ইসলামে নারী-পুরুষের যিনার শাস্তি কি সমান?
Faith and Belief · Hanafi
Question
উস্তাজ আমি এক জায়গায় দেখলাম যে, সুরাহ নুরের দ্বিতীয় আয়াত যেখানে ব্যভিচারের হদ্দের কথা বর্ণিত হয়েছ সেখানে মহিলা ব্যভিচারিনীর কথা পুরুষ ব্যভিচারিণীর আগে বর্ণিত হয়েছে কারণ একজন নারীর যিনা করা একজন পুরুষের যিনা করা থেকে বেশি মারাত্নক। এটা কি সত্যি?
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর হলো— না, এটি সঠিক নয়। সূরা নূরের ২ নং আয়াতে নারী ব্যভিচারিণীকে পুরুষের আগে উল্লেখ করার কারণ এ নয় যে, নারীর যিনা পুরুষের যিনা থেকে বেশি মারাত্মক। বরং কুরআন ও হাদিসের আলোকে নারী-পুরুষ উভয়ের যিনার শাস্তি সমান এবং উভয়ের অপরাধও সমান মাত্রার। কুরআনে কোনো বিষয়ে একটিকে আগে বা পরে উল্লেখ করার অর্থ সর্বদা তার গুরুত্ব বা মাত্রার ভিন্নতা বোঝায় না; বরং এটি আরবি ভাষার শৈলী, প্রসঙ্গ বা অন্যান্য কারণেও হতে পারে।
প্রামাণ্য ব্যাখ্যা:
১. সূরা নূরের ২ নং আয়াতের ভাষ্য:
মহান আল্লাহ বলেন:
“بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ
الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِدٍ مِّنْهُمَا مِائَةَ جَلْدَةٍ…”
(সূরা নূর, ২)
এখানে ‘الزَّانِيَةُ’ (ব্যভিচারিণী)কে ‘الزَّانِي’ (ব্যভিচারী) এর আগে উল্লেখ করা হয়েছে। অধিকাংশ মুফাসসিরে কেরাম (তাফসীরবিদ) বলেন, এর কারণ হলো— আরবি ভাষায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্ত্রীলিঙ্গকে পুরুষলিঙ্গের আগে উল্লেখ করা একটি সাধারণ শৈলী। যেমন: “الْأَبَوَانِ” (পিতা-মাতা) শব্দে ‘উম্ম’ (মা) আগে আসে, অথচ এর অর্থ গুরুত্বের ভিন্নতা নয়। (তাফসীরে ইবনে কাসীর, তাফসীরে কুরতুবী, তাফসীরে মা’আরিফুল কুরআন)
২. ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও অন্যান্য হানাফি ফকীহগণের মত:
হানাফি মাযহাবে যিনার শাস্তি নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য সমান। বিবাহিত হলে উভয়ের জন্য রজম (পাথর মেরে হত্যা) এবং অবিবাহিত হলে উভয়ের জন্য ১০০টি বেত্রাঘাত ও এক বছর নির্বাসন। কুরআন ও হাদিসে কোথাও নারীর যিনাকে পুরুষের যিনা থেকে বেশি মারাত্মক বলা হয়নি। বরং উভয়কে সমানভাবে কঠোর শাস্তির আদেশ দেওয়া হয়েছে। (রদ্দুল মুহতার, ৪/৩; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ২/১৪৫)
৩. মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.)-এর ব্যাখ্যা:
তাফসীরে মা’আরিফুল কুরআনে (সূরা নূরের ২ নং আয়াতের তাফসীরে) তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, নারীকে আগে উল্লেখ করার অর্থ তার অপরাধের মাত্রা বেশি হওয়া নয়; বরং এটি আরবি ভাষার রীতি এবং আয়াতের প্রসঙ্গগত কারণেও হতে পারে। তিনি আরও বলেন, কোনো কোনো মুফাসসির এটাকে এই অর্থে ব্যাখ্যা করেছেন যে, নারীর লজ্জা ও পর্দার বিষয়টি পুরুষের তুলনায় বেশি স্পর্শকাতর হওয়ায় তাকে আগে উল্লেখ করে সতর্ক করা হয়েছে। কিন্তু এর দ্বারা অপরাধের মাত্রার ভিন্নতা বোঝানো হয়নি।
৪. হাদিসের আলোচনা:
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“لَعَنَ اللَّهُ الزَّانِيَ وَالزَّانِيَةَ” (মুসলিম, আবু দাউদ)
অর্থাৎ, “আল্লাহ অভিশাপ দিয়েছেন ব্যভিচারী পুরুষ ও ব্যভিচারিণী নারীকে।”
এখানে উভয়ের জন্য অভিশাপ সমানভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে, উভয়ের অপরাধ সমান।
উপসংহার:
সুতরাং, আপনার উল্লেখিত বক্তব্য (নারীর যিনা পুরুষের যিনা থেকে বেশি মারাত্মক) সঠিক নয়। কুরআন, হাদিস ও হানাফি ফিকহের আলোকে নারী-পুরুষ উভয়ের যিনা সমান মাত্রার মারাত্মক অপরাধ এবং উভয়ের শাস্তি সমান। কুরআনে নারীকে আগে উল্লেখ করার কারণ ভাষাগত বা প্রসঙ্গগত, অপরাধের মাত্রার তারতম্য নয়।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে পবিত্রতা ও পাপমুক্ত জীবন দান করুন। (আমিন)
রেফারেন্স:
- তাফসীরে মা’আরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি, রহ.), সূরা নূর, ২ নং আয়াতের ব্যাখ্যা
- তাফসীরে ইবনে কাসীর (সূরা নূর, ২)
- রদ্দুল মুহতার (৪/৩), ফাতাওয়া হিন্দিয়া (২/১৪৫)
- সহিহ মুসলিম (হাদিস নং ৩২৮৯), সুনান আবু দাউদ (হাদিস নং ৪৪৬২)
মেটা বর্ণনা:
SEO কীওয়ার্ড:
সূরা নূর, নারী ব্যভিচারিণী, পুরুষ ব্যভিচারী, যিনার হদ্দ, ইসলামে যিনার শাস্তি, নারী-পুরুষের যিনা সমান, কুরআনের ভাষ্য, হানাফি ফিকহ, তাফসীর, ইমাম আবু হানিফা, মুফতি মুহাম্মদ শফি।
SEO সার্চ ফ্রেজ:
সূরা নূরের ২ নং আয়াতে নারীকে আগে উল্লেখ করার কারণ কী? ইসলামে নারী-পুরুষের যিনার শাস্তি কি সমান? ব্যভিচারের শাস্তি কুরআন ও হাদিসে।