ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রাক-বৈবাহিক সম্পর্ক ও তওবা সম্পর্কিত প্রশ্ন।

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 2056
Questioner: Jannaty khatun
Question Asked: 26 Jun 2026, 12:40 PM
Reviewed & Published: 26 Jun 2026, 12:46 PM
Views: 99
Tokens: 6,819
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

ছেলেটা কেবলমাত্র ৫ ওয়াক্ত সালাত জামায়াতের সহিত আদায় করে, কিন্তু তার কথা, কাজে দ্বীনদারিতা প্রকাশ পায় না। একবার বলে বিয়ে করবে তবে সময় লাগবে আবার বলে অপেক্ষা করিও না অন্য কাউকে বিয়ে করে নাও। আমি একজন প্রাকটিসিং মুসলিমা, কিন্তু বিয়ের ব্যাপারে তার সাথে কথা বলতে গিয়ে (যেহেতু ফ্যামিলি ছাড়া কথা হয়েছে তার সাথে) শরীয়াহ বহির্ভূত অনেক কথা, দেখা সাক্ষাৎ হয়েছে, যার জন্য আমি অনুতপ্ত। আমাদের কথাবার্তা এমন পর্যায়ে গিয়েছিল যে মনে হয়েছে একে অপরকে ছাড়া থাকা অসম্ভব। কিছুদিন পূর্বে বলেছে তার জন্য অপেক্ষা না করতে, এখন আজ আবার সরি বলছে, বলতেছে কিছুটা সময় দাও পরিবারের ঝামেলা শেষ করে বিয়ে করবো। কিন্তু আমি বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কে থাকতে চাই না, এখন তাকে বলেছি আমি অপেক্ষা করতে পারবো না, আমার ফ্যামিলি ছেলে দেখতেছে তাকে বিয়ে করবো, এ কারনে সে কষ্ট পাচ্ছে। যেহেতু আমাদের কথাবার্তা অনেক গভীর হয়েছিল, সেহেতু সে মানসিকভাবে আমার প্রতি দুর্বল, এখন তার জন্য অপেক্ষা না করে যদি অন্য কাউকে বিয়ে করি আর সে কষ্ট পাবে, এতে কী আল্লাহর কাছে আমাকে জবাবদিহি করতে হবে?
আরেকটা বিষয়, যেহেতু তার সাথে আমি অনেকটাই ঘনিষ্ঠ হয়ে গিয়েছিলাম, আল্লাহ মাফ করুন, এখন অন্য কাউকে বিয়ে করলে কী সেই মানুষটাকে ঠকানো হবে? আমার কী পূর্বের ছেলের সাথে ঘটা ঘটনা তাকে জানানো উচিত নাকি আল্লাহর কাছে তওবায় যথেষ্ট হবে?

Answer

উত্তর

প্রশ্নকারী ও উক্ত ছেলেটির মধ্যে যে অবৈধ সম্পর্ক ও কথাবার্তা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ হারাম ও গুনাহের কাজ। আল্লাহ তাআলা বিবাহ বহির্ভূত কোনো সম্পর্ককে অনুমোদন দেননি। আপনার অনুশোচনা ও তওবা করার ইচ্ছা প্রশংসনীয়। এখন আপনি যে পরিস্থিতির মধ্যে আছেন, তার উপর ভিত্তি করে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো খেয়াল রাখা জরুরি:


১. উক্ত ছেলেটির জন্য অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই

ছেলেটির কথাবার্তায় অস্থিরতা ও দ্বিধা স্পষ্ট। সে একবার বলে বিয়ে করবে, আবার বলে অপেক্ষা করো না। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে আপনি তার জন্য অপেক্ষা করতে বাধ্য নন। বরং যেহেতু সম্পর্কটি শরীয়ত সম্মত নয়, তাই এখনই তা পুরোপুরি ছিন্ন করা এবং কোনো প্রকার যোগাযোগ না রাখা আপনার জন্য আবশ্যক (ওয়াজিব)। তিনি যদি সত্যিই আপনাকে বিয়ে করতে চান, তাহলে তিনি আপনার অভিভাবকের কাছে পাত্রপক্ষ হিসেবে প্রস্তাব পাঠাতে পারেন। কিন্তু তার বর্তমান আচরণ নির্ভরযোগ্য নয়। তাই অপেক্ষা না করে আপনি হালাল পন্থায় অন্য কোথাও বিয়ের ব্যবস্থা করতে পারেন। এর কারণে তিনি কষ্ট পেলেও আপনাকে জবাবদিহি করতে হবে না, কারণ তিনি নিজেই গুনাহের সম্পর্কে জড়িত ছিলেন এবং তার সিদ্ধান্তহীনতা তার দুর্বলতার প্রমাণ।

(সূত্র: রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৫; ফাতাওয়া উসমানী, ২/৩৩০)


