হারাম সম্পর্ক থেকে কিভাবে বেড়িয়ে আসতে পারি?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 148
Questioner: Feather
Question Asked: 16 May 2026, 07:18 PM
Reviewed & Published: 16 May 2026, 07:42 PM
Views: 71
Tokens: 3,188
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম।
আমার একটা দ্বীনদার ছেলের সাথে পরিচয় হয় অনেকদিন আগে। সে সুন্নাহ মেনে চলে, আলেমের সহবত আছে, উম্মাহর প্রতি দরদ অনেক।। আমি তার দ্বীনদারিতায় মুগ্ধ হই। তাকে বিয়ের জন্য পছন্দ করে বাসায় বলি। কিন্তু ছেলের বাবা মা আরোও ৩-৪ বছর পর বিয়ে দিতে চায়। ছেলেটা বলেছিল বাসায় ঝামেলা করলেও সে মানানোর চেষ্টা করবে। তবে ছেলেটার সাথে আমার মাঝখানে অনেক ঝামেলা হয়। সে এখন বলছে আল্লাহ আমাকে শাস্তিস্বরূপ তাকে আমার থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছেন। সে আমার জন্য নিয়ামত ছিল আমি কদর করিনি। আমি আমার ভুলের জন্য তার কাছে ক্ষমা চাই। সে বলেছে সে আমাকে ক্ষমা করেছে কিন্তু সে আমাকে আর আমার বাবা মা কে আল্লাহ হাশরের ময়দানে বিচার করবে এভাবে বেশ কিছু কথা বলে।

আমার বাবা মা দ্বীনদার না। তারা মডারেট মুসলিম জাস্ট নামাজ পড়ে এমন কাউকে আমার জন্য পছন্দ করবে। আমি বুঝছিনা আমি এখন কি করব। ছেলেটার কাছে মাফ চেয়ে ফিরে যাব নাকি সরে যাব? এমন কাউকে আমি কি আর পাব?

যদি তার থেকে সরে যাওয়া উত্তম হয় তবে আমি কিভাবে তাকে ভুলে যেতে পারি? আল্লাহ কি আমাকে ক্ষমা করবেন? উত্তম জীবনসঙ্গীর জন্য কি কি আমল করতে পারি? আমাকে সাহায্য করুন উস্তাদ।

Answer

উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রথমেই আপনাকে জানাতে চাই, ইসলাম পূর্ববর্তী নাজায়েজ সম্পর্কের জন্য তওবা করাকে উৎসাহিত করে এবং আল্লাহ তাআলা তওবা করলে ক্ষমা করে দেন। আপনি যদি সত্যিই অনুতপ্ত হন এবং ভবিষ্যতে দ্বীনের পথে চলতে চান, তবে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হওয়াই আপনার কর্তব্য।

১. বর্তমান সম্পর্কের শরয়ী অবস্থা

আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, আপনার সাথে ঐ ছেলের পরিচয় ও কথাবার্তা শরীয়তসম্মত পর্দা ও মাহরামের উপস্থিতি ছাড়া হয়েছে। ইসলাম বিবাহের আগে নন-মাহরাম নারী-পুরুষের একান্ত সাক্ষাৎ, ফোনালাপ, আবেগপূর্ণ সম্পর্ককে স্পষ্টভাবে হারাম বলেছে।

  • কুরআন: "তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেও না, নিশ্চয় এটি অশ্লীল কাজ এবং মন্দ পথ।" (সূরা বনী ইসরাঈল: ৩২)
  • হাদিস: "তোমাদের কেউ যেন কোনো নারীর সাথে একান্তে সাক্ষাৎ না করে, কারণ তৃতীয়জন থাকে শয়তান।" (তিরমিজি, হাদিস: ২১৬৫)

সুতরাং এই সম্পর্ক অবৈধ ছিল এবং এর জন্য আপনাকে উভয়কেই তওবা করতে হবে। ছেলেটির আচরণ—যেমন আপনাকে 'শাস্তি' ও 'হাশরের ময়দানে বিচার' বলার মাধ্যমে হুমকি দেওয়া—এটাও ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী। প্রকৃত দ্বীনদার ব্যক্তি অন্যের ভুল ক্ষমা করে এবং নিজেও তওবা করে। আল্লাহর পক্ষ থেকে কাউকে শাস্তি দেয়ার দায়িত্ব মানুষের নয়।

২. এখন আপনার করণীয়

আপনি যদি ছেলেটির কাছে ফিরে যেতে চান, তা আরও গুনাহের কারণ হবে। কারণ:

  • সম্পর্কটি হারাম পদ্ধতিতে গড়ে উঠেছে।
  • তার পরিবারের বিয়েতে এখনো ৩-৪ বছর বিলম্ব করার ইচ্ছা, যা আপনাকে আরও অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে রাখবে।
  • তিনি আপনাকে ক্ষমা করেছেন বলে দাবি করলেও হাশরের ময়দানে বিচারের হুমকি দেয়া তার ক্ষমার আন্তরিকতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করে।

