স্বামীর দোষ পরিবারকে জানালে কি গীবত হবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
শাইখ, আমি দাম্পত্য জটিলতায় ভুগছি। এই সংক্রান্ত কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দিবেন অনুগ্রহ করে।
আমার স্বামী আগে নিয়মিত গায়ে হাত তুললেও পরবর্তীতে সেটার পরিমাণ কমেছে। বর্তমানে মাসে ১\২ বার হাত তুলে যা একটু বড় ধরনের। যেমন, কখনো আমি বেশ ব্যথা পাই, কখনো বা শরীরের কোনো জায়গায় কালো দাগ পড়ে যায়। আর এমনিতে বিচ্ছিন্নভাবে এক দুইটা চড় থাপ্পড়/গালি এইগুলো তো আছেই।
১. তার এইসব আচরণে আমি অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি কিংবা "আমি যেহেতু চলেই যাবো" এই ফিকির অনেক আগে থেকেই আছে তাই হয়ত বা খুব বেশি খারাপ লাগে না এখন আর। আমি যতটুকু জানি যদি স্বামীর নির্যাতন অসহ্যকর হয় তবে তালাক চাওয়া যায়। কিন্তু, আমার ক্ষেত্রে আমি নিজেকে বেশ ভালোই আছি মনে হচ্ছে। হয়ত বা প্রথমোক্ত কারণ দুইটার কারণে। যেহেতু আমার খুব বেশিই কষ্ট হচ্ছে না তাই তালাক চাওয়া জায়েজ হবে? অবশ্য আমি জানি না এইখানে থাকার বিষয়ে মন:স্থ করলে আমি এখনকার মতো থাকবো নাকি কষ্টের পরিমাণ বেড়ে যাবে।
২.আমি তার সাথে থাকতে চাচ্ছি না কিন্তু ইতিমধ্যেই আমি কনসিভ করি। ৩০-৪০ দিন হবে খুব সম্ভবত। আমি এই বাচ্চা নষ্ট করতে আল্লাহকে ভয় পাচ্ছি এবং এটা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও অনেক গর্হিত তবুও আমি যেহেতু এই লোকটার সাথে থাকবো না তাই এই বাচ্চা দুনিয়াতে আসলে পরবর্তীতে বিভিন্ন জটিলতা সৃষ্টি হবে আমার জন্য । পরবর্তীতে বাচ্চার মুখের দিকে তাকিয়ে তো আর যেতে পারবো না। আমার জন্য কি জায়েয হবে গর্ভপাত করা?
৩. আমি কি তার এইসব আচরণ বিস্তারিতভাবে তার ফ্যামিলি জানাতে পারবো এই নিয়াতে যে পরবর্তীতে আমি চলে গেলে কেউ যেনো আমাকে দোষারোপ করতে না পারে। সবাই যেনো আগে থেকেই তাদের ছেলের জুলুম সম্বন্ধে জানতে পারে। নাকি এটা গীবতের অন্তর্ভুক্ত হবে?
Answer
প্রশ্নের উত্তর
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله والصلاة والسلام على رسول الله
আপনার বড় আপু দাম্পত্য জীবনে শারীরিক নির্যাতন ও মানসিক জটিলতার সম্মুখীন হয়েছেন। তিনি তিনটি বিষয়ে ইসলামী নির্দেশনা জানতে চেয়েছেন। নিচে হানাফি ফিকহ ও কুরআন-হাদিসের আলোকে উত্তর দেওয়া হলো।
১. স্বামীর নির্যাতন "অসহ্য" না হলে কি তালাক চাওয়া জায়েজ?
ইসলামে স্ত্রীর জন্য তালাক চাওয়া সাধারণত নিরুৎসাহিত, তবে যদি স্বামীর অত্যাচার বা দুর্ব্যবহার এমন হয় যে স্ত্রী আল্লাহর নির্ধারিত সীমা রক্ষা করতে পারছে না, তবে তিনি খুলা বা আদালতের মাধ্যমে ফাসখ (বিচ্ছেদ) চাইতে পারেন।
আপনার বর্ণনায় স্বামী মাসে ১-২ বার মারধর করে, যা শরীরে কালো দাগ ফেলে বা ব্যথা দেয়। এটি যুলুম এবং ক্ষতি (দারার) এর অন্তর্ভুক্ত। ফিকহে হানাফিতে স্ত্রীর জন্য নির্যাতন সহনশীলতার মাত্রা গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং নির্যাতনের অস্তিত্বই যথেষ্ট। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন:
"যদি স্বামী স্ত্রীকে মারধর করে এবং সে তার সাথে থাকতে অপারগ হয়, তবে সে বিচ্ছেদ চাইতে পারে।" (রদ্দুল মুহতার, ৪/৫২৩)
আপনি যদি মনে করেন বর্তমানে "অভ্যস্ত" হয়ে গেছেন বা "চলে যাবো" ভেবে কষ্ট কম লাগে, তার মানে এই নয় যে নির্যাতন জায়েজ বা তা তালাকের অনুমতি বাতিল করে। বরং আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা (চলে যাওয়া) এবং কষ্ট বাড়ার আশঙ্কা (যদি থাকতে চান) উভয়ই বৈধ কারণ।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আর যদি নারী তার স্বামীর অত্যাচার বা উপেক্ষার ভয় করে, তবে তাদের নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করাতে কোন পাপ নেই।" (সূরা নিসা: ১২৮)
এই আয়াতে "ভয়" অর্থাৎ সম্ভাব্য ক্ষতি থেকেও সমঝোতা বা বিচ্ছেদের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তাই তালাক বা খুলা চাওয়া আপনার জন্য জায়েজ। তবে উত্তম হলো প্রথমে পরিবারের মাধ্যমে সমঝোতা ও সাবধানবাণী, তারপর বিচ্ছেদ।
সারসংক্ষেপ:
- শারীরিক নির্যাতন থাকলে স্ত্রী তালাক চাইতে পারেন, তা সহনশীল মনে হলেও।
- আপনার "অভ্যস্ততা" বা "ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা" বিচ্ছেদের বৈধতাকে প্রভাবিত করে না।
- আপনি যদি থাকতে মনস্থ করেন, তবে কষ্ট বাড়ার আশঙ্কায় সতর্ক থাকুন।
২. ৩০-৪০ দিনের গর্ভবতী অবস্থায় গর্ভপাত করা কি জায়েজ?
