একাধিক স্ত্রীর মধ্যে সমতা করতে না পারলে কোন স্ত্রীকে তালাক দিবে?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 1831
Questioner: Nipa
Question Asked: 20 Jun 2026, 09:56 AM
Reviewed & Published: 20 Jun 2026, 10:06 AM
Views: 60
Tokens: 5,054
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম, কেউ যদি একাধিক বিয়ে করে কিন্তু তাদের মধ্যে সে ইনসাফ করতে না পারে তাহলে সে কোন স্ত্রীকে তালাক দিবে? আর যদি সে কাউকে তালাক না দেয় তাহলেও তো তার গুনাহ হবে ইনসাফ করতে না পারার কারণে। বর্তমানে অনেকে বলে ২য় স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার জন্য। কিন্তু দুজনেই তো সমান তাহলে কেন শুধু ২য় স্ত্রীকেই তালাক দিতে হবে?একজন পুরুষ এক্ষেত্রে কী করবে?

Answer

একাধিক স্ত্রীর মধ্যে সমতা (ইনসাফ) করতে না পারলে করণীয়

উত্তর

وعلیکم السلام و رحمة الله و برکاته

প্রশ্নের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবিক। আসুন আমরা কুরআন, হাদিস এবং হানাফি ফিকহের আলোকে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করি।

কুরআনের নির্দেশনা

আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন:

وَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تُقْسِطُوا فِي الْيَتَامَىٰ فَانْكِحُوا مَا طَابَ لَكُمْ مِنَ النِّسَاءِ مَثْنَىٰ وَثُلَاثَ وَرُبَاعَ ۖ فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تَعْدِلُوا فَوَاحِدَةً

"আর যদি তোমরা আশঙ্কা কর যে, ইয়াতীমদের প্রতি ন্যায়বিচার করতে পারবে না, তবে নারীদের মধ্যে থেকে যাকে তোমাদের ভালো লাগে, দুই, তিন বা চারটি বিয়ে করো। কিন্তু যদি তোমরা আশঙ্কা কর যে, তাদের মধ্যে সমতা বজায় রাখতে পারবে না, তবে একটিই (বিয়ে করো)।" (সূরা আন-নিসা, ৪:৩)

আরও বলা হয়েছে:

وَلَنْ تَسْتَطِيعُوا أَنْ تَعْدِلُوا بَيْنَ النِّسَاءِ وَلَوْ حَرَصْتُمْ ۖ فَلَا تَمِيلُوا كُلَّ الْمَيْلِ فَتَذَرُوهَا كَالْمُعَلَّقَةِ

"আর তোমরা স্ত্রীদের মধ্যে সমতা বজায় রাখতে কখনো পারবে না, যদিও তোমরা তার জন্য আগ্রহী হও। তবে তোমরা সম্পূর্ণরূপে একদিকে ঝুঁকে পড়ো না, যাতে অপরকে ঝুলন্ত অবস্থায় রেখে দাও।" (সূরা আন-নিসা, ৪:১২৯)

দ্বিতীয় স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার ধারণা: প্রচলিত ভুল ধারণা

আপনি ঠিকই বলেছেন, বর্তমানে অনেকেই মনে করেন সমস্যা হলে শুধু দ্বিতীয় স্ত্রীকে তালাক দিতে হবে। কিন্তু এটি কোনো ইসলামী নির্দেশ নয়। কুরআন বা হাদিসে কোথাও বলা নেই যে, সমস্যা হলে শুধুমাত্র দ্বিতীয় স্ত্রীকে তালাক দিতে হবে। এটি একটি ভুল ধারণা মাত্র।

হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি:

ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) ও অন্যান্য হানাফি ফুকাহাদের মতানুসারে, একাধিক স্ত্রীর মধ্যে ইনসাফ করতে না পারা তালাকের বাধ্যতামূলক কারণ নয়। তবে এটি একটি গুনাহের কাজ। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৫২০; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৪০)

কোন স্ত্রীকে তালাক দিতে হবে?

