স্বামীর রাগের সময় বলা "বাপের বাড়ি চলে যাও" এবং স্ত্রীর জিজ্ঞাসার জবাবে "হ্যাঁ, দিয়ে দাও" বলার কারণে তালাক হবে কি?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমার হাসবেন্ড রাগারাগি করার এক পর্যায়ে বলে বসে যে
"সংসার করতে না পারলে সংসার করিওনা।বাপেরবাড়ি চলে যাও।"
আমি উত্তরে বলসি যে "কি নিয়তে বলতেসো,তালাকের নিয়তে বলসো?"
উনি বলসে, "হ্যাঁ, তোমার যদি ইচ্ছা হয়,দিয়ে দাও।"
হাসবেন্ড ওই কথা নিজে তালাক প্রদানের নিয়তে বলে নি।
হাসবেন্ড এর কথার জন্য কি তালাক হবে??
Answer
উত্তর: وَعَلَيْكُمُ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ
প্রশ্নে বর্ণিত পরিস্থিতি বিশ্লেষন করে আমরা নিম্নলিখিত সিদ্ধান্তে উপনীত হই:
১. স্বামীর প্রথম উক্তি: "সংসার করতে না পারলে সংসার করিও না। বাপের বাড়ি চলে যাও।"
এটি কিনায়াহ (অস্পষ্ট/ইঙ্গিতমূলক) শব্দ। হানাফী ফিকহ অনুযায়ী, কিনায়াহ শব্দের মাধ্যমে তালাক শুধু তখনই পতিত হবে যখন স্বামী সেই কথাটি বলার সময় তালাকের নিয়ত করেছিলেন। এখানে প্রশ্নে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, স্বামী এই কথাটি তালাকের নিয়তে বলেননি। তাই এই কথার দ্বারা কোনো তালাক পতিত হয়নি। (সূত্র: রদ্দুল মুহতার ৩/২৫৩, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/৩৭৯)
২. স্ত্রীর প্রশ্ন ও স্বামীর জবাব:
স্ত্রী জিজ্ঞাসা করলেন: "কি নিয়তে বলতেসো, তালাকের নিয়তে বলসো?" স্বামী উত্তর দিলেন: "হ্যাঁ, তোমার যদি ইচ্ছা হয়, দিয়ে দাও।" এই জবাবটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:
-
স্বামী "হ্যাঁ" বলে তার প্রথম কথাটি তালাকের নিয়তে বলেছেন বলে স্বীকার করলেন। কিন্তু প্রশ্নে বলা হয়েছে যে তিনি প্রথম কথাটি তালাকের নিয়তে বলেননি। তাই এই স্বীকারোক্তি যদি সত্য না হয় (অর্থাৎ তিনি আসলে নিয়ত করেননি), তবে তা তালাক পতিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। কারণ নিয়তের বিষয়টি অভ্যন্তরীণ; তাঁর নিজের বক্তব্য যে তিনি নিয়ত করেননি, তা প্রাধান্য পাবে। তবে যদি তিনি এখন স্বীকার করেন যে তিনি আসলে নিয়ত করেছিলেন, তাহলে সেই স্বীকারোক্তি অনুযায়ী তালাক পতিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু যেহেতু প্রশ্নে সুস্পষ্ট বলা আছে যে তিনি নিয়ত করেননি, তাই আমরা ধরে নিব যে তাঁর "হ্যাঁ" বলা কেবল উত্তরের অংশ, বাস্তবিক নিয়ত ছিল না।
-
দ্বিতীয় অংশ: "তোমার যদি ইচ্ছা হয়, দিয়ে দাও।" এটি একটি শর্তসাপেক্ষ বাক্য। হানাফী ফিকহে শর্তসাপেক্ষ তালাক (তা‘লীক) বৈধ। যেমন স্বামী বলল, "যদি তুমি ইচ্ছা কর, তাহলে তালাক দিয়ে দাও।" এখানে শর্তটি স্ত্রীর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। যতক্ষণ স্ত্রী ইচ্ছা প্রকাশ না করবেন বা তালাক গ্রহণ না করবেন, ততক্ষণ তালাক পতিত হবে না। অথবা এটিকে স্বামীর পক্ষ থেকে তালাকের ক্ষমতা অর্পণ (তাফউইজ) হিসেবেও গণ্য করা যেতে পারে, যেখানে স্ত্রী নিজে তালাক দিতে পারেন। কিন্তু স্ত্রী এখানে তালাক দেননি, শুধু জিজ্ঞাসা করেছেন। তাই এখনো কোনো তালাক পতিত হয়নি। (সূত্র: ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/৩৭৩, রদ্দুল মুহতার ৩/২৯০)
সারসংক্ষেপ:
- প্রথম উক্তি: তালাকের নিয়ত না থাকায় তালাক হয়নি।
- দ্বিতীয় উক্তি: শর্তসাপেক্ষ বা ক্ষমতা অর্পণ; যেহেতু স্ত্রী তালাক গ্রহণ করেননি বা ইচ্ছা প্রকাশ করেননি, তাই এখনো তালাক পতিত হয়নি।
হানাফী রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার (৩/২৫৩, ৩/২৯০) – কিনায়াহ ও শর্তসাপেক্ষ তালাকের বিধান।
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (১/৩৭৩, ১/৩৭৯) – তালাকের নিয়ত ও তাফউইজের বিবরণ।
- ফাতাওয়া উসমানী (২/২৮০) – কিনায়াহ শব্দে তালাক পতিত হওয়ার শর্তাবলী।
পরামর্শ:
উপরোক্ত বিশ্লেষণ অনুযায়ী বর্তমানে কোনো তালাক পতিত হয়নি। তবে স্বামীর কথাগুলো দ্ব্যর্থবোধক হওয়ায় এবং ভবিষ্যতে জটিলতা এড়ানোর জন্য একজন স্থানীয় আলেম বা মুফতির সাথে সরাসরি পরামর্শ করা উত্তম। স্বামী-স্ত্রী উভয়েই যাতে শান্তিপূর্ণভাবে সংসার করতে পারেন, সে জন্য পারস্পরিক আলোচনা ও সমঝোতার চেষ্টা করা জরুরি।