বিয়ের আগে পাত্রের মাজহাব সংক্রান্ত দ্বিধা ও ইস্তিখারার ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন।

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 2425
Questioner: Tauhida Tina
Question Asked: 07 Jul 2026, 08:57 PM
Reviewed & Published: 07 Jul 2026, 09:01 PM
Views: 58
Tokens: 8,470
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম।আমার একটা বিয়ের কথা চলছে।মোটামুটি দুই পরিবার ই দুই পরিবারকে পছন্দ করেছে।পাত্রের আমলি দিক ও আমার কাছে ভালো ই লেগেছে।জামাতের সহিত নামাজ,দৈনিক কুরআন পড়া,তাসবি তাহলিল,তাহাজ্জুদের আমল এবং আর ও ভালো কিছু দিক সব মিলিয়ে ভালো ই মনে হয়েছে।তবে মাজহাব নিয়ে মনে একটু দন্ধ হচ্ছে।উনি ইউটিউবে বিভিন্ন শাইখ দের ভিডিও দেখেন।ফিকহি বিষয়েও ইউটিউব থেকে মাসয়ালা নিয়ে থাকেন।এই হিসেবে চার মাজহাব থেকেই মাসয়ালার উপর আমল করেন।যেটা উনার কাছে বেশি শক্তিশালী মনে হয়।উনি মুজতাহিদ নন।এদিকে আমি শুধু হানাফি মাজহাব ই ফলো করি।তবে দ্বীনে ফেরার শুরুতে আমিও এমন ইউটিউব থেকে মাসয়ালা নিতাম।আমার মনে হয় উনি এই স্টেজটাতেই আছেন এবং উনাকে বুঝালে হয়ত বুঝবেন আবার নাও বুঝতে পারেন।উনি দ্বীনি জ্ঞান অর্জনের জন্য সিলেবাস ভিত্তিক গুছানো কোনো কোর্সে ভর্তি হওয়ার জন্য ও আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।কয়েকদিন ইস্তিখারা করে আমি পজেটিভ ই থাকি মাঝে মাঝে নেগেটিভ হয়ে যাই।কিন্তু পজেটিভ এর দিকেই মন বেশি ঝুকে।পরিবার থেকেও বিষয় টা নিয়ে আগানোর জন্য চাপ আসতেছে।এক্ষেত্রে কি আমি আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল রেখে এগিয়ে যাব?আজকে সকালে আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম যে আমার বিয়ে।আমার আব্বু রান্নার জন্য চুলা খুড়েছেন কিন্তু আমি তখন ও ফাইনাল মত দেইনি।এটা কি বিয়ে নিয়ে চিন্তা ভাবনার জন্য হলো নাকি ইস্তিখারার কারনে আমি বুঝতে পারছিনা।

আমি পাত্রকে ইস্তিখারার বিষয় এ জিজ্ঞেস করেছিলাম এই বিষয় সম্পর্কে তিনি জানেন না বলেছেন।পরবর্তীতে আমি নিয়ম বলে দেয়ায় তিনি এই আমল করবেন বলেছেন।এই জায়গা থেকে মনে হইছে তার হয়ত দ্বীনি ইলম কম।আমি মোটামুটি সব কাজের আগেই ইস্তিখারা করার চেষ্টা করি একটা স্কিন কেয়ার প্রোডাক্ট কিনলেও।

আমি আমার খটকার জায়গাগুলো বললাম এবং ইস্তিখারা করে কি মনে হয়েছে তাও বললাম।এখন আমার কি এই প্রস্তাবে এগিয়ে যাওয়া উচিত?