হানাফি ফিকহে গর্ভপাতের হুকুম গর্ভের বয়সের ওপর নির্ভরশীল:
- ১২০ দিনের (৪ মাস) আগে: যদি বৈধ কারণ থাকে (যেমন মায়ের জীবন রক্ষা বা গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি), তবে কিছু ফকিহ অনুমতি দিয়েছেন। কিন্তু শুধু সামাজিক জটিলতা বা ভবিষ্যৎ অসুবিধা বৈধ কারণ নয়।
- ১২০ দিনের পর: একেবারে হারাম, কারণ তখন রূহ ফুঁকানো হয়।
আপনার বাচ্চা ৩০-৪০ দিনের। এই সময়ে গর্ভপাত করা ঠিক নয় যদি না কোনো ডাক্তারি কারণে মায়ের জীবন বিপন্ন হয়। আপনার বর্ণনায় "বাচ্চার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারবো না" বা "জটিলতা হবে" – এগুলো গর্ভপাত করা ঠিক হবে না।
ইমদাদুল ফাতাওয়া (১/৪৬৬) তে বলা হয়েছে:
"গর্ভপাত করা নাজায়েজ, এমনকি গর্ভের প্রথম অবস্থায়ও, যদি না কোনো শরয়ি ওজর থাকে।"
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) লিখেছেন:
"সন্তান হত্যা কবিরা গুনাহ। গর্ভপাতের অনুমতি কেবল মায়ের জীবন বাঁচানোর জন্য, তাও বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শে।" (মা'আরিফুল কুরআন, ৬/২৭৬)
- আপনি স্বামী থেকে আলাদা হলেও সন্তান আপনার দায়িত্ব। ইসলামে সন্তান লালন-পালন ও ভরণপোষণের বিধান রয়েছে।
৩. স্বামীর ফ্যামিলিকে তার অন্যায় আচরণ জানানো কি গীবত?
গীবত (পরনিন্দা) হলো এমন কোনো বিষয় বলা যা শুনলে ব্যক্তি কষ্ট পায়, যদিও তা সত্য হয়। তবে কয়েকটি ক্ষেত্রে গীবত জায়েজ:
- জুলুম থেকে বাঁচতে সাহায্য চাওয়া (যেমন: জালিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ)
- অন্যকে সতর্ক করা (যেমন: কারও ক্ষতি থেকে বাঁচাতে)
- নিজের নির্দোষিতা প্রমাণ করা (যদি অপবাদ আসে)
হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:
"গীবত করা হারাম, তবে ছয় ব্যক্তি গীবত করা যায়: জালিম, ফাসিক, বিদআতি..." (সুনানে বাইহাকি, ১০/২৩৮)
আপনার নিয়ত হলো – "আমি চলে গেলে যেন আমাকে দোষ না দেয়, বরং আগে থেকে জানতে পারে যে তাদের ছেলে অন্যায় করেছে।" এটি গীবত নয়, বরং নিজের হক রক্ষা ও সতর্কবার্তা। তবে শর্ত হলো:
- শুধু সত্য বলা (অতিরঞ্জন নয়)
- প্রয়োজনমত বলা (সবিস্তার না দিয়ে মূল ঘটনা)
- নিয়ত যেন গীবতের না হয়, বরং ন্যায় প্রতিষ্ঠার হয়।
মুফতি তকি উসমানি (দা.বা.) বলেন:
"যদি কেউ জুলুমের শিকার হয় এবং অন্যায়কারীর পরিবারকে জানায় যেন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় বা নিজেকে রক্ষা করে, তবে তা গীবত হবে না।" (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৫০৪)
সারসংক্ষেপ:
- আপনি স্বামীর ফ্যামিলিকে তার নির্যাতনের কথা বলতে পারেন, তবে সতর্কতাসহ।
- এটি গীবতের অন্তর্ভুক্ত হবে না, যদি নিয়ত হয় নিজেকে দোষমুক্ত করা ও তাদের সতর্ক করা।
পরামর্শ
১. সমঝোতার চেষ্টা করুন: প্রথমে স্বামীকে ইসলামী নির্দেশনা দিন (মারধর নাজায়েজ)। পরিবার বা আলেমের মাধ্যমে বুঝান।
২. আইনি সাহায্য: সম্ভব হলে ইসলামী ম্যাজিস্ট্রেটের (আদালত) কাছে যান।
৩. গর্ভাবস্থায় ধৈর্য: সন্তান জন্মের পর খুলা বা তালাক নিন। বর্তমানে গর্ভপাত করা ঠিক হবে না।
৪. পরিবারকে জানান: প্রয়োজনে আপনার পরিবার ও তার পরিবারকে জানান, তবে গোপনীয়তা ও প্রয়োজনসীমা মেনে।
আল্লাহ আপনার অবস্থা সহজ করুন এবং সঠিক পথ দেখান। আমিন।
والله أعلم بالصواب