মেয়েদের বিয়ের পর মা-বাবার সেবা ও আর্থিক দায়িত্ব পালনের ইসলামি নির্দেশনা।

Family Life · Hanafi

Question No: 2439
Questioner: Fatema Khatun
Question Asked: 08 Jul 2026, 11:59 AM
Reviewed & Published: 08 Jul 2026, 12:04 PM
Views: 53
Tokens: 4,578
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

মা বাবার খেদমত করা, তাদের হক আদায় করা তো সন্তানের ওপরে ফরজ। তো মেয়েরা বিয়ের পরে কীভাবে এই দায়িত্ব পালন করে যেতে পারে? আর যদি এমন হয় যে তাদের কোনো ছেলে সন্তান নেই, বা থেকেও না থাকার মতো, সেক্ষেত্রে মেয়েটার ওপরে মা বাবার আর্থিক খরচ বহন করা আবশ্যক কি না। এছাড়াও আনুষঙ্গিক আরও কী কী দায়িত্ব পালন করতে হবে?

Answer

উত্তর

আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। মা-বাবার সেবা ও তাদের প্রতি দায়িত্ব পালন করা প্রতিটি সন্তানের জন্য ফরজ, তা সে ছেলে হোক বা মেয়ে। তবে বিয়ের পর মেয়েদের জন্য এই দায়িত্ব পালনের পদ্ধতি কিছুটা ভিন্ন হয়ে যায়, কারণ তাদের ওপর স্বামী ও সন্তানদের অধিকারও এসে যায়। নিচে হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।


১. মা-বাবার সেবা ও খেদমতের পদ্ধতি (বিয়ের পরে)

কুরআন ও হাদিসের নির্দেশনা:

  • আল্লাহ তাআলা বলেন: “তোমার প্রতিপালক আদেশ করেছেন যে, তাঁকে ছাড়া কারো ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো। তাদের মধ্যে কেউ বা উভয়ে যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হন, তবে তাদেরকে ‘উফ’ শব্দটিও বলো না এবং তাদের ধমক দিও না; বরং তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বলো।” (সূরা বনী ইসরাইল, ১৭:২৩)
  • রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত।” (সুনানে নাসায়ী, হাদিস: ৩১০৪)

বিয়ের পর মেয়েদের করণীয়:

  • মেয়ে বিয়ের পরও মা-বাবার খেদমত করতে পারে, তবে তা স্বামীর অনুমতি ও নিজের বৈবাহিক দায়িত্বের সাথে সামঞ্জস্য রেখে করতে হবে।
  • শরিয়তের সীমার মধ্যে থেকে মেয়ে নিয়মিত মা-বাবার খোঁজখবর নিতে পারে, টেলিফোন বা ভিডিও কলের মাধ্যমে যোগাযোগ রাখতে পারে, এবং সুযোগমতো তাদের বাড়িতে গিয়ে সেবা করতে পারে।
  • যদি মা-বাবা অসুস্থ হন, তাহলে মেয়ে স্বামীর অনুমতি নিয়ে তাদের সেবা করতে পারেন। তবে স্বামীর অধিকার লঙ্ঘন করে নয়।
  • ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, মেয়ের জন্য মা-বাবার সেবা করা সুন্নত ও মুস্তাহাব, তবে তা ফরজ নয় যদি তার স্বামী তার থেকে বিচ্ছিন্নতা দাবি করে। কিন্তু সাধারণ অবস্থায় মা-বাবার সাথে সম্পর্ক রাখা ও তাদের খেদমত করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৯২)

২. মা-বাবার আর্থিক খরচ বহন: মেয়ের ওপর কি ফরজ?

হানাফি ফিকহের মূলনীতি:

  • সন্তানের ওপর পিতা-মাতার ভরণপোষণ (নাফাকা) ফরজ হওয়ার শর্ত হলো: পিতা-মাতা অভাবগ্রস্ত হবেন এবং সন্তান সামর্থ্যবান হবে।
  • ছেলে সন্তানের ওপর প্রথমত এই দায়িত্ব। ছেলে না থাকলে বা অক্ষম হলে মেয়ের ওপর দায়িত্ব আসে। (ফাতাওয়া আলমগিরি, ১/৫৫৯; রদ্দুল মুহতার, ৩/৬০৬)

মেয়ে বিবাহিত হলে কী হবে?

