হায়েজ অবস্থায় কুরআনের সিজদার আয়াত শুনলে বা বাংলা অনুবাদ পড়লে করণীয় কী?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
Answer
হায়েজ অবস্থায় কুরআনের সিজদা: কী করবেন?
আপনার প্রশ্ন: হায়েজ (মাসিক) অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত শুনলে বা বাংলা অনুবাদ পড়লে সিজদার আয়াত এলে কী করবেন?
এটি হানাফি মাজহাব অনুযায়ী একটি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা। নিচে বিস্তারিত দলিলসহ উত্তর দেওয়া হলো।
১. মূলনীতি: সিজদায়ে তিলাওয়াতের শর্তাবলি
হানাফি মাজহাব মতে, সিজদায়ে তিলাওয়াত (কুরআনের সিজদার আয়াত পড়লে বা শুনলে যে সিজদা করা ওয়াজিব) নামাযের মতোই পবিত্রতা (তাহারাত) শর্ত। অর্থাৎ,
- ওযু থাকা (নামাজের মতো ছোট-বড় নাপাকি থেকে পবিত্র থাকা),
- কেবলামুখী হওয়া,
- সতর ঢাকা,
- নিয়ত করা—এগুলো সিজদা শুদ্ধ হওয়ার জন্য জরুরি।
(সূত্র: ‘আল-হিদায়া’, ১/১১৮; ‘রদ্দুল মুহতার’, ২/১০৩; ‘ফাতাওয়া হিন্দিয়া’, ১/১২২)
তাই হায়েজ অবস্থায় (যা বড় নাপাকি) কেউ সিজদার আয়াত পড়লে বা শুনলে সিজদায়ে তিলাওয়াত করা জায়েয নয় কারণ পবিত্রতা শর্ত পূরণ হয়নি।
২. হায়েজ অবস্থায় সিজদার আয়াত শুনলে করণীয়
যদি আপনি হায়েজ অবস্থায় আরবি কুরআনে সিজদার আয়াত (যেমন সূরা আলাকের শেষ আয়াত, সূরা ইনশিকাকের ২১ নং আয়াত ইত্যাদি) তিলাওয়াত শোনেন—তবে আপনার ওপর সিজদায়ে তিলাওয়াত ওয়াজিব হয় না; বরং আপনি শুধু ‘সুবহানাল্লাহ’ বা ‘আল্লাহু আকবর’ বলে নিন এবং এর দ্বারাই সিজদার কর্তব্য আদায় হয়ে যাবে। পরে হায়েজ শেষে কোনো কাযা সিজদা করতে হবে না।
দলিল:
-
ইমাম আবু হানীফা (রহ.) ও তাঁর শিষ্যদের মতে, সিজদায়ে তিলাওয়াত নামাযের মতোই পবিত্রতা চায়। তাই অপবিত্র ব্যক্তি (জুনুবি, হায়েজ, নিফাস) সিজদা করতে পারবে না; বরং ‘সুবহানাল্লাহ’ বলে দিলে তা যথেষ্ট। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/১২২; ‘আল-বাহরুর রায়িক’, ২/২১৫; ‘রদ্দুল মুহতার’, ২/১০৮)
-
ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.) বলেন: অপবিত্র অবস্থায় সিজদা ওয়াজিব নয়, বরং তাসবীহ পাঠ করাই উত্তম। (শরহু মা‘আনিল আসার, ২/৫২)
সারকথা: হায়েজ অবস্থায় কুরআনের সিজদার আয়াত শুনলে আপনার ওপর কোনো সিজদা ওয়াজিব নয়। আপনি ‘সুবহানাল্লাহ’ (তিনবার) পড়ে নিন। অথবা চাইলে ‘সুবহানা রাব্বিয়াল আ’লা’ও পড়তে পারেন।
৩. বাংলা অনুবাদ পড়লে সিজদা আসে কি?
না, বাংলা অনুবাদ বা তাফসির পড়লে সিজদার আয়াতের অর্থ পড়লেও সিজদায়ে তিলাওয়াত ওয়াজিব হয় না। কারণ সিজদা শুধুমাত্র আরবি কুরআনের মূল বাক্যের জন্যই নির্ধারিত। বাংলা অনুবাদ কুরআনের অংশ নয়, তাই তা পড়লে কোনো সিজদা ওয়াজিব হয় না।
(সূত্র: ‘ইমদাদুল ফাতাওয়া’, ১/১১২; ‘ফাতাওয়া উসমানী’, ২/১৫৪; ‘আহসানুল ফাতাওয়া’, ২/৪৩০)
সুতরাং হায়েজ অবস্থায় বাংলা অনুবাদ পড়লে বিশেষ কোনো কাজ করতে হবে না, স্বাভাবিকভাবে পড়া চালিয়ে যেতে পারেন।
৪. হায়েজ অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত ও শোনার বিধান
- কুরআন শোনা: হায়েজ অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত শোনা জায়েয, বরং উত্তম। আপনি নির্বিঘ্নে কুরআন শুনতে পারেন।
- কুরআন পড়া (স্পর্শ ও তিলাওয়াত): হানাফি মতে হায়েজ অবস্থায় কুরআনের আয়াত (আরবি) মুখে উচ্চারণ করে পড়া নিষিদ্ধ, যদিও অভিধান বা মোবাইল থেকে দেখে মনে মনে পড়া যায়। (বাহিশতি যেওয়ার, ১/১০৩)
৫. ব্যবহারিক নির্দেশনা
- আরবি কুরআন শুনলে সিজদার আয়াত এলে: ‘সুবহানাল্লাহ’ (তিনবার) বলুন অথবা চুপ থাকুন। কোনো ভাবেই সিজদা করবেন না। পরে হায়েজ শেষে সিজদার প্রয়োজন নেই।
- বাংলা অনুবাদ পড়লে: কোনো সিজদার প্রয়োজন নেই।
- যদি নিজেই আরবি সিজদার আয়াত পড়েন (যা নিষিদ্ধ), তবে ভুলে পড়ে ফেললে: থেমে ‘সুবহানাল্লাহ’ বলুন এবং আর পড়বেন না।
সারসংক্ষেপ:
হায়েজ অবস্থায় কুরআনের সিজদার আয়াত (আরবি) শুনলে সিজদা করা নিষিদ্ধ।
এক্ষেত্রে আপনার উপর সেজদা আবশ্যক হবেনা।
‘সুবহানাল্লাহ’ পাঠ করলেই কর্তব্য আদায় হবে। বাংলা অনুবাদ পড়লে সিজদার বিষয়টিই প্রযোজ্য নয়। আল্লাহ তাআলা সহজ করুন।
(উত্তরটি ‘ফাতাওয়া উসমানী’, ‘রদ্দুল মুহতার’, ‘আল-হিদায়া’, ‘ফাতাওয়া হিন্দিয়া’ ও ‘বাহিশতি যেওয়ার’—প্রভৃতি নির্ভরযোগ্য হানাফি কিতাবের আলোকে প্রদত্ত।)