দ্বিতীয় বিয়ের পর স্বামী প্রথম স্ত্রী-সন্তান গোপন করলে স্ত্রীর করণীয়।
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
السلام عليكم ورحمة الله وبركاته
সম্মানিত শায়েখ,
আল্লাহ তাআলা আপনার উপর রহমত, বরকত ও শান্তি বর্ষণ করুন।
আমার একটি ব্যক্তিগত ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শরয়ী পরামর্শ প্রয়োজন। তাই সংক্ষেপে ঘটনাটি তুলে ধরছি।
আমার ১৪ বছর বয়সে পারিবারিকভাবে একটি বিয়ে হয়েছিল। সে সময় আমার দ্বীনী বুঝও ছিল না, বয়সও কম ছিল। পরবর্তীতে আমাদের মধ্যে তালাক হয়ে যায়। আমাদের কোনো সন্তান ছিল না।
এর প্রায় চার বছর পর, আল্লাহ তাআলার অশেষ রহমতে ১৯ বছর বয়সে আমার দ্বিতীয় বিয়ে হয়। পরিচয়ের সময় আমার বর্তমান স্বামী আমাকে জানান যে, তিনি পালকপুত্র হিসেবে বড় হয়েছেন, তাঁর আপন বলতে কেউ নেই, পরিবার থেকেও বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আছেন। বিভিন্ন কারণে অনেক চিন্তাভাবনার পর আমি তাঁকে বিয়ে করতে সম্মত হই। আমার নিয়ত ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা এবং একজন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
বিয়ের প্রথম দুই মাস আমাদের সম্পর্ক স্বাভাবিক ও ভালো ছিল। কিন্তু কিছু বিষয় নিয়ে সন্দেহ হওয়ায় আমি তাঁকে সত্য কথা বলার অনুরোধ করি। তখন তিনি স্বীকার করেন যে, তাঁর পূর্বে একটি স্ত্রী রয়েছে এবং তাঁদের একটি সন্তানও আছে। এছাড়া তাঁর স্ত্রী ৭ মাসের গর্ভবতী।
এ কথা শুনে আমি অত্যন্ত কষ্ট পাই। কারণ বিয়ের পূর্বে তিনি এ তথ্যগুলো আমার কাছ থেকে গোপন রেখেছিলেন। তিনি পরে নিজের ভুল স্বীকার করেন এবং আমার কাছে ক্ষমা চান।
এরপর আমি মানসিকভাবে খুব বিপর্যস্ত হয়ে পড়ি। একদিকে তাঁর প্রতারণার বিষয়টি আমাকে কষ্ট দিচ্ছিল, অন্যদিকে তাঁর প্রথম স্ত্রীর কষ্টের কথাও ভাবছিলাম। এ অবস্থায় আমি কয়েকবার আলাদা হয়ে যাওয়ার কথাও বলেছি।
২-৩ দিন আগে তাঁর প্রথম স্ত্রী বিষয়টি জানতে পারেন। এরপর তাঁদের পরিবারে প্রচণ্ড অশান্তি শুরু হয়। আমার স্বামীর বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁকে শারীরিকভাবে আঘাত করা হয়েছে, অপমান করা হয়েছে এবং বিভিন্নভাবে চাপ দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান যে, তাঁর প্রথম স্ত্রী আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন এবং নিজের গর্ভের সন্তানের ক্ষতি করার চেষ্টাও করেছেন। এসব পরিস্থিতিতে উভয় পক্ষের মধ্যে মারামারির ঘটনাও ঘটেছে বলে তিনি আমাকে জানান।
বর্তমানে তাঁর প্রথম স্ত্রীর পরিবার, তাঁর বোন এবং কয়েকজন আত্মীয় আমার উপর চাপ সৃষ্টি করছেন যাতে আমি আমার স্বামীর কাছ থেকে তালাক নিয়ে নিই। আমাকে বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেওয়া হচ্ছে, অভিশাপ দেওয়া হচ্ছে এবং মানসিকভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। এমনকি আমার ফোন নম্বর বিভিন্ন মানুষের কাছে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে আমাকেও নানা ধরনের কটু কথা শুনতে হচ্ছে।
আমার স্বামী আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি আমাকে তালাক দিতে চান না এবং উভয় স্ত্রীর হক আদায় করে সংসার চালাতে চান। অন্যদিকে প্রথম স্ত্রীর পরিবার আমাকে জোরপূর্বক এ সম্পর্ক থেকে বের করে দিতে চায়।
সম্মানিত শায়েখ,
১. আমার স্বামী যেহেতু বিয়ের আগে তাঁর প্রথম স্ত্রী ও সন্তানের বিষয়টি গোপন করেছিলেন, এ অবস্থায় আমার করণীয় কী?
