মাযহাব পরিবর্তন করলে তালাকের বিধান কি হবে?
Marriage and Divorce · Ahle Hadith / Salafi
Question
এক ব্যক্তি হানাফী মাযহাব অনুযায়ী চলতো , এখন সে আহেল হাদীস অনুযায়ী চলছে এবং তার জীবনের সব কিছুই আহেল হাদীস অনুযায়ী চলার চেষ্টা করছে ।
বিষয় হলো যখন সে হানাফী ছিল তখন স্ত্রীর সাতে তুমুল ঝগড়া শুরু হয় ,,,, তখন সে কিছু কথা বলে অনেক মুখ সামলিয়ে । কিন্তু পরিস্থিতি এমন বাজে হয়েছে সে ভেবেছে হালালা করতে হলে করবো বলে একসঙ্গে 6 বার তালাক বলেছে । এর কিছুক্ষণ পর সব শান্ত হলে বাড়ির সবাই পাগল হয়ে যাচ্ছিল যে কি করবে ,,, তাই সেই ব্যক্তি একজন হানাফী আলেম কে ডেকে নিয়ে আসে বাড়িতে সেই আলেম তাকে শিখিয়ে দিয়েছে তুমি এই বলবে যা আমি বলেছি। কিন্তু ছেলেটি বলে এই ভাবে তো কিছুই হবে না হলালা ছাড়া। তাই আপনি বাড়িতে নরমাল ভাবে বলেন কিছু হয়নি পরে আমরা হালালা করে নিবো।
তার স্ত্রী প্রেগন্যান্ট ছিল । হঠাৎ তার স্ত্রী বলে তিন বার এর বেশি বললে বা তিন বার বললে সেটা এক বার ধরা হয়। এই নিয়ে সে অনেক হাদীস দেখে। এবং এটাও দেখে যে হালালা কে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হারাম বলেছেন ।সেই ব্যক্তির মাথায় কিছুই আসছে না কি করবে । আহলে হাদীস এর ফতোয়া দেখলো । এবং স্ত্রীর কথা শুনে বিখ্যাত বিখ্যাত কিছু আলেম কে জিজ্ঞাসা করল সে কি আহেল হাদীস অনুযায়ী চলতে পারবে? এবং ঘর সংসার করতে পারবে। 6 থেকে 7 টা আহেল হাদীস এর আলেম কে জিজ্ঞাসা করে । সে যে সুবিধা বাদী এমন না । সে হালাল অবস্থায় স্ত্রী কে ফিরে পেতে চেয়েছে। সে হালালা করতে রাজি ছিল। কিন্তু সে একটি মত পাই। সেই মত কে মন দিয়ে বিশ্বাস করে মেনে নিয়েছে । অনেক আলেম মত দিয়েছে। সে এখন আহেল হাদীস অনুযায়ী চলছে। সে আহলে হাদীস আমলে কে জিজ্ঞাসা করেছে এটি কি প্রবৃত্তির পূজারী? তারা তাকে বলছে ন না। তারা তাকে gudie করে । হাদীস দেখিয়ে বুঝিয়েছে ।
সে আহেল হাদীস কে সম্পূর্ণ ভাবে বিশ্বাস করে মেনে নিয়েছে । এবং সেই অনুযায়ী চলছে । তার কাছে এই মত টা ঠিক মনে হয়েছে। তা ছাড়া সে ক্রস ভেরিফিকেশন এর জন্য অনেক আলেম কে জেনেছে।
তারা কি সংসার করতে পারে?
Answer
উত্তর
প্রশ্নকারী ব্যক্তি আগে হানাফী মাযহাব অনুসরণ করতেন, এখন তিনি আহলে হাদীস (সালাফী) মত অনুযায়ী চলতে চান। তিনি স্ত্রীর সাথে ঝগড়ার সময় একসঙ্গে ৬ বার তালাক বলেছেন। পরে তিনি হানাফী আলেমের পরামর্শে মিথ্যা বলার চেষ্টা করলেও নিজের জ্ঞান ও আহলে হাদীস আলেমদের ফতোয়ার ভিত্তিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে চান। তাঁর মূল প্রশ্ন: এই পরিস্থিতিতে তিনি কি স্ত্রীর সাথে সংসার চালিয়ে যেতে পারেন?
