বিবাহের বৈধতার জন্য মুখে কবুল বলা আবশ্যক? নাকি শুধু সাইন বা স্বাক্ষর করলেই যথেষ্ট হবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
উত্তর
ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহ।
আপনার প্রশ্নে উল্লেখিত বিবাহটি সঠিক ও শরিয়তসম্মত নয়। কারণ হানাফি মাজহাবের মূলনীতি অনুযায়ী, বিবাহের বৈধতার জন্য ইজাব (প্রস্তাব) ও কবুল (গ্রহণ) মুখে উচ্চারণ করা আবশ্যক। শুধুমাত্র সাইন (স্বাক্ষর) বা লিখিত দলিল যথেষ্ট নয়, যদি না কোনো বিশেষ কারণে (যেমন বোবা হওয়া) কথা বলা সম্ভব না হয়। এখানে পাত্র-পাত্রী উভয়ই সুস্থ ও সক্ষম থাকায় মুখে কবুল না বলায় বিবাহটি অসম্পূর্ণ রয়েছে।
বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও দলিল
১. বিবাহের শর্তাবলি (হানাফি ফিকহ)
হানাফি মাজহাব অনুসারে বিবাহের বৈধতার জন্য নিম্নলিখিত শর্তগুলো পূরণ হওয়া জরুরি:
- ইজাব ও কবুল: আরবি ভাষায় অতীত কালের শব্দে (যেমন: "বিয়ের করলাম", "কবুল করলাম") উচ্চারণ করতে হবে। দুই ব্যক্তি (স্বামী ও স্ত্রী বা তাদের প্রতিনিধি) একই মজলিসে এগুলো বলবেন।
- সাক্ষী: দুইজন পুরুষ অথবা একজন পুরুষ ও দুইজন নারী সাক্ষীর উপস্থিতি আবশ্যক।
- ইজাব ও কবুলের মাঝে ব্যবধান না হওয়া: একই মজলিসে ধারাবাহিকভাবে সম্পন্ন হতে হবে।
উল্লেখ্য: মুখে 'কবুল' না বলে শুধু সাইন করলে বিবাহ সহীহ হয় না। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেছেন, "বাকশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তির জন্য ইশারা বা লিখিত মাধ্যম যথেষ্ট নয়; তাকে অবশ্যই কথায় কবুল বলতে হবে।" (আল-হিদায়া, বাবুন নিকাহ)
২. সাইনের মাধ্যমে কবুলের বিধান
সাইন বা স্বাক্ষর একটি ইঙ্গিত। হানাফি ফিকহে ইঙ্গিত (ইশারা) কেবল সেই ব্যক্তির জন্য গ্রহণযোগ্য যে কথা বলতে অক্ষম (যেমন: বোবা বা গুরুতর অসুস্থ)। সাধারণ সুস্থ ব্যক্তির ক্ষেত্রে এটি যথেষ্ট নয়। যেমন ফতোয়া উসমানী-তে এসেছে:
"নিকাহের ইজাব ও কবুল মুখে উচ্চারণ করতে হবে। শুধু লিখিত দলিল বা সাইন করলে নিকাহ সহীহ হবে না, যদি না উক্ত ব্যক্তি বোবা হয়।" (ফতোয়া উসমানী, ২/১২)
৩. এ বিবাহের বর্তমান অবস্থা
যেহেতু মুখে 'কবুল' বলা হয়নি, তাই পাত্র-পাত্রী স্বামী-স্ত্রী হিসেবে হালাল হননি। তারা এখনও নন-মাহরাম। তাই:
- দেখা করা: জায়েয নয়। একে অপরের সাথে দেখা করা, কথা বলা বা চলাফেরা করা কোনোভাবেই বৈধ নয়।
- ঘুরতে যাওয়া: জায়েয নয়।
- সঙ্গম: যদি কখনো হয়ে থাকে, তাহলে এটি জিনা (ব্যভিচার) হিসেবে গণ্য হবে এবং তওবা করতে হবে।
করণীয়
-
পুনরায় নিকাহ সম্পন্ন করুন:
- একজন কাজি বা আলিমের উপস্থিতিতে পাত্র ও পাত্রীর অভিভাবকের সম্মতিতে মুখে ইজাব-কবুল বলুন।
- নিম্নরূপ বলুন: কাজি বলবেন, "আমি আপনাকে অমুক মেয়ের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করলাম।" পাত্র বলবেন, "কবুল করলাম।" (আরবি: قَبِلْتُ النِّكَاحَ বা বাংলায় "কবুল করলাম")।
- দুজন মাহরাম বা ধর্মভীরু পুরুষ সাক্ষী রাখুন।
-
বিবাহ নিবন্ধন: সরকারি নিবন্ধনের জন্য কাজির মাধ্যমে নিকাহনামা সই করালেও তা ধর্মীয় বিধানের বিকল্প নয়।
-
বর্তমান অবস্থায় নিষেধাজ্ঞা: যতক্ষণ পর্যন্ত পুনরায় সঠিক নিকাহ না হচ্ছে, ততক্ষণ পাত্র-পাত্রী সম্পূর্ণ পৃথক থাকবেন। দেখা-সাক্ষাৎ বা যোগাযোগ করবেন না।
গুরুত্বপূর্ণ ফতোয়া
- ফতোয়া উসমানী: "শুধু সাইন করে নিকাহ সম্পন্ন হয় না, যতক্ষণ না মুখে কবুল বলা হয়।" (২/১২)
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): "ইজাব-কবুলের মৌখিক উচ্চারণ নিকাহের রুকন। ইঙ্গিত বা লেখা দিয়ে তা সম্পন্ন হয় না।" (৩/৯)
- আল-হিদায়া: "নিকাহের জন্য ইজাব ও কবুলের কথা বলা আবশ্যক; ইচ্ছা প্রকাশ্য মনে করা যথেষ্ট নয়।" (২/২৯৬)
উপসংহার
সুতরাং প্রশ্নে বর্ণিত বিবাহটি সম্পন্ন হয়নি। পাত্র-পাত্রী এখনও বেগানা (নন-মাহরাম)। তারা একে অপরকে দেখতে বা ঘুরতে যেতে পারবে না। অবিলম্বে পুনরায় সঠিক নিয়মে নিকাহ সম্পন্ন করুন। আল্লাহ তাওফিক দিন।