনার স্বামীর আচরণ সম্পূর্ণরূপে ইসলামবিরোধী এবং অগ্রহণযোগ্য। আপনি একজন ধৈর্যশীল ও সহনশীল স্ত্রী হিসেবে শেষ চেষ্টা হিসেবে তদবিরের কথা ভাবছেন।
প্রশ্নের উত্তর:
আপনার বর্ণিত তদবিরের পদ্ধতি (পানি পড়া, চিনি পড়া, কাগজ পোড়ানো, আগুনে পানি ফুটানো, বালি নাড়াচাড়া) এগুলো থেকে বেঁচে থাকাই উত্তম। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"مَنْ عَقَدَ عُقْدَةً ثُمَّ نَفَثَ فِيهَا فَقَدْ سَحَرَ، وَمَنْ سَحَرَ فَقَدْ أَشْرَكَ"
"যে ব্যক্তি গিরা বেঁধে তাতে ফুঁক দেয়, সে জাদু করল; আর যে জাদু করল সে শিরক করল।" (সুনানে নাসাঈ, হাদিস: ৪০৭৯; সহিহ তারগীব, হাদিস: ২০৩৫)
উপরে বর্ণিত পদ্ধতিগুলো অস্পষ্ট। এগুলোর সাথে নিষিদ্ধ বিষয়াবলীও থাকার প্রবল সম্ভবনা রয়েছে। তাই এগুলো থেকে বিরত থাকতে হবে।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.) স্পষ্ট বলেছেন:
"الوسائل لها حكم المقاصد"
"উপায়-পদ্ধতির বিধান রয়েছে, সেগুলো উদ্দেশ্যের মতো ভালো বা মন্দ বলে গণ্য হবে।" (উসুলুশ শাশি, আল-আশবাহ ওয়ান-নাযাইর)
আপনার করণীয় কী?
১. এই তদবির বর্জন করুন:
আপনার অন্তর সন্দিহান হওয়াটাই স্বাভাবিক। এটি আপনার ঈমানের আলামত। দৃঢ়ভাবে এই তদবির নেওয়া থেকে বিরত থাকুন। পরিবারের সামনে বলুন: "ইসলামে জাদু-টোনা ও কুফরি পদ্ধতি হারাম। আমি আমার ঈমান ও দ্বীন বাঁচাতে চাই।"
২. আপনার আব্বুকে ধৈর্য ও জ্ঞানের সাথে বোঝান:
- সরাসরি বলার চেয়ে একজন নির্ভরযোগ্য আলেম (যিনি কুরআন-সুন্নাহ ও হানাফি ফিকহ বুঝেন), যেমন- কোনো স্থানীয় মুফতি বা ইসলামিক স্কলারের কাছে আপনার আব্বুকে নিয়ে যান।
- কুরআনের আয়াত ও হাদিসের আলোকে বোঝান যে, জাদু ও কুসংস্কারের আশ্রয় নেওয়া আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী এবং এটি শিরকের দিকে নিয়ে যায়।
- আল্লাহ বলেন: "وَمَا يُفْلِحُ السَّاحِرُ حَيْثُ أَتَى" – "যাদুকর যেখানেই আসে, সে সফলকাম হয় না।" (সূরা ত্বহা: ৬৯)
৩. আল্লাহর কাছে দোয়া ও ইস্তেখারা করুন:
- সর্বোচ্চ চেষ্টা হচ্ছে দোয়া, ইস্তেগফার, নফল নামাজ, তাসবিহ ও কুরআন তিলাওয়াত।
- নিজে এবং আপনার পরিবার সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত, সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি এবং সূরা নির্ভরযোগ্য রুকইয়াহ (যা কুরআন ও হাদিসসম্মত) পড়ে পানিতে ফুঁ দিয়ে পান করুন।
৪. বিবাহ বিচ্ছেদের শরিয়তসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ করুন:
- আপনার স্বামী একাধিকবার ব্যভিচার করেছে, মদ-গাঁজা সেবন করেছে, শারীরিক নির্যাতন করেছে এবং নামায-রোজার ব্যাপারে তোয়াক্কা করেন না। ইসলামী আইনে এসব গুরুতর পাপ ও তালাকের বৈধ কারণ।
- পারিবারিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তালাক নেওয়া বা খুলা (স্ত্রীর পক্ষ থেকে তালাকের আবেদন) করার পথ বেছে নিন। এতে আপনি ইসলামসম্মতভাবে সম্মানজনক বিচ্ছেদ পেতে পারেন।
সর্বোত্তম ও বৈধ তদবির:
- সূরা বাকারা (বিশেষ করে শেষ আয়াত), সূরা ফালাক ও নাস, আয়াতুল কুরসি, সূরা ফাতিহা নিয়মিত পড়ে পানির উপর ফুঁ দিয়ে পান করা বা গোসল করা।
- নিজের জন্য দোয়া করা: "রব্বানা হাব লানা মিন আযওয়াজিনা ওয়া যুররিয়াতিনা কুররাতা আ‘য়ুনিন ওয়াজ্আলনা লিল মুত্তাক্বীনা ইমামা" (সূরা ফুরকান: ৭৪)
- আব্বু ও পরিবারের জন্য দোয়া: আল্লাহ যেন আপনাকে ও পরিবারকে সঠিক বুঝ দান করেন।
আল্লাহ আপনাকে ধৈর্য, হেফাজত ও উত্তম সিদ্ধান্ত দান করুন।
আমিন।