হারাম সম্পর্ক থেকে কিভাবে বেড়িয়ে আসতে পারি?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 150
Questioner: Feather
Question Asked: 16 May 2026, 07:19 PM
Reviewed & Published: 16 May 2026, 08:43 PM
Views: 33
Tokens: 4,168
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম।
আমার একটা দ্বীনদার ছেলের সাথে পরিচয় হয় অনেকদিন আগে। সে সুন্নাহ মেনে চলে, আলেমের সহবত আছে, উম্মাহর প্রতি দরদ অনেক।। আমি তার দ্বীনদারিতায় মুগ্ধ হই। তাকে বিয়ের জন্য পছন্দ করে বাসায় বলি। কিন্তু ছেলের বাবা মা আরোও ৩-৪ বছর পর বিয়ে দিতে চায়। ছেলেটা বলেছিল বাসায় ঝামেলা করলেও সে মানানোর চেষ্টা করবে। তবে ছেলেটার সাথে আমার মাঝখানে অনেক ঝামেলা হয়। সে এখন বলছে আল্লাহ আমাকে শাস্তিস্বরূপ তাকে আমার থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছেন। সে আমার জন্য নিয়ামত ছিল আমি কদর করিনি। আমি আমার ভুলের জন্য তার কাছে ক্ষমা চাই। সে বলেছে সে আমাকে ক্ষমা করেছে কিন্তু সে আমাকে আর আমার বাবা মা কে আল্লাহ হাশরের ময়দানে বিচার করবে এভাবে বেশ কিছু কথা বলে।

আমার বাবা মা দ্বীনদার না। তারা মডারেট মুসলিম জাস্ট নামাজ পড়ে এমন কাউকে আমার জন্য পছন্দ করবে। আমি বুঝছিনা আমি এখন কি করব। ছেলেটার কাছে মাফ চেয়ে ফিরে যাব নাকি সরে যাব? এমন কাউকে আমি কি আর পাব?

যদি তার থেকে সরে যাওয়া উত্তম হয় তবে আমি কিভাবে তাকে ভুলে যেতে পারি? আল্লাহ কি আমাকে ক্ষমা করবেন? উত্তম জীবনসঙ্গীর জন্য কি কি আমল করতে পারি? আমাকে সাহায্য করুন উস্তাদ।

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রথমেই জেনে রাখা জরুরি যে, ইসলামী শরীয়তে বিবাহপূর্ব কোনো প্রকার সম্পর্ক (যেমন: দেখা-সাক্ষাৎ, কথা বলা, প্রেম-ভালোবাসা) বিনা প্রয়োজনে হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَا ۖ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا
“আর তোমরা যিনার কাছেও যেও না। নিশ্চয় তা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট পথ।” (সূরা বনী ইসরাঈল ১৭:৩২)

বিবাহের আগে কোনো পুরুষ ও নারীর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখা জায়েয নয়, যদিও সেই সম্পর্ক ‘দ্বীনদার’ বা ‘সুন্নাহ মেনে চলা’ বলে মনে হয়। হাদীসে এসেছে:

لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا كَانَ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ
“কোনো পুরুষ কোনো নারীর সাথে একান্তে সাক্ষাৎ করবে না, কারণ তাদের তৃতীয়জন শয়তান হয়।” (তিরমিযী, হাদীস ২১৬৫)

আপনি যে সম্পর্কের বর্ণনা দিয়েছেন, তা শরীয়তের দৃষ্টিতে সঠিক ছিল না। তাই প্রথম কাজ হলো তওবা ও ইস্তিগফার করা। আল্লাহ তাআলা তওবা কবুল করেন। কুরআনে এসেছে:

قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا
“বলুন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের প্রতি অত্যাচার করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সব গুনাহ মাফ করেন।” (সূরা আয-যুমার ৩৯:৫৩)