ইসলামে একাধিক স্ত্রীর মধ্যে ইনসাফ করতে না পারলে কোন নির্দিষ্ট স্ত্রীকে তালাক দিতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। স্বামী তার ইচ্ছানুযায়ী যেকোনো স্ত্রীকে তালাক দিতে পারেন। তবে কিছু বিবেচনা থাকতে পারে:

১. যে স্ত্রী তালাক চায়: যদি কোনো স্ত্রী তালাক চান এবং স্বামী তা দিতে রাজি হন, তাহলে তাকে তালাক দেওয়া যেতে পারে। ২. যে স্ত্রীর প্রতি বেশি অবিচার হচ্ছে: যদি কোনো স্ত্রীর প্রতি বেশি অবিচার হচ্ছে, তাহলে তাকে তালাক দেওয়া উত্তম হতে পারে। ৩. যে স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা কঠিন: যদি কোনো স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়, তাহলে তাকেই তালাক দেওয়া উচিত।

ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ)-এর মত: তাঁদের মতে, স্ত্রীদের মধ্যে ইনসাফ করতে না পারলে স্বামীকে তালাক দিতে বাধ্য করা যাবে না, তবে স্ত্রীদের আদালতে যাওয়ার অধিকার আছে। (আল-হিদায়া, ২/২২৫)

তালাক না দিলে গুনাহ হবে কি?

হ্যাঁ, যদি কোনো পুরুষ একাধিক স্ত্রী রাখেন এবং তাদের মধ্যে ন্যায়বিচার (ইনসাফ) না করেন, তাহলে এটি গুনাহ। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:

مَنْ كَانَتْ لَهُ امْرَأَتَانِ فَمَالَ إِلَى إِحْدَاهُمَا جَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَشِقُّهُ مَائِلٌ

"যার দুটি স্ত্রী আছে এবং সে তাদের মধ্যে একজনের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ে, তাহলে কিয়ামতের দিন সে এমন অবস্থায় আসবে যে, তার এক দিক ঝুঁকে থাকবে।" (আবু দাউদ, ২১৩৩; তিরমিজি, ১১৪১)

তবে, তালাক না দিলেই যে গুনাহ হবে, তা নয়। বরং তিনি ইনসাফের চেষ্টা চালিয়ে যেতে পারেন এবং এর জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে পারেন। ইনসাফ করতে না পারার কারণে তালাক দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। (ফাতাওয়া উসমানি, ৩/৪৫০-৪৫২)

কী করবেন?

একজন পুরুষের করণীয়:

১. ইনসাফের চেষ্টা করা: আল্লাহর ভয়ে এবং রাসূল (সাঃ)-এর নির্দেশনা অনুযায়ী স্ত্রীদের মধ্যে সমতা বজায় রাখার চেষ্টা করতে থাকুন। ইনসাফ শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং সময়, ভালোবাসা, মনোযোগ ইত্যাদি ক্ষেত্রেও।

২. ক্ষমা প্রার্থনা করা: যদি ইনসাফ করতে ব্যর্থ হন, তাহলে আল্লাহর কাছে তওবা ও ইস্তিগফার করুন।

৩. পরামর্শ নেওয়া: কোনো আলেম বা ইসলামী পণ্ডিতের সাথে পরামর্শ করুন।

৪. তালাকের প্রয়োজনীয়তা পর্যালোচনা: যদি ইনসাফ করা সত্যিই অসম্ভব হয় এবং সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা কষ্টকর হয়, তাহলে তালাক দেওয়ার কথা চিন্তা করতে পারেন। তবে তালাক সর্বশেষ সমাধান। (ফাতাওয়া শামী, ৩/৫৬০)

৫. দ্বিতীয় স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার প্রশ্নে: শুধু দ্বিতীয় স্ত্রী বলেই তাকে তালাক দেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। উভয় স্ত্রীই সমান। বরং যার সাথে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা বেশি কঠিন, তাকেই তালাক দেওয়া বিবেকবান সিদ্ধান্ত হবে।

সারসংক্ষেপ

  • একাধিক স্ত্রীর মধ্যে ইনসাফ করতে না পারা গুনাহের কাজ।
  • কিন্তু এর কারণে কোনো নির্দিষ্ট স্ত্রীকে তালাক দিতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
  • শুধু দ্বিতীয় স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।
  • স্বামী তার ইচ্ছানুযায়ী যেকোনো স্ত্রীকে তালাক দিতে পারেন বা সবাইকে রেখে ইনসাফের চেষ্টা চালিয়ে যেতে পারেন।
  • তালাক না দিলে গুনাহ হবে, কিন্তু ইনসাফ না করলে গুনাহ হবে; তাই ইনসাফের চেষ্টা করতে থাকুন।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দিন। আমিন।


রেফারেন্স:

  • কুরআন মাজিদ: সূরা আন-নিসা (৪:৩), (৪:১২৯)
  • সুনান আবু দাউদ: ২১৩৩
  • সুনান তিরমিজি: ১১৪১
  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন): ৩/৫২০
  • ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগিরি): ১/৩৪০
  • আল-হিদায়া (মারগিনানি): ২/২২৫
  • ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি): ৩/৪৫০-৪৫২
  • বেহেশতি জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী)

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.