বিয়ের আগে পাত্রকে কী কী প্রশ্ন করা উচিত?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
ওয়ালাইকুমুসসালাম ওয়ারাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহু। উত্তর: বিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্র বন্ধন। ইসলামে পাত্র-পাত্রীর মধ্যে বৈধ সীমারেখার মধ্যে থেকে পরস্পরকে দেখার ও জানার অনুমতি রয়েছে। তবে তা সম্পূর্ণরূপে পর্দা ও শরিয়তের নিয়ম মেনে হতে হবে। হযরত উমর (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "তোমাদের কেউ যখন কোনো নারীকে বিয়ে করতে ইচ্ছা করে, তখন সে যদি তার দিকে তাকাতে পারে (যা তাকে বিয়ে করতে উৎসাহিত করবে), তাহলে যেন তা করে।" (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৮৬৫; মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা- ১৬৩৭৩)
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, পাত্রীর সাথে দেখা করার সময় তার চেহারা ও হাতের পাতা দেখা জায়েজ, এবং একান্ত প্রয়োজন থাকলে মাহরামের উপস্থিতিতে সীমিত পরিসরে কথা বলা যায়। তবে গোপন সাক্ষাৎ, অযাচিত কথাবার্তা বা খোলামেলা মেলামেশা সম্পূর্ণ হারাম।
প্রশ্ন করার মূলনীতি
বিয়ের প্রস্তাব আসার পর পাত্র বা পাত্রীকে যেমন সাধারণভাবে দেখা যায়, তেমনি কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা জরুরি। তবে মনে রাখবেন, কেবল কথার ওপর নির্ভর না করে, পাত্রের পারিবারিক পরিচিতি ও সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে জেনে নেওয়াও জরুরি। নিম্নে প্রশ্নগুলোর একটি তালিকা দেওয়া হলো:
যে প্রশ্নগুলো করা উচিত:
আলোচনার সময় শরিয়তের সীমার মধ্যে থেকে (মাহরামের উপস্থিতিতে বা পর্দার আড়ালে থেকে) এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে:
- পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের ব্যাপারে: নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে কিনা। এটি দ্বীনদারির একটি মৌলিক মাপকাঠি।
- মৌলিক ইসলামি জ্ঞান ও আমল: রোজা, জাকাত, হজ (সামর্থ্য থাকলে) সম্পর্কে জ্ঞান ও আমল সম্পর্কে ধারণা নেওয়া।
- হালাল-হারাম সম্পর্কে সচেতনতা: জীবিকা অর্জনের পথে হালাল-হারাম কতটা মান্য করে। সুদ, ঘুষ, প্রতারণা ইত্যাদি থেকে দূরে থাকে কিনা।
- চরিত্র ও ব্যবহার: মানুষের সাথে, বিশেষ করে পরিবারের সদস্যদের সাথে কেমন ব্যবহার। রাগ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা কেমন। সত্যবাদিতা ও আমানতদারি কেমন।
- বিয়ের পরের জীবনযাপন সম্পর্কে ধারণা: কোথায় থাকার ইচ্ছা (একক পরিবার নাকি যৌথ পরিবার)। স্ত্রীর কাজ ও বাইরে যাওয়ার ব্যাপারে তার মতামত কী।
- আচার-অনুষ্ঠান সম্পর্কে ধারণা: বিদআত বা কুসংস্কারমূলক কোনো কাজে বিশ্বাসী কিনা।
- শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশা: কী পড়াশোনা করেছে এবং কী পেশায় নিয়োজিত বা ভবিষ্যতে কী করতে চায়।
- ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: সন্তান লালন-পালন ও তাদের শিক্ষা-দীক্ষা নিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি কী।
যে প্রশ্নগুলো না করলেই নয়:
নিম্নের বিষয়গুলো জানা বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ:
- নিয়মিত নামাজ পড়ে কিনা - এটি দ্বীনের মূল স্তম্ভ।
- মদ, জুয়া বা অন্য কোনো নেশা করে কিনা - এগুলো কবিরা গুনাহ ও ধ্বংসের কারণ।
