মৃত ছেলের সন্তান কি দাদীর সম্পত্তি পাবে?
Family Life · Hanafi
Question
Answer
প্রশ্নের উত্তর
আপনার প্রশ্নটি মূলত মায়ের সম্পত্তির ওয়ারিশানা বণ্টন এবং মানসিক ভারসাম্যহীনতার প্রভাব নিয়ে। নিচে ইসলামী শরিয়ত (হানাফি ফিকহ) অনুযায়ী বিস্তারিত উত্তর দেওয়া হলো।
১. মায়ের সম্পত্তি বণ্টনের মূলনীতি
ইসলামী উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী, মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি তার মৃত্যুর সময় জীবিত থাকা ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টিত হয়। মায়ের ওয়ারিশরা হলেন:
- স্বামী (যদি জীবিত থাকেন)
- পিতা-মাতা (যদি জীবিত থাকেন)
- সন্তান (ছেলে-মেয়ে)
- নাতি-নাতনি (কেবল মৃত ছেলের সন্তানরা নির্দিষ্ট শর্তে, মৃত মেয়ের সন্তানরা দূরবর্তী আত্মীয় হিসেবে)
২. আপনার পরিস্থিতির ব্যাখ্যা
আপনি বলছেন, মা জীবিত কিন্তু মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন। তার চারটি সন্তান (দুই ছেলে ও দুই মেয়ে) মা-এর জীবদ্দশায় মারা গেছে। এখন প্রশ্ন:
- মা-এর মৃত্যুর পর মৃত সন্তানদের সন্তানরা (নাতি-নাতনি) কি মা-এর সম্পত্তি পাবে?
- মা সুস্থ অবস্থায় এক ছেলে ও এক মেয়ে মারা যায় এবং অসুস্থ অবস্থায় আরও এক ছেলে ও এক মেয়ে মারা যায়।
৩. হানাফি ফিকহের বিধান
হানাফি মতে, উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে নাতি-নাতনিদের অবস্থান নিম্নরূপ:
(ক) মৃত ছেলের সন্তান (পিতৃ-পক্ষীয় নাতি-নাতনি)
- ছেলের ছেলে (পৌত্র) ও ছেলের মেয়ে (পৌত্রী) কে ‘আসাবা’ (অবশিষ্টাংশের অধিকারী) হিসেবে গণ্য করা হয়, যদি মৃত ব্যক্তির নিজের কোনো ছেলে জীবিত না থাকে।
- অর্থাৎ, মায়ের মৃত্যুর সময় যদি তার কোনো ছেলে জীবিত না থাকে, তাহলে মৃত ছেলের সন্তানরা (পৌত্র-পৌত্রী) আসাবা হিসেবে সম্পত্তির বাকি অংশ পাবে। ছেলে ও মেয়ের মধ্যে ২ঃ১ অনুপাতে বণ্টন হবে।
(খ) মৃত মেয়ের সন্তান (মাতৃ-পক্ষীয় নাতি-নাতনি)
- মেয়ের ছেলে ও মেয়ের মেয়ে (দৌহিত্র-দৌহিত্রী) হানাফি ফিকহে ‘ধবুল আরহাম’ (দূরবর্তী আত্মীয়)।
- তারা কেবল তখনই পাবে যদি কোনো ফারায়েজি (নির্ধারিত অংশের অধিকারী) বা আসাবা জীবিত না থাকে। অর্থাৎ পৌত্র-পৌত্রী থাকলে দৌহিত্র-দৌহিত্রী বঞ্চিত হবে।
৪. আপনার ক্ষেত্রে প্রয়োগ
ধরি, মা-এর মৃত্যুতে তার কোনো স্বামী বা পিতা-মাতা জীবিত নেই। তাহলে:
- মৃত ছেলেদের সন্তানরা (পৌত্র-পৌত্রী): তারা আসাবা হিসেবে সমস্ত সম্পত্তি পাবে। কারণ মায়ের নিজের কোনো সন্তান জীবিত নেই, আর পৌত্ররা নিকটতম আসাবা। এখানে ছেলের সন্তান (পৌত্র) ও মেয়ের সন্তান (পৌত্রী) উভয়েই অংশ পাবে, তবে ছেলে পাবে দ্বিগুণ।
- মৃত মেয়েদের সন্তানরা (দৌহিত্র-দৌহিত্রী): তারা কোনো অংশ পাবে না, যতক্ষণ না পৌত্র-পৌত্রী বা অন্য কোনো আসাবা থাকে। যেহেতু পৌত্র-পৌত্রী আছে, তাই দৌহিত্র-দৌহিত্রী বঞ্চিত।
ব্যতিক্রম: যদি মায়ের স্বামী বা পিতা-মাতা জীবিত থাকেন, তবে তারা প্রথমে নির্ধারিত অংশ (ফারায়েজ) পাবেন। তারপর অবশিষ্টাংশ পৌত্র-পৌত্রীরা পাবে। দৌহিত্র-দৌহিত্রী তখনও বঞ্চিত।
৫. মানসিক ভারসাম্যহীনতার প্রভাব
- মৃত্যুর পর বণ্টনের ক্ষেত্রে: মায়ের মানসিক অবস্থা উত্তরাধিকার আইনকে পরিবর্তন করে না। সম্পত্তি বণ্টন হবে তার মৃত্যুর সময়কার ওয়ারিশদের ভিত্তিতে।
- জীবদ্দশায় দান-ওসিয়ত: মা যদি মানসিকভাবে সুস্থ না থাকেন, তবে তার পক্ষে কোনো বৈধ দান (হেবা) বা ওসিয়ত (উইল) করা সম্ভব নয়, কারণ শরিয়তে দান-ওসিয়তের জন্য সুস্থ মস্তিষ্ক শর্ত। তাই তার সম্পত্তি তার জীবদ্দশায় অপরিবর্তিত থাকবে এবং মৃত্যুর পর স্বাভাবিক নিয়মে বণ্টিত হবে।
৬. হানাফি কিতাবের রেফারেন্স
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন): “পৌত্ররা (ইবনুল ইবন) আসাবা, তারা পুত্রের স্থলাভিষিক্ত হয় যখন পুত্র না থাকে। পৌত্রীরাও পুত্রের সাথে আসাবা হয়।” (খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৭৬৬)
- ফাতাওয়া আলমগীরী (হিদায়া): “মৃত ব্যক্তির পুত্র না থাকলে পৌত্রগণ আসাবা হয়। আর মৃত মেয়ের সন্তানরা ধবুল আরহাম, তারা কেবল অন্য কোনো ওয়ারিশ না থাকলে পায়।” (খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৪৪৮)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী): “মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির দান-ওসিয়ত বৈধ নয়; তার সম্পত্তি মৃত্যুর পর ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টিত হবে।” (খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২১২)
৭. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
- শুধু মৃত ছেলের সন্তানরা (পৌত্র-পৌত্রী) মায়ের সম্পত্তি পাবে, যদি মায়ের স্বামী ও পিতা-মাতা জীবিত না থাকেন। তবে তাদের মধ্যে ছেলে ও মেয়ের অনুপাত ২ঃ১ হবে।
- মৃত মেয়ের সন্তানরা (দৌহিত্র-দৌহিত্রী) পাবে না, কারণ তারা পৌত্রদের দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত (মাহজুব) হয়।
- মায়ের মানসিক অবস্থার কারণে জীবদ্দশায় সম্পত্তি হস্তান্তর বৈধ নয়, তবে মৃত্যুর পর বণ্টনে কোনো প্রভাব পড়ে না।
উত্তর: প্রশ্নে বর্ণিত অবস্থায়, মা জীবিত থাকাবস্থায় তার সম্পত্তি বণ্টন হবে না; মৃত্যুর পর মৃত ছেলেদের সন্তানেরা (পৌত্র-পৌত্রী) পাবে, মৃত মেয়েদের সন্তানেরা পাবে না।