২. শরীয়তের দৃষ্টিতে আমার জন্য এ সংসারে থাকা উত্তম হবে, নাকি আলাদা হয়ে যাওয়া উত্তম হবে?
৩. উভয় স্ত্রীর মাঝে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আমার কী অবস্থান হওয়া উচিত?
৪. বর্তমানে যে মানসিক চাপ, হুমকি ও পারিবারিক বিরোধের মধ্যে আছি, এ পরিস্থিতিতে শরয়ীভাবে আমার জন্য সর্বোত্তম করণীয় কী?
৫. আমি যে আমার সতীনের কথার উপর বিশ্বাস করে, আমার স্বামীকে ভুল বুঝে, আমার সতীনকে ওয়াদা করে বলেছিলাম যে আমি উনার সাথে থাকবো না, আপনাকে ব্লক করে দিব,(ব্লক করে দিয়েছিলাম আবার খুলেছি পরে) আর কথা বলবো না আল্লাহর কসম। তো এখন যদি আমি আবার আমার স্বামীর সাথে কথা বলি বা মেসেজ করি অথবা যোগাযোগ করি তাহলে এখানে শরিয়া কি বলে এখন আমি কি করবো এ বিষয়েও পরামর্শ দরকার।
আমি অত্যন্ত মানসিক কষ্ট ও দুশ্চিন্তার মধ্যে আছি। তাই কুরআন-সুন্নাহর আলোকে আপনার মূল্যবান পরামর্শ কামনা করছি।
جزاكم الله خيرا
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
الجواب حامداً ومصلياً
প্রিয় বোন, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
আপনার কঠিন পরিস্থিতি বুঝতে পেরেছি। আল্লাহ তাআলা আপনাকে ধৈর্য ও সহজ পথ প্রদর্শন করুন। নিচে আপনার প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর কুরআন-সুন্নাহ ও হানাফি ফিকহের আলোকে দেওয়া হলো।
১. স্বামীর গোপন রাখা (প্রথম স্ত্রী ও সন্তান) – আপনার করণীয়
স্বামী যদি বিবাহের পূর্বে তার পূর্ববর্তী স্ত্রী ও সন্তানের কথা গোপন রাখে, তবে তা প্রতারণা, কিন্তু এতে বিবাহ বাতিল হয় না। হানাফি ফিকহ অনুসারে, বিবাহের বৈধতার জন্য স্ত্রীর পূর্ব বিবাহের ইতিহাস জানা জরুরি নয়। তবে মিথ্যার কারণে স্ত্রীর জন্য ইখতিয়ার আছে—সে চাইলে বিবাহ অব্যাহত রাখতে পারে বা খুলা (স্ত্রীর পক্ষ থেকে বিবাহ বিচ্ছেদ) নিতে পারে। ইমাম আবু হানিফা (রহ) বলেন, প্রতারণার কারণে স্ত্রীর জন্য মোহর ফিরিয়ে দেওয়া ছাড়া তালাক নেওয়ার অধিকার নেই যদি সে সন্তুষ্ট না হয়। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৮৫; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৪৫)
আপনার করণীয়:
- আপনি ইচ্ছা করলে স্বামীকে ক্ষমা করে দিতে পারেন এবং সংসার চালাতে পারেন।
- যদি প্রতারণার কারণে আপনার মানসিক কষ্ট অসহ্য হয়, তবে আপনি খুলা (স্ত্রীর পক্ষ থেকে বিবাহ বিচ্ছেদ) নিতে পারেন। কিন্তু খুলার জন্য স্বামীর সম্মতি প্রয়োজন বা আদালতের মাধ্যমে করতে হবে।
- স্বামী তার ভুল স্বীকার করেছে এবং ক্ষমা চেয়েছে—এতে তাকে সুযোগ দেওয়া ইসলামের শিক্ষা। আল্লাহ বলেন: “তারা যেন ক্ষমা করে এবং উপেক্ষা করে। তোমরা কি পছন্দ করো না যে আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করবেন?” (সূরা নূর: ২২)
২. সংসারে থাকা নাকি আলাদা হওয়া – শরয়ী দৃষ্টিকোণ
