স্কুলের পাঠ্যবইয়ের সুদ (ব্যাংক মুনাফা) সংক্রান্ত অংক ছাত্রদের শেখানো জায়েজ কি না?
Business and Job · Hanafi
Question
স্কুল এর পাঠ্য বই এ থাকা ব্যাংক মুনাফা এ ধরনের ম্যাথ থাকে তা স্টুডেন্টদের শেখানো যাবে কীনা?
# উক্ত চ্যাপ্টার থেকে পরীক্ষায় অনেক সময় প্রশ্ন দিয়ে থাকে।
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নকারী বলেছেন, স্কুলের পাঠ্যবইয়ে ব্যাংক মুনাফা (সুদ) সংক্রান্ত অঙ্ক বা গাণিতিক সমস্যা থাকে, যা শিক্ষার্থীদের শেখানো হয় এবং পরীক্ষায় এসব থেকে প্রশ্ন আসে। এক্ষেত্রে শিক্ষকদের করণীয় কী?
হানাফি ফিকহের আলোকে উত্তর:
সুদ (রিবা) ইসলামে স্পষ্টভাবে হারাম। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা অবশিষ্ট আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা মুমিন হও।” (সূরা আল-বাকারা, ২:২৭৮)
এছাড়া হাদিসে সুদ গ্রহণ, প্রদান, লেখা ও সাক্ষী থাকা সকলকেই অভিশপ্ত বলা হয়েছে। (সহিহ মুসলিম, ১৫৯৮)
এখন প্রশ্ন হলো, এমন পাঠ্যবইয়ের অধ্যায় যেখানে সুদের গাণিতিক হিসাব শেখানো হয়, তা কি শিক্ষার্থীদের শেখানো জায়েজ?
হানাফি ফুকাহায়ে কেরামের নীতিমালা:
১. শুধুমাত্র গাণিতিক দক্ষতা শেখানো – যদি শিক্ষক শুধু গাণিতিক পদ্ধতি (যেমন শতকরা হিসাব, সুদ-আসল নির্ণয়) শেখান এবং একে হারাম বলে স্পষ্টভাবে উল্লেখ না করেন, তবে তা জায়েজ নয়। কারণ এতে শিক্ষার্থীরা সুদকে স্বাভাবিক ও বৈধ মনে করতে পারে। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) লিখেছেন, “সুদ সংক্রান্ত লেনদেনের পদ্ধতি শেখানোও হারাম, যদি তা শিক্ষার্থীকে সুদের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে।” (রদ্দুল মুহতার, ৫:২৬৬)
২. পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা – অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবই অনুযায়ী পরীক্ষা দিতে হয় এবং এ থেকে প্রশ্ন আসে। এমন পরিস্থিতিতে হানাফি ফকিহগণ বলেন:
“যদি কোনো ছাত্রের জন্য পরীক্ষায় পাস করা বা ডিগ্রি অর্জন করা ফরজ কিংবা অত্যাবশ্যকীয় (যেমন চাকরি বা জীবিকার জন্য) হয়, তবে সে শুধু পাস করার মতো ন্যূনতম পরিমাণ শিখতে পারে, কিন্তু তা হারামকে বৈধ মনে করে নয়, বরং বাধ্য হয়ে।” (ফাতাওয়া উসমানি, ২:৪৫০; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪:২৫০)
৩. শিক্ষকের কর্তব্য – যদি শিক্ষককে এ ধরনের অধ্যায় পড়াতেই হয়, তবে তিনি প্রথমে সুদের ইসলামি বিধান স্পষ্ট করে বলে দেবেন যে এটি হারাম এবং বাস্তব জীবনে কখনোই প্রয়োগ করা যাবে না। শুধু পরীক্ষার জন্য গাণিতিক হিসাব শেখানো হচ্ছে, এটা হারামকে বৈধ করা নয়। এভাবে শিক্ষক দায়িত্ব পালন করতে পারেন। (আল-হিদায়া, ৩:২০৪; ফাতাওয়া আলমগিরি, ২:২৭৬)
মুফতি তাকি উসমানি দামাত বরকাতুহুম বলেন:
“যদি কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সুদের হিসাব শেখানো বাধ্যতামূলক হয়, তবে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের জন্য এরূপ শেখানো জায়েজ, তবে শর্ত হলো তারা নিজেরা সুদী লেনদেন করবে না এবং অন্যদেরও নিষেধ করবে। পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রায় শেখা, কিন্তু তা মনে প্রাণে গ্রহণ করা নয়।” (ফাতাওয়া উসমানি, ২:৪৫২)
সারসংক্ষেপ ও পরামর্শ:
- শিক্ষকের জন্য: তিনি যদি এই অধ্যায় পড়ান, তবে অবশ্যই পাঠ শুরুর আগে ছাত্রদের বুঝিয়ে দেবেন যে সুদ হারাম, শুধু পরীক্ষার জন্য গাণিতিক পদ্ধতি শেখানো হচ্ছে। সুদকে বৈধ মনে করা যাবে না।
- ছাত্রদের জন্য: তারা শুধু পরীক্ষায় পাস করার জন্য প্রয়োজনীয় অঙ্কগুলো রপ্ত করবে, কিন্তু বাস্তব জীবনে কখনো সুদী লেনদেন করবে না।
- পরিবর্তনের চেষ্টা: অভিভাবক ও শিক্ষকরা যদি সম্মিলিতভাবে পাঠ্যবইয়ে সুদ সংক্রান্ত বিষয়টি পরিবর্তনের জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেন, তবে তা ভালো। কিন্তু যতক্ষণ না পরিবর্তন হচ্ছে, ততক্ষণ বাধ্যতামূলক অবস্থায় উপরের নিয়ম মেনে পড়ানো ও শেখা জায়েজ হবে।
কিতাবের রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার (৫:২৬৬)
- ফাতাওয়া উসমানি (২:৪৫০-৪৫২)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪:২৫০)
- আল-হিদায়া (৩:২০৪)
- ফাতাওয়া আলমগিরি (২:২৭৬)
والله أعلم بالصواب