ছেলেটির কথার বিশ্লেষণ

ছেলেটি বলেছে, “আল্লাহ আমাকে শাস্তিস্বরূপ তাকে আমার থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছেন” এবং “সে হাশরের ময়দানে আপনার ও আপনার বাবা-মায়ের বিচার করবে” – এ ধরনের কথা শরীয়তসম্মত নয়। বরং এটি অহংকার ও আত্মম্ভরিতার পরিচায়ক। ইসলামী আদর্শে কেউ নিজেকে কারো জন্য ‘শাস্তি’ বা ‘নিয়ামত’ বলে নির্ধারণ করতে পারে না। বরং সবকিছু আল্লাহর পক্ষ থেকে হয় এবং বান্দার উচিত আল্লাহর প্রতি ভালো ধারণা পোষণ করা। ইমাম ইবনু আবিদীন (রহ.) লিখেছেন:

الظَّاهِرُ أَنَّ مَنْ تَوَاضَعَ لِلَّهِ رَفَعَهُ اللَّهُ، وَمَنْ تَكَبَّرَ وَضَعَهُ اللَّهُ
“স্পষ্ট কথা: যে আল্লাহর জন্য বিনয়ী হয়, আল্লাহ তাকে সম্মানিত করেন; আর যে অহংকার করে, আল্লাহ তাকে নীচু করেন।” (রদ্দুল মুহতার, ১/৬২৩)

তাই এই কথাগুলো আপনাকে ভীত ও হতাশ করার জন্য ব্যবহার হয়েছে। একজন দ্বীনদার ব্যক্তির কথা ও কাজে এমন অহংকার ও ভয়ভীতি থাকা উচিত নয়। বরং তার উচিত আল্লাহর কাছে দোয়া করা এবং শান্তিপূর্ণভাবে সম্পর্ক থেকে সরে আসা।

এখন আপনার করণীয়

১. সম্পর্ক থেকে পুরোপুরি সরে আসা:
যেহেতু সম্পর্কটি শরীয়তের দৃষ্টিতে অবৈধ ছিল এবং ছেলেটির বাবা-মা বিয়েতে ৩-৪ বছর দেরি করতে চায়, আর ছেলেটিও নিজের অহংকারী আচরণ করছে, তাই আপনার জন্য সবচেয়ে উত্তম হলো সম্পর্ক ছিন্ন করা। আপনি আপনার ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন, তিনি ক্ষমা করেছেন; এখন আর পিছনে ফিরে যাওয়ার দরকার নেই। আল্লাহ তাআলা বলেন:

فَاصْبِرُوا أَوْ لَا تَصْبِرُوا سَوَاءٌ عَلَيْكُمْ
“তোমরা ধৈর্য ধরো বা না ধরো, তা তোমাদের জন্য সমান।” (সূরা আত-তুর ৫২:১৬)

তবে আপনি ধৈর্য ধরুন এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করুন।

২. তওবা ও ইস্তিগফার:
আপনার এই সম্পর্কের জন্য আন্তরিকভাবে তওবা করুন। নামাযের পর বেশি বেশি আস্তাগফিরুল্লাহ পড়ুন এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। তওবা কবুলের জন্য তিনটি শর্ত: (ক) গুনাহ ত্যাগ করা, (খ) অনুতপ্ত হওয়া, (গ) পুনরায় না করার দৃঢ় সংকল্প করা।

৩. পরিবারের সাথে সঠিক পদ্ধতিতে বিয়ের আলোচনা:
আপনার বাবা-মা মডারেট মুসলিম। তারা নামায পড়েন, কিন্তু দ্বীনের প্রতি বেশি সচেতন নন। তবে তাদের সাথে দ্বন্দ্ব না করে বরং ভদ্র ও বুদ্ধিমত্তার সাথে বিয়ের জন্য একজন ভালো দ্বীনদার পাত্রের কথা বলুন। আপনি নিজেও দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করুন, যাতে তাদের বোঝাতে পারেন। আল্লাহর কাছে দোয়া করুন যেন আপনার পিতা-মাতা দ্বীনের পথে সঠিক সিদ্ধান্ত নেন।

