শিয়া কিংবা বিদআতিদের জানাযার নামাযে অংশগ্রহণ করা কি জায়েয?
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
প্রশ্ন: যে কোনো মাযহাব অনুযায়ী শিয়া কিংবা বিদআতিদের খায়েবা জানাজা পড়ানো জায়েজ?
উত্তর:
আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর হলো: শিয়া বা বিদআতীদের জানাজা পড়ানো জায়েজ, তবে শর্তসাপেক্ষে। তবে এখানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খেয়াল রাখতে হবে:
১. শিয়া ও বিদআতীদের শ্রেণীবিভাগ
- যারা কুফরি আকিদা পোষণ করে: যেমন যারা সাহাবায়ে কেরামকে (রাদি.) গালি দেয়, কুরআনে পরিবর্তন বিশ্বাস করে, বা ইমামদেরকে নবীর সমান বা তার চেয়ে বেশি শ্রেষ্ঠ মনে করে—এরা ইসলামের গণ্ডির বাইরে চলে যায়। এদের জানাজা পড়া জায়েজ নয় এবং তাদেরকে মুসলিম কবরস্থানেও দাফন করা যাবে না।
- যারা বিদআতি হলেও কুফরি পর্যায়ে পৌঁছায়নি: যেমন কিছু ফিকহি বা আমলি বিদআত করে, কিন্তু তাওহিদ ও রিসালাতের মূলনীতি মানে। এদের জানাজা পড়ানো যাবে।
২. হানাফি ফিকহের বিধান
হানাফি মাজহাবের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থসমূহে এসেছে:
"أهل البدعة والأهواء إن كانوا كفاراً كالرافضة الذين يسبون الصحابة فلا يصل عليهم. وإن كانوا مبتدعة كالخوارج والقدرية والمعتزلة فيصل عليهم، لأنهم من المسلمين." অর্থ: “বিদআতি ও ভ্রান্ত পথের অনুসারীদের মধ্যে যারা কাফির (যেমন রাফেজী যারা সাহাবীদের গালি দেয়), তাদের জানাজা পড়া যাবে না। আর যারা বিদআতি কিন্তু কাফির নয় (যেমন খারিজি, কাদারিয়া, মুতাজিলা), তাদের জানাজা পড়া যাবে, কারণ তারা মুসলিম।”
(রদ্দুল মুহতার : ২/২৩২, ফাতাওয়া হিন্দিয়া : ১/১৬১)
৩. শিয়া প্রসঙ্গে
শিয়াদের মধ্যে অনেক দল আছে।
- ইসনা আশারিয়া (বারো ইমামি) শিয়া: যারা কুরআন পরিবর্তন বিশ্বাস করে এবং সাহাবীদের গালি দেয়, তাদেরকে কাফির গণ্য করা হয়। তাদের জানাযা পড়ানো বা তাদের জানাযাতে শরীক হওয়া জায়েয নয়।
- যায়দি শিয়া: যারা মধ্যপন্থী, তাদের জানাযা জায়েয।
- বর্তমান প্রেক্ষাপট: সাধারণভাবে শিয়া সম্প্রদায়ের ব্যাপারে ফকিহরা বলেন, যদি তাদের মধ্যে কুফরি আকিদা (যেমন সাহাবাকে গালি) স্পষ্ট না হয়, তাহলে তাদের মুসলিম গণ্য করে জানাযা পড়া যাবে। কিন্তু যদি কুফরি আকিদা নিশ্চিতভাবে জানা যায়, তাহলে জায়েয হবে না।
৪. গায়েবানা (মৃত ব্যক্তি) জানাজা পড়ানোর হুকুম
- বিদআতি মুসলিম: তার জানাজা পড়া মাকরুহ তানজিহি হতে পারে যদি বিদআত বড় হয়, তবে পড়লে গুনাহ নেই এবং জানাজা আদায় হয়ে যায়।
- কাফির: তার জানাজা পড়া সম্পূর্ণ হারাম।
৫. হানাফি উসুল অনুযায়ী কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
- ভালো-মন্দের বিচার না করা: যেহেতু শিয়া বা বিদআতি ব্যক্তি মৃত্যুর সময় তওবা করে থাকতে পারে, তাই চূড়ান্ত বিচার না করে সাধারণ মুসলিমদের মতো তাদের জানাজা পড়া যাবে। একে অপরকে ‘কাফির’ বলা থেকে বিরত থাকতে হবে।
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর নীতি: তিনি বলেছেন, “আমরা কাউকে ততক্ষণ কাফির বলি না, যতক্ষণ না তার কুফরি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়।”
সারসংক্ষেপ:
- যদি শিয়া বা বিদআতি ব্যক্তি সাহাবায়ে কেরামকে গালি দেয়, কুরআন পরিবর্তন বিশ্বাস করে, বা প্রকাশ্যে কুফরি করে, তাহলে তার জানাজা পড়া জায়েজ নয়।
- যদি সে বিদআতি হয় কিন্তু কুফরি পর্যায়ে না যায় (যেমন আমলের ক্ষেত্রে বিভ্রান্ত), তাহলে তার জানাজা পড়া জায়েজ। কিছু ফকিহের মতে এটি মাকরুহ তানজিহি হলেও ছেড়ে দেওয়া ভালো।
- উত্তম পন্থা: অমুসলিম বা ঘোষিত কাফির না হলে এবং তার মধ্যে কুফরি আকিদা সুস্পষ্ট না জানা গেলে, তাকে মুসলিম ভেবে জানাজা পড়া এবং দাফন করা উচিত।
রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন) : ২/২৩২
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগিরি) : ১/১৬১
- ফাতাওয়া উসমানী : ২/৪৫২
- ইমদাদুল ফাতাওয়া : ১/১৬৫
**আল্লাহ তায়ালা আমাদের সঠিক বুঝ দান করুন। (আমিন)