বার বার ছাড়ি দিব,চলে যাও,তোমার সাথে সংসার করতে চাই না বললে কি তালাক হয়ে যায়?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমি আল্লাহ কাছে কি চাইব আমি বুঝতিসি না
আদো কি বিয়ে টা আছে যে আমি চাইব জানিনা।জাযাকাল্লাহ খাইর
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রথমত, আপনার দীর্ঘ কষ্টের বিবরণ শুনে আমরা খুবই ব্যথিত। আল্লাহ তাআলা আপনার ধৈর্য ও ঈমানের বিনিময়ে উত্তম প্রতিদান দিন। নিম্নে আপনার প্রশ্নগুলোর জবাব দেওয়া হলো—
১. ‘ছাড়ি দিব’, ‘সংসার করব না’ বললে কি তালাক হয়?
আপনার স্বামী বারবার যে শব্দগুলো বলেছে, সেগুলোর বিস্তারিত বিশ্লেষণ জরুরি:
-
“আই তুরে ছাড়ি দিয়ুম” = “আমি তোকে ছাড়ি দিলাম।”
এটি আরবি ‘তালাক’ শব্দের বাংলা পরিভাষা। হানাফি ফিকহে তালাকের সরীহ (স্পষ্ট) শব্দ হিসেবে গণ্য। এর জন্য নিয়ত বা ইচ্ছার প্রয়োজন নেই; উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গেই তালাক পতিত হয়।
(রদ্দুল মুহতার, ৩/২৫৪; ফাতাওয়া উসমানি, ২/৫৮৯) -
“তুর লগে সংসার নো গইজ্জম” = “তোর সঙ্গে সংসার করব না।”
এটি কিনায়াহ (আপেক্ষিক) শব্দ। এতে তালাক পতিত হবে না, যদি না স্বামী তালাকের নিয়ত করে। তবে আপনার বর্ণনায় তিনি বারবার “ছাড়ি দিব” বলেছেন, যা সরীহ।
সুতরাং: তিনি যখনই সরীহ শব্দে “আমি তালাক দিলাম” বা “ছাড়ি দিলাম” বলেছেন, তখনই একটি তালাক পতিত হয়েছে। যেহেতু তিনি একাধিকবার এ কথা বলেছেন, তাই প্রতিটি পৃথক occasion-এ নতুন তালাক গণ্য হবে যদি না তিনি একই مجلسে (একই বসায়) বারবার বলেন। তবে তার ঠিক সংখ্যা ও পরিস্থিতি স্পষ্ট নয়। তাই আপনার জন্য অতি জরুরি যে আপনি একজন স্থানীয় বিশ্বস্ত আলেম বা মুফতির কাছে গিয়ে পুরো ঘটনা বিস্তারিত বলুন, যাতে তিনি সঠিক ফতোয়া দিতে পারেন।
গর্ভাবস্থায় তালাকের বিধান:
গর্ভবতী স্ত্রীকে তালাক দিলে তা শরিয়তে বৈধ। ইদ্দত হবে সন্তান প্রসব পর্যন্ত। (সূরা তালাক: ৪; আল-হিদায়া, ২/২৮১)
২. বর্তমান বিবাহের অবস্থা কী?
যেহেতু তাঁর তালাকের উচ্চারণ পুনরায় পুনরায় হয়েছে, তাই সম্ভবত আপনার বিবাহ ইতিমধ্যে ভেঙে গেছে। কিন্তু একাধিকবার তালাক দেওয়ার কারণে যদি তিন তালাক পূর্ণ হয়ে থাকে, তাহলে পুনরায় বিবাহ সম্ভব নয় (মহল্লা ছাড়া)। আর যদি এক বা দুই তালাক হয়ে থাকে, তাহলে ইদ্দতের মধ্যে ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ আছে অথবা নতুন করে নিকাহ করতে হবে।
তবে তিনি এখন যোগাযোগ করছেন না, ভরণপোষণ দিচ্ছেন না, মারধর করছেন—এসব অবস্থায় আপনার পক্ষে খুলা (স্ত্রীর পক্ষ থেকে বিবাহ বিচ্ছেদ) বা ফাসখ (বিচারকের মাধ্যমে বিবাহ ভঙ্গ) করার অধিকার আছে। বিশেষ করে তাঁর মাদকাসক্তি, শারীরিক নির্যাতন, ভরণপোষণ না দেওয়া—এসব বৈধ কারণ।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, স্বামী যদি স্ত্রীর অধিকার আদায় না করে এবং নির্যাতন করে, তাহলে স্ত্রী বিচারকের কাছে বিবাহ ভঙ্গের আবেদন করতে পারে। (আল-হিদায়া, ২/১৫৭; ফাতাওয়া আলমগিরি, ১/৫৪৬)
৩. আমি আল্লাহ কাছে কী চাইব?
