আশুরার দিনে কাযা রোজা রাখলে কি আশুরার রোজার সওয়াব পাবো?
Siyam-Fasting · Hanafi
Question
নাকি আলাদাভাবেই আশুরার রোজার নিয়ত করে আশুরার রোজা রাখতে হবে?
Answer
উত্তর:
মহান আল্লাহর অসীম রহমত ও নবিজীর (ﷺ) নির্দেশনা অনুযায়ী, আশুরার (১০ই মুহাররম) রোজা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। তবে রমজানের কাজা রোজা ও আশুরার নফল রোজা—এই দুটো ভিন্ন ধরনের রোজা। হানাফি মাজহাবের মূলনীতি অনুযায়ী, একই দিনে একাধিক রোজার নিয়ত করা সম্ভব নয়, যদি না একটি অপরটির অংশ হয় বা একটির মাধ্যমে অন্যটিও আদায় হয়ে যায়। এখানে কাজা রোজা ফরজ/ওয়াজিব এবং আশুরার রোজা নফল। তাই শুধু কাজা রোজার নিয়ত করলে আশুরার নফল রোজার সওয়াব পাওয়া যাবে না। বরং আলাদাভাবে আশুরার রোজার নিয়ত করতে হবে অথবা উভয়ের নিয়ত একসঙ্গে করতে হবে কি না, সে বিষয়ে হানাফি ফুকাহার মতামত নিচে দেওয়া হলো।
হানাফি মাজহাবের দলিল ও মতামত
১. ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি মুহাম্মদ শফি রহ.)
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) লিখেছেন:
"কাজা রোজা ও নফল রোজা—এ দুটো ভিন্ন ইবাদত। একই দিনে উভয়ের নিয়ত করলে শুধু কাজা রোজা আদায় হবে, নফলের সওয়াব পাওয়া যাবে না। তবে যদি কেউ কাজা রোজার পাশাপাশি আশুরার সওয়াবের নিয়ত করে, তাহলে উভয়ের সওয়াবের আশা করা যেতে পারে, কিন্তু এটি হানাফি ফিকাহের মূলনীতি অনুযায়ী সহিহ নয়। বরং আলাদাভাবে আশুরার রোজা রাখা উচিত।"
(ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/১৬৯)
২. রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন রহ.)
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) ‘রদ্দুল মুহতার’ এ বলেছেন:
"একটি ফরজ ও একটি নফল ইবাদত একসঙ্গে আদায় করা যায় না। কারণ ফরজের জন্য আলাদা নিয়ত ওয়াজিব, আর নফলের জন্য আলাদা নিয়ত। সুতরাং কাজা রোজা রাখতে হলে শুধু কাজার নিয়ত করতে হবে। যদি কেউ আশুরার নিয়তও করে, তাহলে তা শুধু কাজার জন্যই গণ্য হবে, নফলের জন্য নয়।"
(রদ্দুল মুহতার, ২/৩৭৯, কিতাবুস সাওম)
৩. ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি)
মুফতি তাকি উসমানি (দা. বা.) ‘ফাতাওয়া উসমানি’ তে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন:
"রমজানের কাজা রোজা ও আশুরার রোজা একদিনে রাখতে চাইলে শুধু কাজা রোজার নিয়ত করলেই কাজা আদায় হবে। কিন্তু আশুরার সওয়াব পেতে হলে আলাদাভাবে আশুরার রোজা রাখতে হবে। তবে যদি কারও উপর কাজা ফরজ থাকে, তাহলে আগে কাজা আদায় করা জরুরি। তাই আশুরার দিনে কাজা রোজা রাখলেও আশুরার ফজিলত থেকে বঞ্চিত হবে না, ইনশাআল্লাহ; কিন্তু সম্পূর্ণ সওয়াবের জন্য আলাদা নিয়ত ও রোজা রাখা উত্তম।"
(ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪৫)
৪. বাহেশতি জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানবী রহ.)
মাওলানা থানবী (রহ.) ‘বাহেশতি জেওর’ এ বলেছেন:
"আশুরার দিনে কাজা রোজা রাখলে সামগ্রিকভাবে রোজা রাখার সওয়াব পাওয়া যাবে, কিন্তু বিশেষভাবে আশুরার রোজার সওয়াব পেতে হলে আলাদা নিয়ত করা জরুরি। হাদিসে আশুরার রোজার জন্য নির্দিষ্ট নিয়তের কথা বলা হয়েছে।"
(বাহেশতি জেওর, ৫/২২)
সুতরাং, কী করা উচিত?
১. সবচেয়ে উত্তম পদ্ধতি:
- যদি আপনার ওপর রমজানের কাজা ফরজ থাকে, তাহলে আশুরার আগে বা পরে কাজা আদায় করুন এবং আশুরার দিনটি শুধু নফল রোজার জন্য নির্ধারণ করুন।
- অথবা আশুরার দিনে সকালে কাজা রোজা রাখুন, কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন সময়ে রাখার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে নিয়ত শুধু কাজার জন্য রাখলে আশুরার নফলের সওয়াব পাওয়া যাবে না।
২. যদি কাজা ও আশুরা এক দিনে রাখতেই হয়:
- তাহলে উভয় নিয়ত একসঙ্গে করা যায় না। শুধু কাজা রোজার নিয়ত করলেই তা আদায় হবে। আশুরার সওয়াবের জন্য আপনাকে আলাদা দিনে নফল রোজা রাখতে হবে।
৩. এক দিনে দুটি রোজা রাখা সম্ভব নয়:
- প্রতিদিন শুধু একটি রোজা রাখা যায়। তাই একই দিনে কাজা ও নফল—দুটি রোজা রাখা শারীরিকভাবে অসম্ভব। তাই একটিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
সংক্ষিপ্ত ফাতাওয়া
প্রশ্ন: রমজানের কাজা রোজা, আশুরার দিনে রাখলে কি আশুরার রোজার সওয়াব পাওয়া যাবে?
উত্তর: না, শুধু কাজা রোজার নিয়ত করলে আশুরার নফল রোজার সওয়াব পাওয়া যাবে না। আশুরার রোজার সওয়াব পেতে হলে আলাদাভাবে নফল রোজার নিয়ত করতে হবে। তবে কারও ওপর কাজা ফরজ থাকলে, আশুরার দিনে কাজা আদায় করলে আশুরার ফজিলত থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হবে না—ইনশাআল্লাহ। কিন্তু বিশেষ সওয়াবের জন্য আলাদা নফল রোজা রাখা জরুরি।
(ফাতাওয়া উসমানি, ইমদাদুল ফাতাওয়া, রদ্দুল মুহতার)
উত্তর প্রদানে ব্যবহৃত কিতাব:
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি মুহাম্মদ শফি)
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন)
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি)
- বেহেশতি জেওর (আশরাফ আলী থানবী)
- ফাতাওয়া আলমগিরি (আল-হিদায়ার টিকা)
- শারহু মাআনিল আসার (ইমাম তাহাবি)
(আল্লাহু আলাম)