উপযুক্ত পাত্র না পেলে বিয়ে পিছিয়ে নেওয়া কি শরীয়তসম্মত?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
জীবনে পারিবারিক মারাত্মক ক্রাইসিস আছে, চলছে। আমি না পেয়েছি পরিপূর্ণ দায়িত্বশীল কোনো পিতা আর না গোছানো একটা মা। আর না পেয়েছি আমার দ্বীনের অনুকূল কোনো পরিবার। পর্দার জন্য অনেকটা সংগ্রাম করেছি।
বিয়ে বিমুখ নই। উপযুক্ত এবং কুফু না মিলায় বিয়ে করছি না তবে প্রতিনিয়ত দোয়া করেই চলেছি।
সমস্যা কিছু মানুষ প্রত্যেক্ষ এবং পরোক্ষভাবে নিন্দা করে। অপমানজনক কথা বলে যেন বিয়ে না করে কোনো অপরাধ, গুনাহ করছি। যেন ঘৃণা করার মতো কোনো কাজ করছি।
ওয়াল্লাহী তাদের আচরণ হৃদয়ে প্রচণ্ড ভারী ঠেকে, কখনো ছোট ছোট কথাতেও পুরো রাত নির্ঘুম কেটে যাচ্ছে। অনলাইনে কিছু মানুষরা অবিবাহিত মেয়েদের বয়স বাড়তে থাকলে নোংরা গালি পর্যন্ত দেয়, বুড়ি শকুন বলে।
জানি বয়স বাড়ছে, বৃদ্ধ হচ্ছি, সৌন্দর্য কমছে, মানুষ শুনিয়ে বলে প্রত্যেক জিনিসরই সুন্দর একটা সময় আছে।
আমিতো কোনো গুনাহ করছি না। আমিতো উপযুক্ত জীবন সঙ্গী পাওয়ার জন্য সবর করছি।
তাহলে বয়স বাড়া দোষ কেন? কেন অবিবাহিত বয়স্ক নারীদের ছোট করা হয়, ঘৃণার চোখে দেখা হয়?
বয়স বৃদ্ধি পাওয়া কি গুনাহ?
এই দ্বীনে টিন এজে বিয়ে না করলে নিন্দিত হওয়ার কোনো বিধান পাওয়া যায় কি?
কেউ কেউ কম বয়স তথা টিন এজে বিয়ে করলে খুব গর্ব করে বলেন আমি ১৬ বছর বয়সে বিয়ে করেছি।
তাহলে কি দ্বীনে কম বয়সে বিয়ে করা উত্তম?
আর বয়স বাড়তে থাকা অনুত্তম?
Answer
উত্তর
প্রিয় বোন আসমা, আপনার প্রশ্নের জন্য আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন। আপনি যে অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন এবং যে মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করছেন, তা সত্যিই কষ্টদায়ক। আমি আপনার প্রতিটি প্রশ্নের জবাব কুরআন, হাদিস এবং হানাফি ফিকহের কিতাবের আলোকে দেওয়ার চেষ্টা করছি।
প্রথমেই জেনে রাখুন, বয়স বেড়ে যাওয়া কোনো গুনাহ নয়। এটি আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি ও বিধান। আল্লাহ বলেন,
اللَّهُ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ ضَعْفٍ ثُمَّ جَعَلَ مِنْ بَعْدِ ضَعْفٍ قُوَّةً ثُمَّ جَعَلَ مِنْ بَعْدِ قُوَّةٍ ضَعْفًا وَشَيْبَةً ۚ يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ ۖ وَهُوَ الْعَلِيمُ الْقَدِيرُ (সূরা আর-রূম: ৫৪)
“আল্লাহই তোমাদেরকে দুর্বল অবস্থায় সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর দুর্বলতার পর শক্তি দিয়েছেন, অতঃপর শক্তির পর দুর্বলতা ও বার্ধক্য দিয়েছেন। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন, এবং তিনিই সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান।”
অর্থাৎ বয়স বাড়া, দুর্বল হওয়া, সৌন্দর্য কমে যাওয়া—এগুলো প্রাকৃতিক ও অনিবার্য বিষয়। এগুলো কোনো গুনাহ নয়। বরং গুনাহ হচ্ছে সেসব কাজ যা আল্লাহ নিষেধ করেছেন, যেমন: জিনা, অশ্লীলতা, মিথ্যা বলা, গিবত করা, অন্যের প্রতি অহঙ্কার করা ইত্যাদি।
১. বিয়ে না করায় আপনি দোষী নন
ইসলামে বিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত ও প্রয়োজনীয় কাজ বটে, তবে তা জোরপূর্বক কোনো নির্দিষ্ট বয়সে আবশ্যক নয়। আপনার উচিত হবে উপযুক্ত, কুফু (সামঞ্জস্যপূর্ণ) পাত্র পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করা, এবং ততক্ষণ পর্যন্ত নিজেকে সংযত ও পবিত্র রাখা।
وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ مِنْكُمْ طَوْلًا أَنْ يَنْكِحَ الْمُحْصَنَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ فَمِنْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ... (সূরা আন-নিসা: ২৫)
“আর তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি স্বাধীন মুমিন নারীকে বিয়ে করার সামর্থ্য রাখে না, সে যেন তার অধিকারভুক্ত দাসীদের মধ্যে থেকে বিয়ে করে নেয়...”