তাই আপনার উচিত:

  • তওবা ও ইস্তিগফার: অতীতের জন্য অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, তাহাজ্জুদ, বেশি বেশি ইস্তিগফার পড়ুন।
  • সম্পর্ক ছিন্ন করুন: তার সাথে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করুন। তাকে চূড়ান্তভাবে বিদায় জানান এবং তাকে দাওয়াত দিন যে শরীয়তসম্মত পদ্ধতিতে (মাহরামের মাধ্যমে) যদি বিবাহের ইচ্ছা থাকে, তবে আপনার অভিভাবকের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। কিন্তু যেহেতু ঝামেলা ও দীর্ঘ বিলম্ব আছে, তাই এটিও সম্ভব নয় বলেই মনে হচ্ছে।
  • ভুলে যাওয়ার পদ্ধতি:
    • নিজেকে ব্যস্ত রাখুন দ্বীনি ইল্ম ও আমলে।
    • এমন দ্বীনি বান্ধবী তৈরি করুন যারা আপনাকে সঠিক পথে রাখবে।
    • বিয়ের জন্য পিতামাতার সাথে আলোচনা করুন এবং তাদের জানান যে আপনি দ্বীনদার জীবনসঙ্গী চান।

৩. আল্লাহর ক্ষমা ও ভালো জীবনসঙ্গী লাভের আমল

আল্লাহ কুরআনে বলেছেন: "নিশ্চয় আল্লাহ তওবাকারীদের এবং পবিত্রতা অবলম্বনকারীদের ভালোবাসেন।" (সূরা বাকারা: ২২২)

  • তওবার শর্ত:
    1. সঙ্গে সঙ্গে গুনাহ ছেড়ে দেওয়া।
    2. ভবিষ্যতে না করার দৃঢ় সংকল্প।
    3. অতীতের জন্য অনুতপ্ত হওয়া।

উত্তম জীবনসঙ্গীর জন্য আমল:

  • সালাতুল হাজত: ২ রাকাত নফল নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে জীবনসঙ্গীর জন্য দোয়া করুন।
  • দোয়া: "رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا" (সূরা ফুরকান: ৭৪)
  • সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত: প্রতিদিন রাতে পড়ুন।
  • ইস্তিগফার ও দরুদ শরীফ বেশি পড়ুন।

৪. পিতামাতার ভূমিকা

আপনার বাবা-মা 'মডারেট মুসলিম' হলেও তাদেরকে ফরজ নামাজের ব্যাপারে উৎসাহিত করুন এবং তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করে দ্বীনের সৌন্দর্য তুলে ধরুন। তাদেরকে জানান যে দ্বীনদার যুবক আপনার পছন্দ, কিন্তু ইসলামসম্মত পদ্ধতিতে। মা-বাবার মতামতের গুরুত্ব ইসলামে অপরিসীম, কিন্তু তারা যদি ফরজ নামাজ পড়া কাউকে পছন্দ করেন, তাতেও কোনো সমস্যা নেই—শুধু দীনের মাপকাঠি যেন থাকে।

৫. পরামর্শ

এখন আপনি তওবা করে নতুনভাবে জীবন শুরু করুন। এই ছেলেটির সাথে আর কোনো সম্পর্ক রাখবেন না, কারণ তা আপনার ইমান ও নৈতিকতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

  • ইমাম আবু হানিফার (রহ.) বাণী: "যে ব্যক্তি হারাম সম্পর্ক থেকে নিজেকে বাঁচায়, আল্লাহ তাকে হালাল সম্পর্কের মাধ্যমে ধন্য করেন।"
  • মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেন, "পাপের পরে তওবা ও ভালো কাজের মাধ্যমে আল্লাহর রহমত লাভ করা যায়।"

আপনার প্রশ্নের শেষে আপনি বলেছেন, "এমন কাউকে আমি কি আর পাব?"—আল্লাহর কাছে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। উত্তম তওবা ও আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন। আর দ্বীনদার হওয়ার জন্য নিজেকে তৈরি করুন, আপনি নিজে যত উত্তম হবেন, তত উত্তম জীবনসঙ্গী পাবেন, ইনশাআল্লাহ।

আল্লাহ আপনাকে তওবা কবুল করার ও উত্তম জীবনসঙ্গী দান করার তওফিক দিন।


উল্লেখিত কিতাব:

  • ফাতাওয়া উসমানী (১/২৫৬-২৬০)
  • রদ্দুল মুহতার (১/৪১৬-৪২২)
  • বেহেশতী জেওর (খন্ড ২, বিবাহ অধ্যায়)
  • মা’আরিফুল কুরআন (সূরা নূর, ২৪:৩১-৩২)

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.