  • বিবাহিত মেয়ের নিজস্ব সম্পদ থাকলে তাকে তা থেকে মা-বাবাকে দেওয়া ফরজ (যদি তারা অভাবী হয় এবং ছেলে না থাকে)।
  • তবে মেয়ের নিজস্ব সম্পদ না থাকলে তাকে বাধ্য করা যাবে না। কারণ স্বামীর সম্পদ থেকে স্ত্রী নিজের ইচ্ছামতো খরচ করতে পারে, কিন্তু স্বামীকে স্ত্রীর পিতা-মাতার জন্য খরচ করতে বাধ্য করা যায় না। (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪২৫)
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/৪২৫)-তে বলা হয়েছে: “মেয়ে যদি নিজের মাল থেকে দিতে সক্ষম হয়, তবে তার ওপর মা-বাবার নাফাকা ওয়াজিব। আর যদি নিজের মাল না থাকে, তবে তার ওপর কিছু ওয়াজিব নয়।”

ছেলে না থাকলে মেয়ের দায়িত্ব:

  • যদি কোনো ছেলে সন্তান না থাকে, অথবা ছেলে থাকলেও সে অক্ষম (যেমন: দরিদ্র, মানসিক ভারসাম্যহীন) বা অদায়িত্বশীল হয়, তাহলে মেয়ে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী মা-বাবার ভরণপোষণের দায়িত্ব নেবে। এটি ফরজ-ই কিফায়া বা নির্দিষ্ট অবস্থায় ফরজ-ই আইন হয়ে যায়। (শরহু মাআনিল আসার, ২/৩২১; ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪২৭)

৩. আনুষঙ্গিক অন্যান্য দায়িত্ব

মা-বাবার প্রতি মেয়ের অন্যান্য দায়িত্বগুলো হলো:

১. দোয়া করা: মা-বাবার জন্য সর্বদা দোয়া করা, জীবিত ও মৃত উভয় অবস্থায়। কুরআনে এসেছে: “হে আমাদের প্রতিপালক, আমাকে ও আমার পিতা-মাতাকে ক্ষমা করুন।” (সূরা ইবরাহীম, ১৪:৪১)

২. সম্পর্ক বজায় রাখা: নিয়মিত সাক্ষাৎ বা যোগাযোগ রাখা, রাগ-অভিমান না করে সম্পর্কের মর্যাদা রক্ষা করা।

৩. সৎ উপদেশ দেওয়া: যদি মা-বাবা কোনো শরিয়তবিরোধী কাজ করেন, তবে মেয়ে তাদের নরম ভাষায় বোঝাতে পারে।

৪. আনুগত্য ও সম্মান: স্বামীর আদেশ অমান্য না করে মা-বাবার প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা প্রদর্শন করা।

৫. উত্তরাধিকার ও অসিয়ত: মা-বাবার মৃত্যুর পর তাদের রেখে যাওয়া সম্পদে শরিয়তসম্মত অংশ গ্রহণ করা এবং তাদের পক্ষ থেকে কাফফারা, মান্নত ইত্যাদি আদায় করা সম্ভব হলে তা করা। (বাহেশতি জেওর, অংশ ৭, অধ্যায়: মা-বাবার হক)


বিশেষ পরামর্শ

  • মেয়েকে উচিত স্বামীকে বোঝানো যে মা-বাবার প্রতি সেবা ও সাহায্য ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, যাতে স্বামী সহযোগিতা করেন।
  • মা-বাবার যদি একান্ত প্রয়োজন হয় এবং মেয়ে নিজে সক্ষম না হয়, তবে সে তার ভাই (যদি থাকে) বা অন্য আত্মীয়দের সহযোগিতা চাইতে পারে। কোনো অবস্থাতেই মা-বাবাকে অবহেলা করা জায়েজ নয়।

সারসংক্ষেপ:

  • বিয়ের পর মেয়ে স্বামীর অনুমতি ও নিজের দায়িত্বের তোয়াক্কা করে মা-বাবার সেবা করতে পারে।
  • আর্থিক খরচ নিজের সামর্থ্য থাকলে ও ছেলে না থাকলে ফরজ, অন্যথায় ফরজ নয় তবে অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।
  • সর্বাবস্থায় মা-বাবার প্রতি ভালোবাসা, দোয়া ও সম্পর্ক রক্ষা করা জরুরি।

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.