এই আয়াত প্রমাণ করে যে, সামর্থ্য ও উপযুক্ততা একটি শর্ত। আর আপনি যে শুধু অপেক্ষা করছেন তা নয়, বরং উপযুক্ত জীবনসঙ্গীর জন্য দোয়া করছেন, এটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও অন্যান্য হানাফি ফকীহগণ কুফু (সামঞ্জস্যতা) কে বিয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে মনে করেন। (রদ্দুল মুহতার: ৩/৬৭; ফাতাওয়া আলমগীরী: ১/২৮৫)।
২. টিন এজে বিয়ে না করায় নিন্দিত হওয়ার বিধান নেই
ইসলামে নির্দিষ্ট বয়সে বিয়ে ফরজ বা আবশ্যক নয়। যেসব হাদিসে ‘যখন তোমাদের কাছে দ্বীনদার পাত্র আসে, তখন বিয়ে করিয়ে দাও’ (তিরমিজি: ১০৮৪) — এটি পাত্র আসার শর্তে, বয়সের শর্তে নয়।
হাদিসে এসেছে:
إِذَا جَاءَكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ دِينَهُ وَخُلُقَهُ فَأَنْكِحُوهُ (তিরমিজি: ১০৮৪; ইবনে মাজাহ: ১৯৬৭)
“যখন তোমাদের কাছে এমন পাত্র আসে যার দ্বীন ও চরিত্র তোমরা পছন্দ কর, তবে তাকে বিয়ে করিয়ে দাও।”
এখানে বয়সের শর্ত নেই, বরং শর্ত হলো দ্বীন ও চরিত্র। আপনার ক্ষেত্রে আপনি উপযুক্ত কুফু পাচ্ছেন না, তাই আপনি অপেক্ষা করছেন—এটি সম্পূর্ণ বৈধ।
فَإِنْ لَمْ نَجِدْ فَلَا إِثْمَ عَلَيْهِ فِي تَأْخِيرِ النِّكَاحِ (ফাতাওয়া উসমানী: ২/৪১৮)
“যদি উপযুক্ত পাত্র না পাওয়া যায়, তাহলে বিয়ে পিছিয়ে দেওয়ায় কোনো গুনাহ নেই।”
আপনি কোন গুনাহ করছেন না; বরং আপনি সবর করছেন, যা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় কাজ।
إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ (সূরা আল-বাকারা: ১৫৩)
“নিশ্চয়ই আল্লাহ সবরকারীদের সাথে আছেন।”
৩. বয়স বাড়া দোষ না, বরং নিন্দুকদের কাজ গুনাহ
যারা আপনাকে নিন্দা করে, ‘বুড়ি শকুন’ বলে, আপনার সৌন্দর্য ও বয়স নিয়ে কটুক্তি করে—তারা যে গুনাহের কাজ করছে তা নিশ্চিত।
হাদিসে এসেছে:
بِحَسْبِ الْمَرْءِ مِنَ الشَّرِّ أَنْ يَحْقِرَ أَخَاهُ الْمُسْلِمَ (সহিহ মুসলিম: ২৫৬৪)
“একজন মানুষের জন্য মন্দের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে সে তার মুসলিম ভাইকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে।”
আরও হাদিস:
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يُحِبَّ لِأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ (বুখারি: ১৩; মুসলিম: ৪৫)
“যার হাতে আমার প্রাণ! তোমাদের কেউ মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য তা-ই পছন্দ করে যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে।”
যারা আপনাকে এভাবে কষ্ট দেয়, তারা তাদের নিজেদের গুনাহ ও আখিরাতের ক্ষতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। আপনি বরং তাদের জন্য দোয়া করুন, আল্লাহ তাদের হেদায়েত দিন।
৪. কম বয়সে বিয়ে করা উত্তম কি না?
হ্যাঁ, বিয়ে দেরি না করে তাড়াতাড়ি করা সুন্নাত ও উত্তম—যখন সামর্থ্য ও উপযুক্ত কুফু বিদ্যমান থাকে। হাদিসে এসেছে:
يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ، مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمُ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ، فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ (বুখারি: ৫০৬৫; মুসলিম: ১৪০০)
“হে যুবক সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যে বিবাহের সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিবাহ করে। কেননা তা দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণে ও লজ্জাস্থানের হিফাজতে বেশি সহায়ক।”
কিন্তু ‘সামর্থ্য’ বলতে শুধু বয়স নয়, বরং শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক সামর্থ্য বোঝানো হয়েছে। আর যদি সামর্থ্য না থাকে, তাহলে অপেক্ষা করাই উত্তম।
وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَعَلَيْهِ بِالصَّوْمِ فَإِنَّهُ لَهُ وِجَاءٌ (বুখারি: ৫০৬৫)
“আর যে ব্যক্তি সামর্থ্য রাখে না, সে যেন রোজা রাখে। কেননা তা তার জন্য পুরুষত্ব নিবারক হবে।”
আপনি যদি উপযুক্ত পাত্র না পান, তাহলে আপনি সবর করছেন এবং নিজেকে পবিত্র রাখছেন—এটাই আপনার জন্য উত্তম পথ। কেউ যদি ১৬ বছর বয়সে বিয়ে করে এবং তা ঠিকমতো টিকিয়ে রাখে, এতে তার জন্য কল্যাণ আছে। কিন্তু এ থেকে এ কথা প্রমাণিত হয় না যে সবার জন্যই কম বয়সে বিয়ে আবশ্যক অথবা যে বয়সে বিয়ে করেনি সে নিন্দিত।
৫. আপনার জন্য পরামর্শ ও উপদেশ
১. আপনার সবর এবং দ্বীনের উপর অটল থাকা সত্যিই প্রশংসনীয়। আপনি একজন সাহসী মুমিনা যিনি দ্বীনের পথে সংগ্রাম করছেন। কোনো মানুষ বা সমালোচনা যেন আপনাকে ভেঙে না দেয়।
২. অন্যায় নিন্দা ও কটূক্তি উপেক্ষা করুন। আপনি জানেন, আল্লাহ আপনার নিয়ত ও অবস্থা জানেন। মানুষ যা বলে, তা স্রেফ অজ্ঞতা ও অন্ধ অনুকরণ।
৩. দোয়া ও ইস্তিগফার চালিয়ে যান। আপনি প্রতিনিয়ত দোয়া করছেন, এটি অত্যন্ত মূল্যবান। হাদিসে এসেছে:
دَعْوَةُ الْمُسْلِمِ مُسْتَجَابَةٌ، فَلْيَدْعُ بِخَيْرٍ (তিরমিজি: ৩৫৭৯)
“মুসলিমের দোয়া কবুল হয়। কাজেই সে যেন কল্যাণের জন্য দোয়া করে।”
৪. আপনার পারিবারিক সংকট ও পিতামাতার দায়িত্বহীনতা—এ জন্য আপনি দায়ী নন। আপনি যা পারেন তা হলো দোয়া করা এবং নিজের দ্বীন রক্ষায় চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। আল্লাহ বলেন:
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا (সূরা আল-বাকারা: ২৮৬)
“আল্লাহ কাউকে তার সামর্থ্যের বেশি দায়িত্ব দেন না।”
৫. ইতিবাচক ও সৎ সঙ্গী খুঁজুন। মসজিদে বা ইসলামী সংগঠনে যুক্ত হন। ভালো বোনদের সান্নিধ্য রাখুন, যারা আপনাকে দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে সাহায্য করবে।
সারসংক্ষেপ
| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | বয়স বাড়া কি গুনাহ? | না, এটি আল্লাহর সৃষ্টি ও বিধান। গুনাহ হচ্ছে নিষিদ্ধ কাজ করা। | | টিন এসে বিয়ে না করায় নিন্দিত হওয়ার বিধান আছে কি? | না। বিয়ে নির্দিষ্ট বয়সে আবশ্যক নয়; বরং সামর্থ্য ও কুফু শর্ত। | | কম বয়সে বিয়ে করা উত্তম? | হ্যাঁ, যদি সামর্থ্য ও উপযুক্ত পাত্র থাকে। কিন্তু অপেক্ষা করাও বৈধ। | | বয়স বাড়তে থাকা অনুত্তম? | না, আল্লাহর ইচ্ছায় বয়স বাড়ে; এটা নিজে কোনো কাজ নয়। | | অবিবাহিত বয়স্ক নারীদের ঘৃণা করা কি ঠিক? | না, এটি গুনাহ ও ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক। |
আপনার বোন আসমা, নিজেকে নিয়ে গর্ববোধ করুন। আপনি আল্লাহর পথে আছেন, আপনি পবিত্র আছেন, আপনি সবর করছেন। পৃথিবীর মানুষের কথায় কান দেবেন না। আল্লাহ আপনার প্রতিটি দোয়া কবুল করুন, উপযুক্ত জীবনসঙ্গী দান করুন এবং আপনার সবরের প্রতিদান দিন। আমিন।
وَاللَّهُ خَيْرٌ وَأَبْقَىٰ (সূরা ত্বাহা: ৭৩)
“আর আল্লাহ কল্যাণময় ও চিরস্থায়ী।”