অনিচ্ছাকৃত কুফরী বললে ঈমান নষ্ট হবে কি?
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
উত্তর
না, অনিচ্ছাকৃতভাবে বা বেখেয়ালে কুফরী কথা বললে বা কুফরী কাজ করলে ঈমান নষ্ট হয় না। হানাফি মতে, ভুল, বিস্মৃতি, অসাবধানতা ও অনিচ্ছায় সংঘটিত কুফরী উক্তি বা কাজ ঈমানের ক্ষতি করে না। তবে শর্ত হলো, ব্যক্তি সেটি কুফরী বলে জানত না বা বুঝতে পারেনি। যদি পরে বুঝতে পারে যে এটি কুফরী ছিল, তবুও সে সময় না বোঝার কারণে তার ঈমান অক্ষত থাকে।
দলিল-প্রমাণ
১. কুরআন ও হাদিসের সাধারণ নীতি
-
হাদিস: নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেছেন: "إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ عَنْ أُمَّتِي الْخَطَأَ وَالنِّسْيَانَ وَمَا اسْتُكْرِهُوا عَلَيْهِ"
"নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের ভুল, বিস্মৃতি ও জোরপূর্বককৃত কাজ মাফ করে দিয়েছেন।" (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২০৪৩; সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস: ৭২১৯)
এই হাদিস স্পষ্টভাবে ভুল ও বিস্মৃতির দায়িত্ব মুমিনের ওপর থেকে সরিয়ে দেয়। -
কুরআন: সূরা বাকারার শেষ আয়াতে ইরশাদ হয়েছে: "رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِن نَّسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا" (২:২৮৬)
“হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা যদি ভুলে যাই বা ভুল করি তবে আমাদের পাকড়াও করো না।” আল্লাহ এর জবাবে বলেন: “আমি তা করেছি” (মুসলিম)।
২. হানাফি ফিকহের উসুল
-
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও তাঁর শিষ্যদের মতে, কুফরী শব্দ উচ্চারণ করলেও যদি তা ইচ্ছাকৃত না হয়, বা অর্থ না জেনে বলা হয়, তবে ঈমান নষ্ট হয় না। বরং ইচ্ছা (নিয়্যত) ও জ্ঞান-বুদ্ধি থাকা শর্ত।
-
ফাতাওয়া শামী (রদ্দুল মুহতার):
"وَإِذَا تَكَلَّمَ بِكَلِمَةِ الْكُفْرِ سَاهِيًا أَوْ نَاسِيًا أَوْ مُكْرَهًا لَا يَكْفُرُ"
“যদি কেউ কুফরী শব্দ ভুলে বা বিস্মৃত হয়ে বা জোরপূর্বক উচ্চারণ করে, তবে সে কাফির হয় না।” (রদ্দুল মুহতার, ৪/২২৪, কিতাবুল জিহাদ, বাবুল মুরতাদ) -
আল-হিদায়া ও ফাতাওয়া আলমগিরি-তেও অনুরূপ নীতি বর্ণিত হয়েছে:
"الساهي والناسي والمكره لا يكفرون بقول الكفر"
“অসাবধান, ভুলকারী ও বাধ্যগত ব্যক্তি কুফরী বললেও কাফির হয় না।” (আল-হিদায়া, ২/১৭৪; ফাতাওয়া আলমগিরি, ২/২৫০)
৩. ইমদাদুল ফাতাওয়া ও ফাতাওয়া উসমানি
-
হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী (রহ.) ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/২৬৪) তে লিখেছেন:
“যদি কেউ বেখেয়ালে বা অর্থ না জেনে কুফরী শব্দ মুখ দিয়ে ফেলে, তাহলে সে কাফির হবে না। তবে যদি জানা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে বলে, তাহলে ঈমান চলে যায়।” -
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) মাআরিফুল কুরআন (৮/৮৫৪-৮৫৫) তে উল্লেখ করেছেন:
“ভুল ও অসাবধানতাকে সাধারণত ইসলামে ক্ষমা করা হয়েছে। যদি কেউ কুফরী শব্দ বলে ফেলে কিন্তু তার অর্থ বুঝেনি, তাহলে তার ঈমান অক্ষত থাকবে। তবে পরে বুঝলে তওবা করা উত্তম।”
৪. মুফতি তাকি উসমানি (দা. বা.)-এর বক্তব্য
“অনিচ্ছাকৃত, অসাবধানতাবশত বা অর্থ না জেনে কুফরী কথা বলা ঈমান নষ্ট করে না। কারণ কুফরী হওয়ার জন্য ইচ্ছা ও জ্ঞান উভয়ই প্রয়োজন।” (ফাতাওয়া উসমানি, ১/২২৪)
ব্যাখ্যা
বাংলায় ‘অনিচ্ছাকৃত’ অর্থ হলো – মুখ ফসকে এমন কথা বেরিয়ে পড়া যা কুফরী, অথচ মন থেকে তা বলা হয়নি। ‘বেখেয়ালে’ অর্থ হলো – অসাবধানতায় বা চিন্তা না করে কথা বলা। এই দুটোই ফিকহের ‘সাহু’ (ভুল) ও ‘নিসইয়ান’ (বিস্মৃতি) –এর আওতাভুক্ত। যেহেতু ইচ্ছা (ইরাদা) ও জ্ঞান (ইলম) বিদ্যমান নয়, তাই ঈমান ভঙ্গের জন্য দায়ী করা হয় না।
তবে সতর্কতা:
- যদি ব্যক্তি পরে বুঝতে পারে যে উক্ত বাক্যটি কুফরী ছিল, তখন তার জন্য কর্তব্য হলো তওবা করা ও ঈমান নবায়ন করা (অর্থাৎ কলেমা পড়া) যাতে অন্তরে কোনো সন্দেহ না থাকে।
- তবে শরিয়তে তা ফরজ নয়, বরং মুস্তাহাব। কেননা ঈমান নষ্টই হয়নি, তাই তওবা করে নিশ্চিত হয়ে নেওয়া ভালো।
সংক্ষিপ্ত উত্তর
প্রশ্ন: অনিচ্ছাকৃতভাবে বা বেখেয়ালে কুফরী কথা বললে বা কাজ করলে ঈমান নষ্ট হয়?
উত্তর: না, হানাফি মতে ঈমান নষ্ট হয় না। তবে ইচ্ছাকৃত ও সচেতনভাবে কুফরী কথা বলা বা কাজ করা ঈমান নষ্ট করে। পরে বুঝতে পারলেও সেই সময় না বোঝার কারণে ঈমান অক্ষত থাকে; কেবল তওবা করে নেওয়া উত্তম।
সতর্কীকরণ
এই ফতোয়া শুধুমাত্র অনিচ্ছাকৃত ও অসাবধানতাজনিত অবস্থার জন্য প্রযোজ্য। যদি কেউ কুফরী কথার অর্থ জেনেও হাসি-ঠাট্টায় বা মজায় বলে, তাহলে তা ইচ্ছাকৃত বলে গণ্য হবে এবং হানাফি মতে ঈমান চলে যায়। (রদ্দুল মুহতার, ৪/২২৫)
আল্লাহই ভালো জানেন