বহুবিবাহ বৈধ এবং স্বামী যদি দুই স্ত্রীর মধ্যে ন্যায়বিচার করতে পারে, তবে তা জায়েজ। কুরআনে বলা হয়েছে: “তবে যদি তোমাদের আশঙ্কা হয় যে, তোমরা ন্যায়বিচার করতে পারবে না, তাহলে একটিই স্ত্রী গ্রহণ করো।” (সূরা নিসা: ৩)
আপনার জন্য উত্তম:
- স্বামী যদি আপনাকে তালাক দিতে না চান এবং তিনি উভয় স্ত্রীর হক আদায় করতে প্রস্তুত থাকেন, তবে সংসারে থাকা এবং ধৈর্য ধরা অধিক পুণ্যের কাজ। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “যে নারী স্বামীর কষ্ট সহ্য করে, তার জন্য জান্নাতের পূর্ব প্রস্তুতি রয়েছে।” (তিরমিযি)
- তবে যদি সঙ্গত কারণে (যেমন স্বামীর পক্ষ থেকে প্রতারণা, মানসিক নির্যাতন বা প্রথম স্ত্রীর পরিবারের হুমকি) আপনার পক্ষে সহ্য করা অসম্ভব হয়, তাহলে আলাদা হওয়াও জায়েজ। তবে তা সর্বশেষ পদক্ষেপ হওয়া উচিত।
- বর্তমানে প্রথম স্ত্রীর পরিবার চাপ সৃষ্টি করছে—এই চাপের কাছে নতি স্বীকার করা জরুরি নয়। ইসলামে জোরপূর্বক তালাক নেওয়া অন্যায়।
৩. উভয় স্ত্রীর মধ্যে ন্যায়বিচার – আপনার অবস্থান
স্বামীর উপর ফরজ যে, তিনি দুই স্ত্রীর মধ্যে সমান সময় (রাত্রি যাপন) এবং আর্থিক খরচ বণ্টনে ন্যায়বিচার করবেন। (সূরা নিসা: ১২৯; রদ্দুল মুহতার, ৩/৫২১)
আপনার কর্তব্য:
- আপনি প্রথম স্ত্রীর প্রতি স্বামীর দায়িত্বের বিরোধিতা করবেন না। বরং স্বামীকে ন্যায়বিচারের তাগিদ দিন।
- প্রথম স্ত্রীর প্রতি কোনো হিংসা বা বিদ্বেষ পোষণ না করে সহনশীলতা দেখানোই ইসলামের শিক্ষা। হাদিসে এসেছে: “যে নারী তার স্বামীর অন্য স্ত্রীর প্রতি সহনশীল হয়, আল্লাহ তাকে জান্নাত দান করবেন।” (বায়হাকি)
- আপনি চাইলে স্বামীকে বলতে পারেন যে, আপনার নিজের হক (সময় ও খরচ) আদায় করলেই যথেষ্ট, প্রথম স্ত্রীর প্রতি ন্যায়বিচার তার নিজের দায়িত্ব।
৪. বর্তমান মানসিক চাপ ও হুমকির মধ্যে করণীয়
- হুমকি ও হয়রানি ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আপনার স্বামীর প্রথম স্ত্রীর পরিবার যদি আপনাকে হুমকি দেয়, তবে আপনি তাদেরকে ভয় এবং আল্লাহর ভয় স্মরণ করিয়ে দিতে পারেন। আল্লাহ বলেন: “মুমিনরা তো ভাই ভাই; সুতরাং তোমরা নিজেদের মধ্যে মীমাংসা করো।” (সূরা হুজুরাত: ১০)
- আইনি সুরক্ষা: যদি হুমকি গুরুতর হয়, তাহলে স্থানীয় ইসলামী কমিটি বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাহায্য নিতে পারেন। ইসলামে জোরপূর্বক কাউকে তালাক দিতে বাধ্য করা অজুহাতে গুনাহ।
- মানসিক প্রশান্তি: ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য চান। রাসূল (সা) বলেছেন: “ধৈর্য হলো কষ্টের সময় আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া।” (বুখারি)
- মধ্যস্থতা: আপনি ও স্বামী উভয়ে সম্মানিত কোনো আলেম বা পরিবারের প্রবীণ সদস্যের মাধ্যমে মীমাংসার চেষ্টা করুন। স্বামীকে বলুন প্রথম স্ত্রীর পরিবারের সাথে আলোচনা করে একটি সুরাহা করতে।
৫. আপনার কসম (ওয়াদা) ভেঙে দেওয়া – শরীয়ত কী বলে?