নিম্নে কুরআন-সুন্নাহ ও নির্ভরযোগ্য সালাফী আলেমদের মতামতের আলোকে জবাব দেওয়া হলো।
১. একসঙ্গে তিন বা ততোধিক তালাকের বিধান
হানাফী মাযহাবে এক সাথে তিন তালাক দেওয়া হলে তা তিনটিই কার্যকর হয় এবং স্ত্রী তালাক্বায়ে বায়িন (অপূর্ণ) হয়ে যায়। কিন্তু সহীহ হাদীস ও সালাফী আলেমদের মতে, এক মজলিসে তিন তালাক একসঙ্গে বললে তা একটি তালাক (রাজ‘ঈ) গণ্য হবে, যতবারই বলা হোক না কেন।
দলিল:
-
হাদীসে রুকানাহ (রাদি.) বর্ণনা করেন, তিনি তাঁর স্ত্রীকে একবারে তিন তালাক দিয়েছিলেন। নবী (সা.) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি কি একসঙ্গে তিন তালাক দিয়েছ?" তিনি বললেন, "হ্যাঁ।" নবী (সা.) বললেন, "তবে তা একটি তালাক গণ্য হবে।" (সুনান আবু দাউদ, হাদীস ২১৯৬; সহীহ ইবন হিব্বান; ইরওয়া ২০৪০-এ শায়খ আলবানী সহীহ বলেছেন)
-
শায়খুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ, ইবনুল কাইয়্যিম, শায়খ ইবন বায, শায়খ আলবানী, শায়খ উসাইমীন, শায়খ সালেহ আল-ফাওযান প্রমুখ আলেম এই মত গ্রহণ করেছেন।
শায়খ ইবন বায (রহ.) বলেন:
"যদি কোনো ব্যক্তি একসঙ্গে তিন তালাক বা তার বেশি বলে ফেলে, তাহলে তা শুধু একটি তালাক গণ্য হবে। আর সে তাকে ফিরিয়ে নিতে পারে, যতক্ষণ ইদ্দত শেষ না হয়।" (মাজমূ‘ ফাতাওয়া ইবন বায, ২০/২৬৫)
শায়খ আলবানী (রহ.) বলেন:
"এক মজলিসে তিন তালাক দেওয়া একটি তালাক, এই মতটিই কুরআন-সুন্নাহ ও সাহাবীদের আমলের সাথে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।" (সিলসিলা সহীহা, ১৮৩১)
শায়খ উসাইমীন (রহ.) বলেন:
"এক মজলিসে তিন তালাক বললে তা একটি তালাক, দ্বিতীয় বা তৃতীয় নয়। কারণ নবী (সা.) এটাকে একটি তালাকই গণ্য করেছেন।" (আল-বিদ‘আ ওয়া আল-মুহাদ্দারা, ২/২২৩)
২. প্রশ্নকারী ব্যক্তির অবস্থা
- তিনি একসঙ্গে ৬ বার তালাক বলেছেন। সালাফী মতাদর্শ মোতাবেক, তা মাত্র একটি তালাক (রাজ‘ঈ) গণ্য হবে।
- যেহেতু তাঁর স্ত্রী গর্ভবতী, তাই তার ইদ্দত সন্তান প্রসব পর্যন্ত। (সূরা তালাক: ৪)
- তিনি এখনো ইদ্দতের (গর্ভাবস্থা) ভিতরে আছেন, তাই তিনি তাকে ফিরিয়ে নিতে পারেন — মৌখিকভাবে বা শারীরিক সহবাসের মাধ্যমে, কোনো হালালা (অন্য পুরুষের সাথে বিবাহ) প্রয়োজন নেই।
তবে শর্ত: তাকে অবশ্যই ইচ্ছাকৃতভাবে আর কোনো তালাক না দেওয়া; নতুবা দ্বিতীয় তালাকের পর ইদ্দত শেষে তৃতীয় তালাক হলে হালালা জরুরি হবে।
৩. হালালা হারাম হওয়া প্রসঙ্গ
হ্যাঁ, সহীহ হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"তিন তালাক দেওয়ার পরে যে ব্যক্তি হালালা (মোহাল্লিল) করে এবং যার জন্য হালালা করা হয়, তাদের প্রতি লা‘নত।" (সুনান তিরমিযী, হাদীস ১১১৯; ইবন মাজাহ, হাদীস ১৯৩৬; সহীহ আল-জামি‘, ৫১০১)
তবে যেহেতু এখানে তিন তালাক হয়নি (শুধু একটি তালাক হয়েছে), তাই হালালার প্রশ্নই আসে না। সুতরাং তিনি হালালা করতে রাজি হলেও তা লাগবে না — ইসলামী নিয়ম অনুযায়ী তিনি স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারেন।
৪. তিনি কি আহলে হাদীস মত অনুযায়ী চলতে পারেন?
অবশ্যই। তিনি সত্য জানার পর কুরআন-সুন্নাহকে প্রাধান্য দিচ্ছেন, যা প্রতিটি মুসলিমের কর্তব্য। তাঁর স্ত্রীও বলেছেন, "তিনবার বললে তা একবার ধরা হয়"—এ কথাটি সহীহ হাদীস সমর্থিত। তিনি আগে হানাফী ছিলেন বলে হানাফী আলেম তাকে মিথ্যা বলতে শিখিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি তা মানেননি এবং হাদীসের দলিল খুঁজেছেন। এটি প্রশংসনীয়।
শায়খ সালেহ আল-ফাওযান (হাফি.) বলেন:
"যে কেউ জানতে পারে যে, তার পূর্বের মাযহাবের কোনো মাসআলা কুরআন-সুন্নাহর বিপরীত, তবে তার ওপর ওয়াজিব হলো সুন্নাহকে অনুসরণ করা, মাযহাবের অন্ধ অনুসরণ নয়।" (আল-ইজতিহাদ ওয়া আল-মুজাদ্দিদ, ৩/২৪)
৫. চূড়ান্ত ফতোয়া ও পরামর্শ
সুতরাং:
- সালাফী মতাদর্শ মোতাবেক উক্ত ব্যক্তি স্ত্রীকে এক তালাক (রাজ‘ঈ) দিয়েছেন বলে গণ্য হবে।
- তিনি এখনো ইদ্দতের মধ্যে (গর্ভাবস্থা বিরাজমান), তাই তাকে ফিরিয়ে নিতে পারেন — মৌখিকভাবে বলবেন, "আমি তোমাকে ফিরিয়ে নিলাম" বা সহবাসের মাধ্যমে।
- হালালা জরুরি নয়।
- তিনি ও তাঁর স্ত্রী সাংসারিক জীবন চালিয়ে যেতে পারেন বৈধ ও ইসলামী নিয়মে।
উপদেশ:
- ভবিষ্যতে রাগের সময় তালাক না দিয়ে ধৈর্য ধরুন। রাসূল (সা.) বলেছেন, "তালাক আমার কাছে সর্বাধিক অপছন্দনীয় হালাল বস্তু।" (আবু দাউদ, ২১৭৮)
- স্ত্রীর সাথে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলুন।
- সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করতে আরও আলেমদের কাছ থেকে দলিল-ভিত্তিক জ্ঞান অর্জন করুন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।