Answer

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ
উত্তর প্রদানে আমি আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করছি।

আপনার প্রশ্নটি দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে:
১. পাত্রের মাজহাব সংক্রান্ত অবস্থান ও তার দ্বীনি জ্ঞানের ঘাটতি।
২. ইস্তিখারা ও স্বপ্নের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ।

নিচে হানাফি ফিকহের আলোকে কুরআন-হাদিস ও নির্ভরযোগ্য কিতাবের রেফারেন্সসহ উত্তর প্রদান করছি।


১. মাজহাবের গুরুত্ব ও তাকলীদের আবশ্যকতা

হানাফি মতে, অমুজতাহিদ ব্যক্তির জন্য চার মাজহাবের যেকোনো একটির আনুগত্য করা (তাকলীদ) জরুরি। নিজের পছন্দমতো বিভিন্ন মাজহাব থেকে মাসআলা বেছে নেওয়া (তালফীক) বৈধ নয়, বিশেষত যখন তা ইচ্ছাকৃতভাবে সুবিধানুযায়ী হয়। ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর নীতি ছিল: “যদি কোনো হাদিস সহীহ হয়, তবে তা আমার মাযহাব।” কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, অমুজতাহিদ ব্যক্তি নিজেই হাদিস দেখে ফতোয়া দেবে। বরং মুজতাহিদ ইমামগণই হাদিস থেকে মাসআলা বের করেছেন।

  • রদ্দুল মুহতার (১/৪৬)-এ এসেছে: “অমুজতাহিদের জন্য এক মাজহাবের উপর স্থির থাকা ওয়াজিব; এক মাজহাব থেকে অন্য মাজহাবে ঘুরে বেড়ানো বৈধ নয়।”
  • ফাতাওয়া উসমানী (২/৬০৫)-এ উল্লেখ আছে: “সাধারণ মুসলিমের জন্য চার ইমামের যেকোনো একটির তাকলীদ করা ফরজ নয় বটে, তবে তালফীকের শিকার না হওয়ার জন্য একটিকেই স্থায়ীভাবে অনুসরণ করা উত্তম।”

আপনার পাত্রের অবস্থানটি গাইরে মুকাল্লিদ (যারা এক মাজহাব মানে না) বা তালফীককারী হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। যদি তিনি মুজতাহিদ না হন (যা আপনি বলেছেন), তবে তার জন্য ইউটিউব থেকে বিভিন্ন মাজহাবের দলিল দেখে নিজেই মাসআলা বের করা ফিকহি দৃষ্টিতে ভুল। ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, অমুজতাহিদের জন্য নিজস্ব ইজতিহাদ জায়েজ নয়। (আল-হিদায়া, ১/২৬)

তবে তার দ্বীনি জ্ঞান অর্জনের আগ্রহ ও কোর্সে ভর্তির ইচ্ছা ইতিবাচক। ধীরে ধীরে তাকে বোঝানো সম্ভব যে, একটি নির্ভরযোগ্য মাজহাব (বিশেষত হানাফি, যা আপনার আমল) অনুসরণ করা নিরাপদ। আপনি চাইলে তাকে ‘বাহেশতী জেওর’ বা ‘ফাতাওয়া উসমানী’-এর মতো সহজবোধ্য হানাফি কিতাব পড়ার পরামর্শ দিতে পারেন।


২. ইস্তিখারা ও স্বপ্নের ব্যাখ্যা

ইস্তিখারা করার পর পজেটিভ/নেগেটিভ অনুভূতি কখনো কখনো আল্লাহর পক্ষ থেকে ইঙ্গিত হতে পারে, তবে তা নির্ণায়ক নয়। ফিকহে ইস্তিখারার মূল নীতি হলো: ইস্তিখারার পর যে কাজের জন্য মনে প্রশান্তি আসে এবং যাতে কল্যাণ মনে হয়, সেটাই করা উচিত।

  • শরহে মাআনিল আছার (২/২৮৫)-এ ত্বহাবী (রহ.) থেকে বর্ণিত: “তোমাদের কেউ যখন কোনো কাজের ইস্তিখারা করে, সে যেন সেটি করে ফেলে। আর তারপর যা ঘটে, তাতেই কল্যাণ ধরে নেয়।”
  • ফাতাওয়া হিন্দিয়া (৬/৩১১)-এ লেখা: “ইস্তিখারার পর যদি মন কোনো দিকে ধাবিত হয় বা বারবার একই স্বপ্ন আসে, তবে তা ইস্তিখারার ফল হিসেবে গণ্য করা যায়।”

আপনার স্বপ্নে বাবার চুলা খোঁড়ার বিষয়টি - এটি ইস্তিখারার কারণে হতে পারে অথবা শুধু মনের চিন্তার প্রতিফলন। চুলা খোঁড়া সাধারণত রান্নার প্রস্তুতি অর্থাৎ মঙ্গলের ইঙ্গিত। কিন্তু আপনি ফাইনাল মত না দেওয়ায় কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। বরং স্বপ্নের ওপর নির্ভর না করে বাস্তবিক বিবেচনা এবং পাত্রের ধর্মীয় অবস্থার উন্নতির সম্ভাবনা বিচার করাই মূল কথা।

আপনি ইস্তিখারায় পজেটিভ বেশি অনুভব করছেন - এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে ইশারা হতে পারে। তবে পাত্রের মাজহাব সংক্রান্ত দুর্বলতা যদি আপনার জন্য বড় আপত্তি হয়, তাহলে তা ইস্তিখারার মাধ্যমেই সমাধান হোক - আপনি বিষয়টি নিয়ে তার সাথে আলোচনা চালিয়ে যেতে পারেন।


৩. পাত্রের দ্বীনি জ্ঞানের ঘাটতি ও করণীয়

আপনি বলেছেন পাত্র ইস্তিখারার নিয়ম জানেন না, কিন্তু শিখতে রাজি। এটি ইতিবাচক। তার দ্বীনি জ্ঞান কম হলেও শেখার আগ্রহ আছে। আপনার উচিত:

  • আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল রেখে এই বিয়ে এগিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে শান্তি বোধ করলে তা করা।
  • পাত্রকে একটি নির্দিষ্ট মাজহাব (যেমন হানাফি) অনুসরণের গুরুত্ব বোঝান। তাকে সহজ কিতাব বা অনলাইন কোর্সের লিংক দিন।
  • স্থানীয় কোন আলেমের সাথে পরামর্শ করিয়ে নিন, যিনি তাকে মাজহাবের সঠিক পদ্ধতি বুঝিয়ে দিতে পারেন।

হাদিসে এসেছে: “যদি তোমাদের কাছে এমন কেউ বিয়ের প্রস্তাব দেয়, যার দ্বীন ও চরিত্র তোমরা পছন্দ কর, তবে তাকে বিয়ে করো।” (তিরমিজি, ১০৮৪) - এখানে দ্বীন অর্থ মূল আকিদা ও আমলের পদ্ধতি, যা আপনি তার মধ্যে দেখছেন (জামাতে নামাজ, তাহাজ্জুদ ইত্যাদি)। মাজহাব সংক্রান্ত ত্রুটিটি শিক্ষা ও সময়ের মাধ্যমে সমাধানযোগ্য।


৪. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

ইস্তিখারার পর আপনার মন পজেটিভ দিকে বেশি ঝুঁকছে, পরিবারের সমর্থন আছে, পাত্র আমলি দিক থেকে ভালো এবং শেখার আগ্রহী - এই প্রেক্ষাপটে আল্লাহর উপর ভরসা রেখে বিয়ে এগিয়ে নেওয়া যেতে পারে। তবে শর্ত হলো, বিয়ের আগে থেকেই মাজহাবের বিষয়টি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করে নেওয়া এবং তাকে এক মাজহাবের (বিশেষত হানাফি) তাকলীদ করার গুরুত্ব বোঝানো। যদি তিনি তা মানতে রাজি হন, তাহলে ইনশাআল্লাহ কোনো সমস্যা নেই।

যদি তিনি এক মাজহাব মানতে একেবারেই অস্বীকৃতি জানান এবং ইউটিউব ভিত্তিক নিজস্ব ফতোয়া অব্যাহত রাখেন, তাহলে ভবিষ্যতে পারিবারিক জীবনে ফিকহি বিষয়ে মতানৈক্য বাড়তে পারে। সেই ক্ষেত্রে আপনি আরও ইস্তিখারা করে বা কোনো বিশ্বস্ত আলেমের শরণাপন্ন হয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।

দুআ:
“রব্বানা হাবলানা মিন আযওয়াজিনা ওয়া যুররিয়্যাতিনা কুর্রাতা আ’ইউনিন ওয়াজ্আলনা লিলমুত্তাকীনা ইমামা।”
(সূরা ফুরকান, ৭৪)

আল্লাহ তায়ালা আপনার জন্য কল্যাণময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাওফিক দান করুন। আমীন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.