বিয়ে না করে কারো জন্য অপেক্ষা করা
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
উত্তর
الحمد لله، والصلاة والسلام على رسول الله، أما بعد:
প্রথমেই আমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি আপনার অতীতের শরীয়ত বহির্ভূত কথাবার্তার জন্য। ইসলামে বিয়ের পূর্বে নামাহরম নারী-পুরুষের মধ্যে প্রেম-প্রীতি, গোপন কথোপকথন, একান্তে দেখা-সাক্ষাৎ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ وَمَن يَتَّبِعْ خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ فَإِنَّهُ يَأْمُرُ بِالْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ" (سورة النور: 21)
"হে মুমিনগণ! তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। যে কেউ শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে, সে তো অশ্লীলতা ও মন্দ কাজেরই আদেশ দেয়।" (সূরা আন-নূর: ২১)
আপনি ইতিমধ্যে অনুতপ্ত হয়েছেন এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়েছেন, এটাই আপনার জন্য যথেষ্ট। এখন থেকে সাবধান থাকুন এবং দ্বীনের পথে চলুন।
অপেক্ষা করা উচিত কি না?
আপনার জন্য অপেক্ষা করা উচিত নয়। নিম্নোক্ত কারণে:
১. অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
উক্ত পুরুষ নিজেই স্বীকার করছেন যে তার বাসায় সমস্যা রয়েছে, প্রথম স্ত্রীর সাথে ঝামেলা চলছে এবং তার জেলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি নিজেই বলছেন এখন বিয়ে করতে চান না। এমন পরিস্থিতিতে কখন তার সমস্যার সমাধান হবে, তা অনিশ্চিত। ইসলাম আমাদেরকে অনিশ্চিত বিষয়ের উপর নির্ভর করতে নিষেধ করে।
২. দ্বীনের জ্ঞানের অভাব
আপনি নিজেই উল্লেখ করেছেন যে তার দ্বীনের নলেজ খুব কম। ইসলামে পাত্র নির্বাচনের ক্ষেত্রে দ্বীনদারিতাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"إِذَا جَاءَكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ خُلُقَهُ وَدِينَهُ فَأَنْكِحُوهُ، إِلَّا تَفْعَلُوا تَكُنْ فِتْنَةٌ فِي الْأَرْضِ وَفَسَادٌ عَرِيضٌ" (رواه الترمذي: 1084)
"তোমাদের কাছে যখন এমন ব্যক্তি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসে যার চরিত্র ও দ্বীন তোমরা পছন্দ কর, তাহলে তাকে বিয়ে করে দাও। যদি তোমরা তা না কর, তাহলে পৃথিবীতে ফিতনা ও বড় অশান্তি সৃষ্টি হবে।" (সুনান আত-তিরমিযী: ১০৮৪)
৩. অপেক্ষার সময়সীমা নেই
তিনি আপনাকে অপেক্ষা করতে বলেছেন, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা দেননি। এটি অনির্দিষ্টকালের জন্য অপেক্ষা, যা আপনার জীবনকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেবে। ইসলামে এমন অপেক্ষা জায়েয নয়।
৪. আপনার বিয়ে করা জরুরি
আপনি উল্লেখ করেছেন যে আপনার বিয়ে করা জরুরি। ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই বিয়েকে উৎসাহিত করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"وَأَنكِحُوا الْأَيَامَىٰ مِنكُمْ وَالصَّالِحِينَ مِنْ عِبَادِكُمْ وَإِمَائِكُمْ" (سورة النور: 32)
"তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহহীন তাদের বিবাহ দাও এবং তোমাদের দাস-দাসীদের মধ্যে যারা সৎকর্মশীল তাদেরও।" (সূরা আন-নূর: ৩২)
৫. শরীয়ত বহির্ভূত সম্পর্ক থেকে বিরত থাকা
উক্ত পুরুষের সাথে আপনার অতীতে শরীয়ত বহির্ভূত কথাবার্তা হয়েছে। এই সম্পর্ক অব্যাহত থাকলে আবারও পাপে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَا ۖ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا" (سورة الإسراء: 32)
"তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয় তা অশ্লীল কাজ এবং খুবই মন্দ পথ।" (সূরা বনী ইসরাঈল: ৩২)
হানাফী ফিকহের নির্দেশনা
ইমাম আবু হানীফা (রহ.) ও অন্যান্য হানাফী ফুকাহায়ে কেরাম এর মতে, বিবাহ একটি সুন্নতে মুয়াক্কাদা (দৃঢ় সুন্নত)। যখন কোনো ব্যক্তি বিবাহ করতে সক্ষম হয় এবং তার বিবাহের প্রয়োজন হয়, তখন তার জন্য বিবাহ করা উত্তম এবং বিলম্ব করা অনুচিত। (আল-হিদায়া: ২/২২২, রদ্দুল মুহতার: ৩/৮)
ফাতাওয়া হিন্দিয়ায় বলা হয়েছে: "الْإِمَامُ أَبُو حَنِيفَةَ رَحِمَهُ اللَّهُ تَعَالَى يَقُولُ: إذَا خَافَ عَلَى نَفْسِهِ الزِّنَا، فَالنِّكَاحُ أَفْضَلُ" (الفتاوى الهندية: ১/১৬৯)
"ইমাম আবু হানীফা (রহ.) বলেন: যদি কেউ নিজের জন্য যিনার ভয় করে, তাহলে তার জন্য বিবাহ করা সবচেয়ে উত্তম।"
আপনার করণীয়
১. আল্লাহর কাছে তাওবা করুন - অতীতে শরীয়ত বহির্ভূত কথাবার্তা ও দেখা-সাক্ষাতের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। আল্লাহ তাওবা কবুলকারী।
২. সম্পর্ক ছিন্ন করুন - উক্ত পুরুষের সাথে যাবতীয় যোগাযোগ বন্ধ করে দিন। অপেক্ষা করার কোনো প্রয়োজন নেই।
৩. উপযুক্ত পাত্র খুঁজুন - দ্বীনদার, সচ্চরিত্র ও যোগ্য পাত্র খুঁজুন। মসজিদের ইমাম, মাদ্রাসার আলেম বা পরিবারের বড়দের মাধ্যমে পাত্র খোঁজার চেষ্টা করুন।
৪. ইস্তিখারা করুন - আল্লাহর কাছে এই বিষয়ে ইস্তিখারা করুন এবং ভালো সিদ্ধান্ত নিন।
৫. পরিবারের সাথে পরামর্শ করুন - আপনার পরিবারের বা অভিভাবকের সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করুন এবং তাদের পরামর্শ নিন।
উপসংহার
আপনার জন্য উক্ত পুরুষের জন্য অপেক্ষা করা ঠিক হবে না। তার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, তিনি এখন বিয়ে করতে চান না, এবং তার দ্বীনের জ্ঞান কম। এই সব কারণে অপেক্ষা করা আপনার জন্য ক্ষতিকর। আপনি এখনই বিয়ের জন্য উপযুক্ত ও দ্বীনদার পাত্র খোঁজা শুরু করুন। আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য উত্তম ব্যবস্থা করবেন, ইনশাআল্লাহ।
- রদ্দুল মুহতার (৩/৮)
- আল-হিদায়া (২/২২২)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (১/১৬৯)
- ফাতাওয়া উসমানি (২/২৪৫)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/৪৫০)
- বেহিশতি জেওর (পর্ব-৪, বিয়ে ও তালাক অধ্যায়)
আল্লাহু আলিম (আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন)