মা ও মেয়ের যৌথ টাকা মাছ বিক্রেতাকে দিয়ে প্রতি সপ্তাহে মাছ নেওয়া কি সুদ?
Business and Job · Hanafi
Question
এর বিনিময়ে সে প্রতি সপ্তাহে মাছ দেয়। যতদিন এই টাকাটা তার কাছে থাকবে সে এভাবে মাছ দিবে।
মা বেঁচে আছে। মেয়ে মৃত।
এই বিষয়টার মাসআলা কি হবে?
যদি এই মাছ দেওয়ার বিষয়টা সুদ হয় তাহলে মেয়ের কবরেও কি এর জন্য আযাব হবে?
Answer
উত্তর
প্রশ্নে উল্লেখিত ছুরতে উক্ত টাকা যদি ঋণের ভিত্তিতে নয়,বরং মুদারাবার ভিত্তিতে দেয়া হয়, যে সেই টাকা হতে উক্ত মাছ বিক্রেতা ব্যবসা করবে, তার শ্রম আর মা মেয়ের মূলধন।
সেই ব্যবসা হতে নির্দিষ্ট পরিমাণ লভ্যাংশ শতকরা হারে মা এবং মেয়েকে (লভ্যাংশ) দিবে, এক্ষেত্রে সেই ব্যবসায় লোকসান হলে মা এবং মেয়েও সেই লোকজনের শরীক থাকবে, শরীয়তের নীতিমালা অনুসারে এটি যদি মুদারাবা চুক্তি হয়, অথবা শরীকি ব্যবসার চুক্তি হয়,যাতে লাভ ও লোকসানে উভয় পক্ষ নির্দিষ্ট আকারে শতকরা হারে শরীক থাকবে,সেক্ষেত্রে এই লভ্যাংশ নেয়া বৈধ।
★আর যদি সেই টাকা ঋণ বাবদ দেয়া হয়,সেক্ষেত্রে এই লেনদেনটি সুদ (রিবা) হিসেবে গণ্য হবে এবং তা হারাম। ইসলামী শরীয়তে ঋণের বিনিময়ে কোনো অতিরিক্ত সুবিধা গ্রহণ করাকে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এখানে মা ও মৃত মেয়ের যৌথ টাকা মাছ বিক্রেতাকে দেওয়া হয়েছে এবং শর্তারোপ করা হয়েছে যে, যতদিন টাকাটি তার কাছে থাকবে ততদিন তিনি প্রতি সপ্তাহে নির্দিষ্ট পরিমাণ মাছ দেবেন। এটি একটি সুদের লেনদেন, কারণ মূল টাকা অপরিবর্তিত থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত মাছ দেওয়া হচ্ছে।
কুরআন ও হাদিসের আলোকে সুদের বিধান:
১. কুরআন: আল্লাহ তাআলা বলেন:
"যারা সুদ খায়, তারা কিয়ামতে দাঁড়াবে না, যেভাবে দাঁড়ায় ঐ ব্যক্তি যাকে শয়তান স্পর্শ করে পাগল করে দিয়েছে। এটা এ কারণে যে, তারা বলে, ‘বেচাকেনা তো সুদের মতোই।’ অথচ আল্লাহ বেচাকেনাকে হালাল এবং সুদকে হারাম করেছেন।" (সূরা আল-বাকারা, ২:২৭৫)
২. হাদিস: জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"সুদ খাওয়া, সুদ খাওয়ানো, সুদের লেখক ও সাক্ষী—সবার উপর আল্লাহর অভিশাপ।" (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৯৮)
হানাফি ফিকহের দলিল:
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, ঋণের সাথে কোনো প্রকার অতিরিক্ত শর্ত যুক্ত করা সুদ। (রদ্দুল মুহতার, ৫/১৬১)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়াতে বলা হয়েছে: "ঋণের বিনিময়ে কোনো লাভ বা উপকার গ্রহণ করা জায়েজ নয়।" (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৩/২২০)
- ইমদাদুল ফাতাওয়ায় মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) লিখেছেন: "টাকা দিয়ে নিয়মিত মাছ বা অন্য কিছু নেওয়া সুদের শামিল।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৩০)
মৃত মেয়ের জন্য আযাবের বিষয়: মেয়েটি মৃত। সে যদি জীবিত থাকাকালীন এই লেনদেনের অনুমতি দিয়ে থাকে অথবা তার অংশের টাকা থেকে এই সুদের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে, তাহলে সে এর জন্য দায়ী হবে এবং কবরে আযাব হতে পারে। তবে যদি সে অজ্ঞতা বশত বা জোরপূর্বক এতে জড়িত থাকে, তাহলে আল্লাহর দরবারে তার হিসাব ভিন্ন হতে পারে।
কিন্তু মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে সদ্যজীবী উত্তরাধিকারীরা যদি এই সুদের লেনদেন বন্ধ করে দেয় এবং তওবা করে, তাহলে মৃতের উপর থেকেও পাপের বোঝা কমতে পারে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"যখন কোনো ব্যক্তি মারা যায়, তখন তার আমলের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি আমল বন্ধ হয় না: সদকায়ে জারিয়া, এমন ইলম যা দ্বারা উপকৃত হওয়া যায় এবং নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।" (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১৬৩১)
অর্থাৎ, জীবিতরা যদি মৃতের পক্ষ থেকে তওবা করে এবং সুদের অর্থ ফেরত দেয়, তাহলে আল্লাহ চাইলে মৃতের গুনাহ মাফ করতে পারেন।
মাসআলার সমাধান: ১. এই লেনদেন অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। ২. এখন থেকে প্রতি সপ্তাহে মাছ না নিয়ে শুধু মূল টাকা ফেরত নিতে হবে। ৩. ইতোমধ্যে নেওয়া মাছগুলোর হিসাব করে সেগুলোর মূল্য (বাজার মূল্য) মাছ বিক্রেতাকে ফেরত দিতে হবে অথবা তার কাছ থেকে টাকা ফেরত নেওয়ার সময় সমন্বয় করতে হবে। ৪. মৃত মেয়ের পক্ষ থেকে তওবা করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে এবং তার রূহের মাগফিরাতের জন্য দোয়া করতে হবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সুদ থেকে বাঁচার তাওফিক দিন। (আমিন)