তালাকের পর নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার উপায়।
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
সম্মানিত উস্তাদ,, তালাক পরবর্তী সময়ে কিভাবে নিজেকে গুছিয়ে নেয়া যায়??
ইদ্দত চলাকালীন সময়ে কিভাবে কি করা যায়??
দুনিয়ার জীবনে তালাকের মত শব্দ টা না থাকলেই ভালো হতো হয়তো,,তীব্র মানসিক যন্ত্রণা, ঘুমাতে না পারা,খেতে না পারা,,প্রাক্তন হাসবেন্ড এর আইডি স্ক্রল করা, তার সাথে কাটানো সময় গুলো খুব বেশি মনে পরে,, এতে করে কি গুনাহ হবে??
শুধুমাত্র বনিবনা না হবার কারনে তালাক দেয়া কটটুকু যুক্তিযুক্ত??
হয়তো বা দোষ আমার ই সবচেয়ে বেশি,, আমি তার কাছে মাফ চাইতে পারবো??দুনিয়ার জীবনের সম্পর্ক শেষ হয়ে গেলো,,এই মানুষ টার সাথে আর কখনো কথা হবে না, দেখা হবে না,,
আমি কি ইদ্দত পালন শেষ এ নিজে বাইরের পরিবেশ এ কিছু করতে পারবো??কোন স্কুল, কলেজ এর টিচার হিসেবে জব করা এতে কি গুনাহ হবে??যেহেতু বাবার ও বয়স হয়েছে যা বেতন পায় তাতে সংসারে ৫জন মানুষ চালানো কষ্ট সাধ্য খুব৷
জাজাকুমুল্লাহু খাইর।
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রথমেই জানিয়ে রাখি, তালাক একটি বৈধ তবে অপছন্দনীয় কাজ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"তালাক দুইবার, তারপর হয় সঙ্গতি সহকারে রাখা অথবা সদয়ভাবে ছেড়ে দেওয়া।" (সূরা আল-বাকারা, ২:২২৯)
তালাকের পরবর্তী সময়টা মানসিকভাবে খুব কঠিন হলেও, এটি একটি পরীক্ষা। এই সময়ে নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার জন্য ইসলামী পদ্ধতি ও ব্যবহারিক দিকনির্দেশনা নিচে দেওয়া হলো।
১. ইদ্দতকালীন সময়ে করণীয়:
- ইদ্দত (তালাকের পর তিন মাসিক বা তিন মাস) পালন করা ওয়াজিব। এই সময়ে আপনি আপনার পিতার বাড়িতে অবস্থান করবেন এবং বাইরে বের হওয়া শুধু জরুরি প্রয়োজনে (যেমন চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় কেনাকাটা) অনুমোদিত।
- ইবাদত ও ধৈর্য: নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির ও ইস্তিগফারের মাধ্যমে নিজেকে ব্যস্ত রাখুন। আল্লাহ বলেন:
"নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদের সাথে আল্লাহ আছেন।" (সূরা আল-বাকারা, ২:১৫৩) - স্মৃতি থেকে দূরে থাকা: প্রাক্তন স্বামীর আইডি স্ক্রল করা, তার সাথে কাটানো সময় মনে করে দুঃখ করা—এগুলো স্বাভাবিক হলেও ইচ্ছাকৃতভাবে করা গুনাহের কারণ হতে পারে। কারণ এতে করে মানসিক যন্ত্রণা বাড়ে এবং শয়তানের প্রভাব পড়ে। আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"তোমাদের কেউ যেন তার ভাইয়ের সাথে এমন আচরণ না করে যে, সে তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে তিন দিনের বেশি কথা না বলে।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০৭৪)
তালাকের পর সম্পর্ক শেষ হয়ে গেছে, তাই পুরনো স্মৃতি আঁকড়ে ধরা না রেখে বর্তমান ও ভবিষ্যতের দিকে মনোযোগ দিন। - গুনাহ হবে কি? হ্যাঁ, যদি আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে তার আইডি দেখা, স্মৃতি চিন্তা করা ইত্যাদি করে সময় নষ্ট করেন এবং এতে মানসিক কষ্ট আরও বেড়ে যায়, তবে তা নিরর্থক কাজ হবে এবং গুনাহ হতে পারে। তবে দুঃখবোধ স্বাভাবিক; সেজন্য ক্ষমা চাইবেন এবং ধৈর্য ধরবেন।
২. তালাকের যৌক্তিকতা:
শুধুমাত্র "বনিবনা না হওয়া" (অর্থাৎ দাম্পত্য কলহ) কারণে তালাক দেওয়া ইসলামে অপছন্দনীয় হলেও বৈধ। তবে শরিয়তের নির্দেশনা হলো: প্রথমে সালিশ (মধ্যস্থতা) ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সমাধানের চেষ্টা করা। আল্লাহ বলেন:
"আর যদি তোমরা তাদের মধ্যে সম্পর্কচ্ছেদের আশঙ্কা কর, তবে একজন সালিস তার পরিবার থেকে এবং একজন সালিস তার পরিবার থেকে নিযুক্ত করো।" (সূরা আন-নিসা, ৪:৩৫)
ইমাম কাসানী রহ. বলেন: "তালাক বৈধ, তবে তা সর্বোত্তম নয়; বরং এটি আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয় কোনো প্রয়োজনীয় অনুমতি।" (বাদায়িউস সানায়ি', ৩/৮৭)
কাজেই আপনার দোষ বেশি মনে হলে আপনি চাইলে তাকে ক্ষমা চাইতে পারেন। তবে দুনিয়ার সম্পর্ক শেষ হয়ে গেছে, আখিরাতে তাকে পাওয়া যাবে না; বরং আপনি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবেন এবং তাকে (প্রাক্তন স্বামীকে) আপনি মাফ করে দিন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"যে ব্যক্তি ক্ষমা করে দেয়, আল্লাহ তার ইজ্জত বৃদ্ধি করেন।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮৮)
৩. ইদ্দত শেষে চাকরি করা:
ইদ্দত শেষে আপনি স্কুল-কলেজে শিক্ষক হিসেবে চাকরি করতে পারবেন। এটি গুনাহ নয়, বরং এটি জায়েয এবং প্রয়োজনে উত্তম। তবে শর্ত হলো:
- পর্দা রক্ষা: মাহরাম ছাড়া বাইরে যাওয়া জায়েয নয় (জরুরি প্রয়োজনে ব্যতিক্রম), তাই শিক্ষকতা করতে গেলে আপনাকে পর্দা মেনে চলতে হবে (বোরকা/হিজাব, গায়রে মাহরাম থেকে দূরে থাকা)।
- ইসলামী পরিবেশ: এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাজ করুন যেখানে ইসলামী আদর্শ রক্ষিত হয়।
- বাবার দায়িত্ব: আপনার বাবার বয়স হয়েছে, তিনি বেতন পান যা ৫জনের সংসার চালানো কঠিন। শরিয়তে সন্তানের জন্য পিতার ভরণপোষণ দেওয়া ফরজ নয়, তবে সাহায্য করা সওয়াবের কাজ। আপনি চাইলে নিজের রোজগার দিয়ে সংসারে সাহায্য করতে পারেন। তবে নাবালক শিশু থাকলে তাদের ভরণপোষণ আপনার উপর আবশ্যক নয়; বরং তার পিতার দায়িত্ব।
ইমদাদুল ফাতাওয়া (৫/৮৭)-এ আছে: "মহিলার জন্য প্রয়োজনবশত চাকরি করা জায়েয, তবে পর্দা ও শরিয়তের শর্তাবলী পালন করতে হবে।"
৪. মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তির উপায়:
- দোয়া ও ধৈর্য: নিয়মিত দোয়া করুন: "رَبَّنَا أَفْرِغْ عَلَيْنَا صَبْرًا" (হে আমাদের রব, আমাদের উপর ধৈর্য বর্ষণ করুন)।
- পরামর্শ: কোনো নিকটাত্মীয় বা ধর্মীয় ব্যক্তির সাথে আপনার অবস্থা শেয়ার করুন।
- ইলম ও ইবাদত: সময় কাজে লাগান—নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, ইসলামী বই পড়া।
- শারীরিক যত্ন: পর্যাপ্ত খাবার ও ঘুমের চেষ্টা করুন; কারণ এগুলো ইমানের সহায়ক।
সারসংক্ষেপ:
- ইদ্দতকালে আপনি ধৈর্য ধরে ইবাদতে মশগুল থাকবেন, পুরনো স্মৃতিতে আক্রান্ত না হওয়ার চেষ্টা করবেন।
- তালাকের জন্য শুধু আপনি দোষী হলেও, এখন ক্ষমা চাওয়া এবং আল্লাহর কাছে তওবা করুন। তার (প্রাক্তন স্বামীর) কাছে ক্ষমা চাইতে পারেন, কিন্তু দুনিয়ার সম্পর্ক শেষ; তাই আখিরাতের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করবেন।
- ইদ্দত শেষে পর্দা রক্ষা করে শিক্ষকতা করা জায়েয, গুনাহ নয়; বরং এটি একটি বৈধ উপার্জনের মাধ্যম।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে ধৈর্য দান করুন এবং এই কঠিন সময়ে সাহায্য করুন। আমীন।
জাজাকুমুল্লাহু খাইরান।