নামাজে হাই উঠা, আল্লাহকে নিয়ে অকল্পণীয় চিন্তা, ওয়াসওয়াসা ইত্যাদি সম্পর্কে শরীয়তের বিধান জানতে চাই?
Faith and Belief · Hanafi
Question
হুজুর আমি রাতে এমনি নফল নামাজ পড়তেছিলাম। পড়ে আমার নামাজে হাই ঊঠছে, আমি মুখ হা করে হাই তুলতেছি নামাজেই। যখনই মুখ হা করলাম তখন ই আমার মনে মনে আল্লাহ কে নিয়ে বাজে কথা আসলো। আস্তাগফিরুল্লাহ। এখন আমার মনে হইতেছে মুখেই বলে ফেললাম কিনা। অনেক কষ্ট করে মন কে বুঝাইলাম মুখে কিছু বলি নাই।
তাও মন মানে না। পরে নামাজ শেষ করে আবার কয়েকবার মুখ হা করে জিহবা নাড়িয়ে বাজে কথা গুলা বলেছি মনে মনে। দেখতে সাউন্ড হয় কিনা। খেয়াল করলাম জাস্ট জিহবা নড়ে, অন্য কোনো সাউন্ড হয় নাই। এভাবে কয়েকবার ইসলাম নিয়ে বাজে কথা গুলা বললাম জিহবা নাড়ায়ে। শুধু চেক করার জন্য সাউন্ড হয় কিনা। আমার অনেক খারাপ লাগতেছে হুজুর।
১) এখন এগুলো কি বাজে কথা বলা ধরা হবে? বার বার চেক করার কারনে কি আমার ঈমানে কোনো সমস্যা হবে?
২) আমার ঈমান আর বিবাহিত জীবন কি ঠিক আছে?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় প্রশ্নকারী ভাই, আপনার মনে যে কষ্ট ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে, তা আমরা পুরোপুরি বুঝতে পারছি। প্রথমেই জেনে রাখুন— শয়তানের ধোঁকা ও ওয়াসওয়াসা (মনের খেয়াল) থেকে বাঁচার জন্য আপনি যতটুকু সচেতন, এটি আপনার ঈমানেরই প্রমাণ। নিচে আপনার প্রশ্নের উত্তর হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাবের আলোকে দেওয়া হলো।
১) নামাজে হাই তোলার সময় মনে মনে বাজে কথা আসা এবং পরে জিহবা নাড়িয়ে চেক করা
ক) নামাজে হাই তোলার সময় যে বাজে কথা মনে আসে
এটি সম্পূর্ণরূপে ওয়াসওয়াসা (শয়তানের প্ররোচনা) এবং অনিচ্ছাকৃত চিন্তা। যেহেতু আপনি তা মুখে উচ্চারণ করেননি, বরং শুধু মনে মনে এসেছে, তাই এতে নামাজ ভঙ্গ হয়নি এবং কোনো গুনাহ হয়নি। হাদিসে এসেছে, আল্লাহ তাআলা আমার উম্মতের মনে মনে যা কিছু খেয়াল আসে, তা ক্ষমা করে দেন, যতক্ষণ না তা বলে ফেলে বা আমল করে (বুখারি, মুসলিম)।
খ) নামাজ শেষে জিহবা নাড়িয়ে বাজে কথাগুলো ‘চেক’ করা
আপনি শুধু জিহবা নাড়িয়েছেন, কিন্তু কোনো শব্দ (সাউন্ড) বের হয়নি। ফিকহের কিতাবে স্পষ্ট: “কথা বলা” বলতে সেই উচ্চারণকে বোঝায় যা অন্য শুনতে পায় বা নিজে অন্তত আওয়াজ শোনে। যদি শুধু জিহবা নড়ে, অথচ কোনো শব্দ না হয়, তাহলে তা কথা বলা হিসেবে গণ্য হয় না। ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, এমনকি নিজের কানেও যদি শব্দ না পৌঁছে, তবে নামাজের ভেতরেও তা নামাজ নষ্ট করে না (রদ্দুল মুহতার, ২/৪০৪; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/১০৮)।
তাই আপনি বারবার চেক করার কারণে ঈমানের কোনো সমস্যা হবে না, বরং এটি শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আপনার সংগ্রাম। তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের চেকিং বন্ধ করুন, কারণ এটি ওয়াসওয়াসাকে বাড়িয়ে দেয়।
২) ঈমান ও বিবাহিত জীবনের অবস্থা
ঈমান:
আপনার অন্তরে আল্লাহর প্রতি যে ভালোবাসা ও ভয় আছে, সেই কারণেই আপনি এত চিন্তিত। মনে মনে আসা বাজে কথার কারণে ঈমান নষ্ট হয় না, বরং শয়তান আপনাকে বিভ্রান্ত করতে চায়। ইমাম তাহাবি (রহ.) বলেন: “ঈমান শুধু মুখের কথা নয়, বরং অন্তরের বিশ্বাস।” আপনার অন্তর তো এক্ষেত্রে অস্বস্তি ও লজ্জায় ভুগছে, যা ঈমানের আলামত।
বিবাহিত জীবন:
আপনার বিবাহ (নিকাহ) শুদ্ধ ও বৈধ। শুধু মনে মনে আসা ওয়াসওয়াসার কারণে নিকাহ ভঙ্গের কোনো কারণ নেই। নিকাহ ভঙ্গের কারণ হলো স্পষ্টভাবে কুফরি শব্দ মুখে উচ্চারণ করা (যা অন্য শুনতে পায়) এবং তাও যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ইসলামকে অপমান করার উদ্দেশ্যে হয়। আপনার ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। তাই আপনার বিবাহিত জীবন সম্পূর্ণ ঠিক আছে।
উপদেশ ও সমাধান
১. ওয়াসওয়াসা আসলে ‘আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম’ পড়ুন এবং নামাজে মনোযোগ ধরে রাখার চেষ্টা করুন।
২. চেক করার অভ্যাস ত্যাগ করুন— এটি শয়তানের ফাঁদ। আপনি নিশ্চিত থাকুন যে আপনি মুখে কিছু বলেননি।
৩. নিয়মিত জিকির ও কুরআন তিলাওয়াত করুন। বিশেষ করে সূরা নাস ও ফালাক বেশি পড়ুন।
৪. ঈমান ও নিকাহ নিয়ে শয়তানের ওয়াসওয়াসায় কান দেবেন না। আপনার ইচ্ছা ও বিশ্বাস যদি সুদৃঢ় থাকে, তাহলে শুধু মনে মনে আসা চিন্তা কোনো ক্ষতি করে না।
৫. যদি ওয়াসওয়াসা খুব বেশি হয়, তাহলে স্থানীয় কোনো আলেমের কাছে বসে কথা বলুন।
সারসংক্ষেপ
- নামাজে হাই তোলার সময় মনে মনে যে কথা এসেছে, তা গুনাহ নয় এবং নামাজও ভঙ্গ হয়নি।
- নামাজের পর জিহবা নাড়িয়ে চেক করা, যাতে কোনো শব্দ হয়নি, তাও কথা বলা হিসেবে গণ্য নয়।
- আপনার ঈমান ও বিবাহিত জীবন সম্পূর্ণ সুস্থ। একবার তওবা করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিন, ভবিষ্যতে সতর্ক থাকবেন।
আল্লাহ আপনার মন থেকে ওয়াসওয়াসা দূর করে দিন এবং ঈমানে সুস্থ রাখুন। (আমিন)