৪. ছেলেটিকে ভুলে যাওয়ার উপায়:

  • সম্পূর্ণ যোগাযোগ বন্ধ করুন: সব ধরনের ফোন, মেসেজ, সামাজিক মাধ্যম বন্ধ করে দিন।
  • নিজের আত্মশুদ্ধি ও ইবাদতে মনোযোগী হোন: পাঁচ ওয়াক্ত নামায, কুরআন তিলাওয়াত, যিকির-আযকার, নফল রোযা – এসব আপনার মনকে শান্ত করবে।
  • দোয়া করুন: আল্লাহর কাছে বলুন, “হে আল্লাহ! তুমিই ভালো জানো; আমাকে এই সম্পর্ক ভুলে যাওয়ার তাওফীক দাও এবং আমার জন্য উত্তম জীবনসঙ্গী দান করো।”
  • ইস্তিখারা পড়ুন: বিয়ের আগে ইস্তিখারা করা সুন্নত। ইমাম বুখারী (রহ.) হাদীস বর্ণনা করেন:

إِذَا هَمَّ أَحَدُكُمْ بِالْأَمْرِ فَلْيَرْكَعْ رَكْعَتَيْنِ مِنْ غَيْرِ الْفَرِيضَةِ ثُمَّ لِيَقُلِ اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْتَخِيرُكَ...
“তোমাদের কেউ যখন কোনো কাজের ইচ্ছা করে, সে যেন ফরয ছাড়া দু’রাকাত নামায পড়ে, তারপর এই দোয়া পড়ে...” (বুখারী, হাদীস ১১৬২)

৫. উত্তম জীবনসঙ্গীর জন্য আমল:

  • দুআ ইস্তিখারা নিয়মিত পড়ুন।
  • তাহাজ্জুদ নামায পড়ে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে ভালো স্বামীর জন্য দোয়া করুন।
  • সূরা ফুরকান (আয়াত ৭৪) পড়ুন:

رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
“হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের দ্বারা আমাদের চোখ শীতল করুন এবং আমাদের মুত্তাকীদের জন্য নমুনা বানিয়ে দিন।”

  • ছাদাকাহ ও রোজা রাখুন, বিশেষ করে সোম ও বৃহস্পতিবার।
  • নিজের দ্বীনদারী বাড়ান, যাতে আপনি নিজে উত্তম জীবনসঙ্গীর উপযুক্ত হতে পারেন। ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর শিক্ষা অনুযায়ী, নিজের সংশোধন ছাড়া সংশোধন লাভ হয় না। (উসুলুশ শাশী, ১/২৩)

উপসংহার

আপনার যদি সত্যিই দ্বীনদার স্বামীর জন্য আগ্রহ থাকে, তাহলে নিজে দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত হোন, তওবা করুন, পরিবারের সাথে শান্তিপূর্ণভাবে আলোচনা করুন এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করতে থাকুন। ছেলেটির আচরণ (বাবা-মার জন্য হাশরে বিচার করার কথা) ইসলামী শিক্ষার পরিপন্থী। তাই তাকে ভুলে যাওয়াই আপনার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও কল্যাণকর। আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ
“যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন এবং অকল্পনীয় উৎস থেকে তাকে রিজিক দান করেন।” (সূরা আত-তালাক ৬৫:২-৩)

ইন শা আল্লাহ আপনার জন্য একটি উত্তম দ্বীনদার জীবনসঙ্গী আসবে, যদি আপনি ধৈর্য ধারণ করেন এবং ইখলাসের সাথে আল্লাহর কাছে দোয়া করেন।
امید করি আল্লাহ আপনাকে ধৈর্য দান করবেন এবং আপনার জন্য উত্তম সিদ্ধান্ত সহজ করে দেবেন।

وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِالصَّوَابِ
وآخر دعوانا أن الحمد لله رب العالمين



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.