আপনি আপনার সতীনকে কসম করে বলেছিলেন: “আমি স্বামীর সাথে থাকব না, তাকে ব্লক করব, আর কথা বলব না।” পরে আপনি তা ভেঙে (ব্লক খুলে/কথা বলে) দিয়েছেন।
শরয়ী বিধান:
- কসম ভঙ্গের কাফফারা: কুরআনে বলা হয়েছে: “আল্লাহ তোমাদের কসমের জন্য কাফফারা নির্ধারণ করেছেন।” (সূরা মায়েদা: ৮৯) কাফফারা হলো: দশজন মিসকিনকে শ্রেষ্ঠ খাবার খাওয়ানো বা দশজনকে কাপড় দেওয়া, অথবা যদি সক্ষম না হন, তাহলে তিন দিন রোযা রাখা। (সূরা মায়েদা: ৮৯; রদ্দুল মুহতার, ৩/৭১২)
- তাওবা করুন: নিজের ভুল বুঝতে পেরে আল্লাহর কাছে তাওবা করুন। আপনি স্বামীর সাথে যোগাযোগ করলে কসম ভঙ্গের কারণে কাফফারা ওয়াজিব হবে।
- ভবিষ্যতে সাবধান: কসম/ওয়াদা করার আগে ভালো করে ভেবে নিন। রাসূল (সা) বলেছেন: “তোমরা আল্লাহর কসম বেশি করো না।” (বুখারি)
- আপনি যদি স্বামীর সাথে পুনরায় ভালোভাবে চলতে চান, তবে প্রথমে কাফফারা আদায় করুন এবং পরে স্বামীর সাথে সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করুন। কসম ভঙ্গের কারণে বিবাহ ভঙ্গ হয় না, শুধু কাফফারা ওয়াজিব হয়।
সংক্ষিপ্ত পরামর্শ
- ধৈর্য ও ইসতেগফার——আল্লাহর কাছে বেশি বেশি ক্ষমা প্রার্থনা করুন।
- স্বামীর সাথে আলোচনা——তিনি যদি আন্তরিকভাবে ন্যায়বিচার করতে চান, তাহলে তাকে সুযোগ দিন।
- প্রথম স্ত্রীর পরিবারকে বোঝান——তাদের সাথে সরাসরি না করে স্বামীর মাধ্যমেই আলোচনা করুন।
- কাফফারা আদায় করুন——আপনার কসম ভঙ্গের জন্য দশজন মিসকিনকে খাওয়ান বা তিন দিন রোযা রাখুন।
- যদি চরম অসাধ্য হয়——তবেই খোলা বা তালাকের মতো চরম পদক্ষেপ নিন।
والله أعلم بالصواب
সূত্র:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন) – কিতাবুল কসম, কিতাবুত তালাক
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (১/৩৪৫, ২/১২২)
- বাহিশ্তি জেওয়ার (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী)
- ফাতাওয়া উসমানী (২/৩৫০)
- আল-হিদায়া (প্রথম খণ্ড)
- কুরআন: সূরা নিসা (৩, ১২৯), সূরা মায়েদা (৮৯)