২. তার কষ্টের দায়ভার আপনার উপর না

ছেলেটি মানসিকভাবে আপনার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছে। কিন্তু এই দুর্বলতা একটি হারাম সম্পর্কের ফল। আপনি যদি তওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসেন এবং হালাল পন্থায় বিয়ে করেন, তবে তার কষ্টের জন্য আপনি দায়ী হবেন না। কেননা তিনি নিজেও জেনে-বুঝে হারাম কাজে লিপ্ত হয়েছেন। ইসলাম বলে, প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের কৃতকর্মের জন্য দায়ী। আপনি তাকে ধোঁকা দিচ্ছেন না; বরং আপনি নিজের ঈমান ও ইজ্জত রক্ষা করছেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

مَنْ تَرَكَ شَيْئًا لِلَّهِ عَوَّضَهُ اللَّهُ خَيْرًا مِنْهُ “যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য কিছু ছেড়ে দেয়, আল্লাহ তাকে এর চেয়ে উত্তম কিছু দান করেন।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদীস: ২৩০৭৪)

আপনি যদি আল্লাহর ভয়ে এই হারাম সম্পর্ক ত্যাগ করেন, তবে আল্লাহ আপনাকে তার চেয়ে উত্তম পাত্র দান করবেন, ইনশাআল্লাহ।


৩. অতীতের পাপ নতুন স্বামীকে জানানো জরুরি নয়

আপনি যে অবৈধ কথাবার্তা ও দেখা-সাক্ষাৎ করেছেন—তা আল্লাহর কাছে তওবা করাই যথেষ্ট। নতুন পাত্রকে (আপনার ভবিষ্যৎ স্বামী) আপনার অতীতের এই পাপ সম্পর্কে জানানো জরুরি নয়, বরং উচিতও নয়। ইসলামে নিজের পাপ গোপন রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

كُلُّ أُمَّتِي مُعَافًى إِلَّا الْمُجَاهِرِينَ “আমার উম্মতের সকলকে ক্ষমা করা হবে, তবে যারা প্রকাশ্যে পাপ করে (প্রকাশ করে না) তাদের ছাড়া।” (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৬০৬৯)

অতএব, আপনি অতীতের ঘটনা কাউকে না জানিয়ে শুধু আল্লাহর কাছে তওবা করুন। তবে যদি প্রশ্নকারী কুমারী না হন (অর্থাৎ পূর্বে কোনো শারীরিক সম্পর্ক হয়ে থাকে), সেক্ষেত্রে বিয়ের সময় পাত্রকে তা বলা জরুরি নয়—বরং তওবা করলেই চলবে। কিন্তু যদি পাত্র কোনো জিজ্ঞাসা করে, যেমন “কখনো কারো সাথে সম্পর্ক ছিল কি?” তাহলে সত্য বলা উচিত নয়, বরং চুপ থাকা বা এড়িয়ে যাওয়া উত্তম। কেননা আল্লাহর রহমতের দরজা খোলা রাখতে হবে।

(সূত্র: ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/২৮৪; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/৪১৬)


৪. তওবার শর্ত ও করণীয়

আপনি অনুতপ্ত হয়েছেন—এটাই তওবার প্রথম ধাপ। এবার নিম্নোক্ত কাজগুলো করুন:

১. অবিলম্বে ওই ছেলের সাথে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করুন (কল, মেসেজ, দেখা-সাক্ষাৎ)। ২. অতীতের পাপের জন্য আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হয়ে দুআ করুন এবং দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করুন যে ভবিষ্যতে এর পুনরাবৃত্তি করবেন না। ৩. বেশি বেশি নফল নামায, রোযা, দান-সদকা ও ইস্তিগফার করুন। ৪. আপনার পরিবারের মাধ্যমে হালাল পন্থায় বিয়ে ঠিক করুন। বিয়ের পর স্বামীর সাথে সৎ ও নিষ্ঠাবান স্ত্রী হয়ে থাকুন।

আল্লাহ বলেন:

وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ “হে মুমিনগণ, তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।” (সূরা নূর, ২৪:৩১)


সারসংক্ষেপ

  • আপনি উক্ত ছেলেটির জন্য অপেক্ষা করতে বাধ্য নন। তার কষ্টের দায় আপনাকে নিতে হবে না।
  • আপনি হালাল পন্থায় অন্যত্র বিয়ে করতে পারবেন এবং এতে আপনার কোনো গুনাহ হবে না।
  • অতীতের পাপ নতুন পাত্রকে জানানো জরুরি নয়; বরং তা গোপন রাখা ও তওবা করাই উত্তম।
  • আল্লাহর কাছে আন্তরিক তওবা করুন এবং ভবিষ্যতে শরীয়তের সীমার মধ্যে জীবন যাপনের সংকল্প করুন।

আল্লাহ আপনার তওবা কবুল করুন এবং আপনাকে উত্তম জীবনসঙ্গী দান করুন। আমীন।

উত্তর প্রদানে ব্যবহৃত কিতাবসমূহ:

  • কুরআনুল কারীম (সূরা নূর)
  • সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬০৬৯
  • মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ২৩০৭৪
  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন) – ৩/৫৫, ৬/৪২৫
  • ফাতাওয়া হিন্দিয়া – ১/২৮৪
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী) – ২/৪১৬
  • ফাতাওয়া উসমানী (মুফতী তাকী উসমানী) – ২/৩৩০

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.