আপনি বলেছেন, “আমি বুঝতেছি না কী করব।” এ অবস্থায় আপনি নিচের দোয়াগুলো করুন—
দোয়া:
“রাব্বানা হাব লানা মিন আযওয়াজিনা ওয়া যুররিয়্যাতিনা কুররাতা আ’ইনিন ওয়াজ্আলনা লিলমুত্তাক্বিনা ইমামা”
(সূরা ফুরকান: ৭৪)
অর্থ: “হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের মাধ্যমে আমাদের চোখ শীতল করুন এবং আমাদের মুত্তাকিদের জন্য আদর্শ করুন।”
সূরা তালাকের শেষ আয়াত (৬৫:২-৩) বেশি পড়ুন:
“ওয়া মাই ইয়াত্তাকিল্লা-হা ইয়াজ্আল্লাহু মাখরাজা, ওয়া ইয়ারযুক্বহু মিন হাইসু লা ইয়াহতাসিব…”
অর্থ: “যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ বের করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও করে না।”
আপনার জন্য সবচেয়ে ভালো কাজ হলো—
- ইস্তিখারা করুন (তাহাজ্জুদের পর দুই রাকাত নফল পড়ে আল্লাহর কাছে সঠিক সিদ্ধান্ত চান)।
- পরামর্শ নিন আলেম ও জ্ঞানী ব্যক্তির কাছ থেকে।
- আপনার মেয়ের ভবিষ্যৎ ও নিজের দ্বীনি ও দুনিয়াবি কল্যাণের দিকে খেয়াল রাখুন।
৪. বিবাহ কি টিকিয়ে রাখা উচিত?
শরিয়ত বিবাহ টিকিয়ে রাখার প্রতি উৎসাহ দেয়, কিন্তু শর্ত হলো স্বামী স্ত্রীর ওপর অত্যাচার করলে, দায়িত্ব পালন না করলে, ধর্মীয় পথে না থাকলে তা সহ্য করা জরুরি নয়। আপনার স্বামী যদি মাদকাসক্ত, মারধরকারী এবং ভরণপোষণ না দেয়, তবে তাঁর সঙ্গে জীবন যাপন করা আপনার জন্য কঠিন ও ক্ষতিকর।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“লা দারারা ওয়া লা দিরার” (ইবনে মাজাহ: ২৩৪১)
অর্থ: “নিজের বা অন্যের ক্ষতি করা জায়েজ নেই।”
তাই আপনি যদি দেখেন যে, তাঁর পরিবর্তনের কোনো আশা নেই এবং আপনার ধর্ম ও দুনিয়া উভয়ই ধ্বংস হচ্ছে, তাহলে বিচ্ছেদই উত্তম। তবে তার জন্য শেষবারের মতো আলোচনা করুন, একজন মধ্যস্থতাকারী (যেমন আলেম বা পরিবারের বড়) রাখুন।
পরামর্শ
- তালাকের সংখ্যা ও অবস্থা নিশ্চিত করতে স্থানীয় মুফতি সাহেবের কাছে যান।
- যদি তালাক পতিত না হয়ে থাকে, তাহলে তাঁর আচরণের কারণে আপনি খুলা বা ফাসখ করতে পারেন। এ জন্য স্থানীয় ইসলামি বিবাহ নিবন্ধক বা কাযীর সাহায্য নিন।
- বর্তমানে যে তিনি যোগাযোগ করছেন না, তাতে আপনি ইদ্দত পালন করুন (যদি তালাক পতিত হয়ে থাকে) অথবা তিন মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করে বিবাহ ভঙ্গের প্রক্রিয়া শুরু করুন।
- নিজের ও মেয়ের নিরাপত্তার জন্য গৃহ নির্যাতন থেকে সুরক্ষা আইন অনুযায়ী আইনি সাহায্যও নিতে পারেন।
জিন্দেগীর সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য নিম্নোক্ত হাদিসটি স্মরণ করুন:
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“তোমরা বিবাহ করো না স্বামীর সঙ্গে ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ না তোমরা নিশ্চিত হও যে সে আল্লাহকে ভয় করে। আর যদি সে আল্লাহকে ভয় না করে, তাহলে তোমার জীবন দুর্বিষহ হবে।” (তিরমিজি: ১০৮৪)
আপনার জন্য দোয়া করি, আল্লাহ আপনাকে ধৈর্য দিন এবং উত্তম পথ দেখান। আমিন।
জাযাকাল্লাহু খাইরান