ছেলে বাচ্চাদের সাথে পর্দা ইস্যু
Family Life · Ahle Hadith / Salafi
Question
Answer
উত্তর: ভাসুরের ছেলের সাথে পর্দার বিধান
ওয়াই-আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিম্নে কুরআন, সহীহ হাদীস এবং প্রখ্যাত সালাফী আলিমগণের মতামতের আলোকে বিস্তারিত উত্তর প্রদান করা হলো:
১. ভাসুরের ছেলের সাথে পর্দার বিধান (গায়রে মাহরাম)
ভাসুরের ছেলে আপনার গায়রে মাহরাম। কারণ সে আপনার স্বামীর ভাইয়ের ছেলে, যা মাহরামদের তালিকায় পড়ে না। কুরআনে মাহরামদের তালিকা স্পষ্টভাবে উল্লেখিত হয়েছে:
"আর তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তবে যা সাধারণত প্রকাশ পায় তা ছাড়া। আর তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বুকের উপর ফেলে রাখে এবং তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, নিজেদের পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভাই, ভাইয়ের পুত্র, বোনের পুত্র, নিজেদের স্ত্রী ও অধীনস্থ দাসী এবং পুরুষদের মধ্যে যারা স্ত্রী-কামনা রহিত হয়েছে তাদের সামনে ছাড়া কারো কাছে নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে..." (সূরা আন-নূর, ৩১)
এই আয়াতে ভাসুরের ছেলে (স্বামীর ভাইয়ের ছেলে) মাহরাম হিসেবে উল্লেখিত হয়নি। তাই তিনি অমাহরাম এবং তার সামনে পূর্ণ পর্দা করা ওয়াজিব।
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহঃ) বলেন:
"ভাসুর ও ভাসুরের পুত্র - তারা উভয়েই নারীর জন্য অমাহরাম। তাদের সামনে পর্দা করা ফরয।"[^1]
শায়খ ইবনু বায (রহঃ) বলেন:
"নারীর জন্য তার স্বামীর ভাই ও ভাইয়ের ছেলে এবং অন্যান্য অমাহরাম পুরুষদের সামনে পর্দা করা ফরয। তাদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ জায়েয নয়।"[^2]
২. বয়স ৭ বছরের বেশি হলে পর্দার বিধান
যখন ছেলেটির বয়স ৭ বছর অতিক্রম করছে, তখন এটি তাময়ীয (প্রাপ্তবয়স্ক নয় কিন্তু ভালো-মন্দ বোঝে) বয়স। এই বয়সে শিশুরা নারী-পুরুষের পার্থক্য বুঝতে শুরু করে। তাই এই বয়স থেকে পর্দার বিধান আরও কঠোর হয়ে যায়।
শায়খ ইবনু উসাইমীন (রহঃ) বলেন:
"যখন শিশু বালেগ হওয়ার কাছাকাছি বয়সে পৌঁছে যায় এবং নারীদের প্রতি আকর্ষণ বোধ করে, তখন তার সাথে পর্দা করা আবশ্যক।"[^3]
একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদীস: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
"তোমাদের সন্তানদের সাত বছর বয়সে সালাতের আদেশ দাও এবং দশ বছর বয়সে (নাপালন করলে) তাদের প্রহার করো এবং তাদের বিছানা পৃথক করে দাও।" (আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৯৫; সহীহ আল-আলবানী)
এই হাদীসে সাত বছর বয়সে বিছানা পৃথক করার নির্দেশ ইঙ্গিত করে যে এই বয়স থেকে পর্দা ও লজ্জাস্থানের প্রতি সচেতনতা তৈরি করা উচিত।
৩. হিজাব যথেষ্ট নাকি নিকাব প্রয়োজন?
৭ বছরের শিশুর জন্য: শুধু হিজাব (মাথা ও গলা ঢাকা) যথেষ্ট। নিকাব (মুখমণ্ডল ঢাকা) ফরয নয়। কারণ এই বয়সের শিশু সাধারণত বুলুঘের কাছাকাছি নয় এবং তার মধ্যে যৌন আবেদন সৃষ্টির আশঙ্কা কম।
তবে শর্ত: আপনার পোশাক সম্পূর্ণভাবে শরীয়তসম্মত হতে হবে:
- পুরো শরীর ঢাকা (হাত-পা ও মুখমণ্ডল ব্যতীত, অনেক সালাফী আলিমের মতে মুখমণ্ডলও ঢাকা উচিত)
- ঢিলেঢালা পোশাক যা শরীরের গঠন প্রকাশ করে না
- মোটা ও অস্বচ্ছ কাপড়
- আকর্ষণীয় ও জাঁকজমকপূর্ণ না হওয়া
শায়খ সালেহ আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন:
"যে ছেলে এখনও বালেগ হয়নি কিন্তু বুঝতে শুরু করেছে, তার সামনে নারীর জন্য আবশ্যক হলো মুখমণ্ডল ও হাত ছাড়া পুরো শরীর ঢাকা। তবে মুখমণ্ডল ঢাকার প্রয়োজন নেই যদি ফিতনার আশঙ্কা না থাকে। কিন্তু সতর্কতা হলো মুখমণ্ডলও ঢাকা।"[^4]
৪. কণ্ঠস্বরের পর্দার বিধান
কণ্ঠস্বরের পর্দা সাধারণত বালেগ বা বুলুঘের কাছাকাছি বয়স থেকে প্রযোজ্য। তবে নিরাপত্তার জন্য আগে থেকেই অভ্যস্ত হওয়া ভালো।
কুরআনে নির্দেশ:
"হে নবীর স্ত্রীগণ! তোমরা অন্য নারীদের মতো নও। যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, তবে পরপুরুষের সাথে নরম স্বরে কথা বলো না, যার অন্তরে রোগ আছে সে প্ররোচিত হতে পারে। আর তোমরা ন্যায়সংগত কথা বলো।" (সূরা আল-আহযাব, ৩২)
শায়খ ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ) বলেন:
"নারী যখন অমাহরাম পুরুষের সাথে এমন স্বরে কথা বলে যা আকর্ষণীয় ও চিত্তহারী, তখন তা হারাম।"[^5]
শায়খ আলবানী (রহঃ) বলেন:
"শিশু যখন বালেগ হওয়ার কাছাকাছি পৌঁছে এবং নারী-পুরুষের বিষয় বুঝতে শুরু করে, তখন তার সাথে কণ্ঠস্বরেও পর্দা করতে হবে।"[^6]
৭ বছরের শিশুর জন্য: এখনই কণ্ঠস্বরের পর্দা আবশ্যক নয়, তবে অভ্যাস গড়ে তোলার জন্য সংযত স্বরে কথা বলা উত্তম। যখন শিশু বয়ঃসন্ধিকালে (প্রায় ১০-১২ বছর) পৌঁছাবে, তখন কণ্ঠস্বরের পর্দা আবশ্যক হবে।
৫. সারসংক্ষেপ ও ব্যবহারিক নির্দেশনা
| বিষয় | বিধান | |-------|--------| | ভাসুরের ছেলে | গায়রে মাহরাম; পর্দা ফরয। তবে তার বয়স যেহেতু ৭+ বছর ৮ বছরও নয়,তাই তার সামনে পূর্ণ পর্দা ফরজ নয়,শুধু হিজাব পরিধান করাই যথেষ্ট। নিকাব আবশ্যক নয়। | মুখমণ্ডল | অধিকাংশ সালাফী আলিমের মতে ঢাকা উত্তম | | কণ্ঠস্বর | বুলুগের সময় থেকে পর্দা ওয়াজিব | | বর্তমানে করণীয় | ঢিলেঢালা হিজাব পরে থাকুন, শিশুকে পর্দার প্রতি সচেতন করুন |
ব্যবহারিক পরামর্শ:
- আপনার ভাসুরের ছেলের সামনে হিজাব (মাথা, গলা ও পুরো শরীর) দিয়ে থাকুন
- মুখমণ্ডল ঢাকার প্রয়োজন নেই, তবে উত্তম হলো ঢাকা
- শিশুটির সাথে সাধারণ ও সোজাসাপ্টা স্বরে কথা বলুন
- ধীরে ধীরে শিশুটিকে বুঝিয়ে দিন যে বয়স বাড়ার সাথে সাথে পর্দা আরও কঠোর হবে
- দশ বছর বয়সের পর থেকে কণ্ঠস্বরে পর্দা করবেন।
রেফারেন্স আলিমগণ:
- শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহঃ)
- ইবনুল কাইয়্যিম (রহঃ)
- শায়খ ইবনু বায (রহঃ)
- শায়খ আলবানী (রহঃ)
- শায়খ ইবনু উসাইমীন (রহঃ)
- শায়খ সালেহ আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ)
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে পর্দার ব্যাপারে সচেতন ও আমলকারী করুন। আমীন।
[^1]: মাজমুউ ফাতাওয়া, ৩২/৩৯ [^2]: মাজমুউ ফাতাওয়া ইবনে বায, ২১/২৯১ [^3]: ফাতাওয়া নুরুন আলাদ দারব, ১২/২৫ [^4]: আল-মুনতাকা, ৩/১৬৫ [^5]: ইগাছাতুল লাহফান, ১/১১৯ [^6]: সিলসিলাতুল হুদা ওয়ান নূর, টেপ নং ৫৩৪