- সুদের লেনদেন করে কিনা - এটি আল্লাহ ও রাসূলের সাথে যুদ্ধ ঘোষণার নামান্তর।
- সত্যবাদী ও আমানতদার কিনা - মিথ্যা ও খিয়ানত বড় গুনাহ এবং সংসার ধ্বংসের কারণ।
- স্ত্রী ও সন্তানদের সাথে কেমন আচরণ করবে তা বোঝার জন্য পরিবারের সাথে তার ব্যবহার সম্পর্কে জেনে নিন।
- বিয়ের পর নিজের স্ত্রীর উপর স্বামীর অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে তার ধারণা। স্ত্রীর প্রতি ন্যায়বিচার ও সদ্ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি দেয় কিনা।
বিয়ের আগে বৈধ দেখা-সাক্ষাতের নিয়ম:
- পর্দা মেনে দেখা: শুধুমাত্র চেহারা ও হাতের পাতা দেখা জায়েজ, এবং তা একবার অথবা প্রয়োজনে দুইবার।
- মাহরামের উপস্থিতি: পাত্রীর সাথে দেখা বা কথা বলার সময় তার কোনো মাহরাম পুরুষ অবশ্যই সাথে থাকবেন। একান্তে দেখা বা কথা বলা হারাম।
- কথা বলা: প্রয়োজনীয় বিষয়ে এবং শরিয়তের সীমার মধ্যে কথা বলা যাবে। কোনোরূপ গায়রাহ (অপ্রয়োজনীয়) কথা বা আবেগপ্রবণ আলোচনা উচিত নয়।
পাত্রী নির্বাচনে ইসলামের নির্দেশনা
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "নারীকে চারটি বিষয়ের জন্য বিয়ে করা হয়: তার সম্পদ, তার বংশমর্যাদা, তার সৌন্দর্য এবং তার দ্বীন। তুমি দ্বীনদার নারীকে অগ্রাধিকার দাও, তবেই তুমি সফল হবে।" (সহিহ বুখারি: ৫০৯০; সহিহ মুসলিম: ১৪৬৬)
এই হাদিস নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই প্রযোজ্য। অর্থাৎ পাত্র বা পাত্রী নির্বাচনের সময় দ্বীনদারি (ধার্মিকতা ও আমল) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হওয়া উচিত। বিশ্বস্ত উৎস থেকে তার দ্বীনদারি, চরিত্র ও আমল সম্পর্কে জেনে নেওয়ার চেষ্টা করুন।
একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
বিয়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। তাই অনেক প্রশ্ন করা বা শুধু কথায় বিভ্রান্ত না হয়ে, তার সম্পর্কে স্থানীয় ধার্মিক ও বিশ্বস্ত লোকজনের কাছ থেকে খোঁজখবর নেওয়াও জরুরি। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের জন্য কল্যাণ কামনা করে, সে (নিজের বা তার আত্মীয়ের জন্য পাত্র/পাত্রী দেখার সময়) যেন খোঁজখবর নেয়।" (সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৮৬৪)
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে দ্বীনদার ও সৎ জীবনসঙ্গী লাভ করার তাওফিক দান করুন এবং আমাদের বিয়েকে বরকতময় করুন। (আমিন)
রেফারেন্স:
- কোরআন: সূরা আন-নূর (২৪:৩০-৩১) - দৃষ্টি নিচু রাখা ও পর্দার নির্দেশ।
- হাদিস: সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, সুনানে ইবনে মাজাহ, মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা।
- হানাফি ফিকহের কিতাব:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): জামানতের অধ্যায়ে বিবাহ দেখা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা আছে।
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরি): বিবাহের অধ্যায়ে দেখা-সাক্ষাতের নিয়মাবলি।
- বাহেশ্তি জেওয়ার (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী): বিবাহ ও দাম্পত্য জীবন সম্পর্কে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা।
- মারিফুল কোরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি): সূরা নূরের তাফসীরে পর্দা ও নজর নিচু রাখার গুরুত্ব বর্ণিত হয়েছে।
SEO তথ্য
- মেটা বর্ণনা: