বিবাহ, শাশুড়ি-শ্বশুরের সাথে সম্পর্ক, স্বামীর দায়িত্ব ও অসুস্থ স্ত্রীর হক নিয়ে ইসলামী শরীয়তের বিধান জানতে চাই?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
প্রথমে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করে নেওয়া দরকার: আপনার বর্ণনায় দুটি ভিন্ন বিষয় মিশে আছে—(১) শরীয়তসম্মত বিবাহের বিধান ও স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক হক, এবং (২) পারিবারিক কলহ, শাশুড়ি-শাশুড়ির আচরণ ও অসুস্থতার সময় করণীয়। দ্বিতীয়টি মূলত পারিবারিক পরামর্শ ও ধৈর্যের বিষয়; শরীয়ত এখানে কিছু নীতি ও হক নির্ধারণ করে দিয়েছে, যা নিচে উল্লেখ করা হলো।
১. আপনার বিবাহের শরীয়তসম্মত অবস্থা
আপনি লিখেছেন, পারিবারিকভাবে বিয়ের ছয় মাস আগে আপনি ও আপনার স্বামী পারস্পরিক সম্মতিতে, দুজন সাক্ষীসহ (আপনার পরিবারকে জানিয়ে) বিবাহ সম্পন্ন করেছেন। ইসলামী শরীয়তে বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার জন্য প্রয়োজন: প্রস্তাব ও গ্রহণ (ইজাব-কবুল), দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম সাক্ষী, এবং পাত্র-পাত্রীর সম্মতি। পাত্র-পাত্রী উভয়ের সম্মতিতে সম্পন্ন হওয়া বিবাহ বৈধ; এতে পাপের কিছু নেই—বরং এটাই ইসলামের নির্দেশ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
«وَأَنكِحُوا الْأَيَامَىٰ مِنكُمْ وَالصَّالِحِينَ مِنْ عِبَادِكُمْ وَإِمَائِكُمْ» "তোমাদের মধ্যে যারা অবিবাহিত তাদের বিবাহ দাও..." (সূরা আন-নূর: ৩২)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "হে যুবকগণ! তোমাদের মধ্যে যার সামর্থ্য আছে সে যেন বিবাহ করে; কারণ তা দৃষ্টি সংযত রাখে ও লজ্জাস্থান হেফাজত করে।" (সহীহ বুখারী: ৫০৬৫; সহীহ মুসলিম: ১৪০০)
সুতরাং আপনার প্রথম বিবাহটি শরীয়তসম্মত ছিল। পরবর্তীতে পরিবারের আয়োজিত অনুষ্ঠানটি ছিল কেবল সামাজিক অনুষ্ঠান/ঘোষণা—এটি দ্বিতীয় বিবাহ নয়। তবে এখানে একটি সতর্কতা: পরিবারকে প্রকৃত অবস্থা না জানিয়ে তাদের আয়োজনে অংশ নেওয়া ও তাদেরকে বিভ্রান্ত রাখা ইসলামে কাম্য নয়; সত্য বলা ও সুস্পষ্টভাবে জানানো উচিত ছিল। এখন যেহেতু বিষয়টি হয়ে গেছে, ভবিষ্যতে যেন কোনো মিথ্যা বা প্রতারণার আশ্রয় না নিতে হয়—সে ব্যাপারে সতর্ক থাকুন। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৯, কিতাবুল হাযর/আদবের অধ্যায়)
২. স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক হক ও দায়িত্ব
ইসলামে স্বামীর প্রধান দায়িত্ব হলো স্ত্রীর ভরণপোষণ (নফাকা), আবাসন ও নিরাপত্তা প্রদান; আর স্ত্রীর দায়িত্ব হলো স্বামীর প্রতি অনুগত থাকা ও পরিবার পরিচালনায় সহযোগিতা করা। আল্লাহ তাআলা বলেন:
«الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ وَبِمَا أَنفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ» "পুরুষরা নারীদের তত্ত্বাবধায়ক, কারণ আল্লাহ তাদের এককে অপরের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং因为他们 নিজ সম্পদ থেকে ব্যয় করে।" (সূরা আন-নিসা: ৩৪)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "তোমরা নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো... তাদের উপর তোমাদের হক হলো তারা যেন তোমাদের শয্যা ও ঘরে অপছন্দনীয় কাউকে না আনে; আর তাদের হক হলো তোমরা ন্যায়সংগতভাবে তাদের খাদ্য ও পোশাকের ব্যবস্থা করো।" (সহীহ মুসলিম: ১২১৮)
আরেক হাদীসে: "প্রত্যেক দায়িত্বশীল তার অধীনস্থদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে।" (সহীহ বুখারী: ৮৯৩; সহীহ মুসলিম: ১৮২৯)
সুতরাং আপনার স্বামীর উপর আপনার ভরণপোষণ ও আবাসনের দায়িত্ব আছে। আপনি অসুস্থ—এ অবস্থায় আপনার চিকিৎসা ও যত্নের ব্যবস্থা করা তার দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। তবে মনে রাখবেন, মায়ের সেবা করাও তার সন্তান হিসেবে দায়িত্ব; কিন্তু মায়ের সেবার দায়িত্ব কেবল আপনার স্বামীর একার নয়—তার অন্য সন্তানরাও (২৭ ও ১১ বছরের) শরীয়ত অনুযায়ী দায়িত্বশীল, বিশেষত বড় ছেলে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও অবহেলা করলে সে গুনাহগার হবে। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৯, কিতাবুল হাযর; ফাতাওয়া আলমগীরী, কিতাবুল কারাহিয়্যাহ)
৩. আপনার প্রশ্ন: "এখানে কার প্রায়োরিটি পাওয়ার কথা ছিল?"
শরীয়তের দৃষ্টিতে উত্তর হলো:
- আপনার স্বামীর নিকট আপনার হক ও তার মায়ের হক—দুটোই আছে; কিন্তু আপনার উপর তার সরাসরি দায়িত্ব (নফাকা ও আবাসন) অগ্রাধিকারযোগ্য। আপনি অসুস্থ ও গর্ভবতী/দুর্বল অবস্থায় আছেন—এমন স্ত্রীকে ফেলে রেখে যাওয়া এবং তার প্রতি দুর্ব্যবহার করা ইসলামে নিন্দনীয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের প্রতি সর্বোত্তম আচরণ করে।" (সুনানে তিরমিযী: ৩৮৯৫)
- মায়ের সেবা করা ফরজ পর্যায়ের দায়িত্ব, কিন্তু তা সন্তানদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া উচিত। বড় ছেলে (২৭ বছর) সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও মায়ের খাবার-ওষুধের ব্যবস্থা না করলে সে শরীয়তগতভাবে দায়িত্বে অবহেলা করছে; আপনার স্বামী একা সবকিছু বহন করতে বাধ্য নন। (ফাতাওয়া আলমগীরী; রাদ্দুল মুহতার)
- আপনার প্রতি দুর্ব্যবহার ও অসুস্থ অবস্থায় ফেলে রাখা—এটি স্বামীর জন্য গুনাহের কাজ; তবে এটি সরাসরি তালাকের কারণ হয়ে যায় না, বরং এতে ধৈর্য, আলোচনা ও প্রয়োজনে পরিবারের বড়দের মধ্যস্থতা প্রয়োজন।
- আপনার নিজের স্বাস্থ্য রক্ষা করা আপনার দায়িত্বও বটে—অসুস্থ অবস্থায় নিজের চিকিৎসা করানো, বিশ্রাম নেওয়া জরুরি; নিজেকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া ইসলামে নিষিদ্ধ। (সূরা আল-বাকারা: ১৯৫)
৪. করণীয় (ব্যবহারিক পরামর্শ)
১. রাগের সময় সিদ্ধান্ত নেবেন না। আপনার স্বামী ছুটিতে এসে চাপে আছে—মা অসুস্থ, বোন-মায়ের চাপ, আপনার অসুস্থতা। এ অবস্থায় কথা বাড়ালে কলহ বাড়বে। শান্ত হয়ে কথা বলুন।
২. স্পষ্টভাবে আপনার শারীরিক অবস্থা জানান—ডাক্তারের পরামর্শ, কোমরের ব্যথা, হাঁটাচলায় অক্ষমতা। তাকে বলুন: "আমি তোমার মায়ের সেবা করতে রাজি, কিন্তু আমি নিজে অসুস্থ; আমাকে এ অবস্থায় টেনে নিয়ে গেলে আমার ক্ষতি হবে।"
৩. মায়ের সেবার দায়িত্ব ভাগ করুন—তার বড় ভাই (২৭) ও ছোট ভাই (১১) এবং শাশুড়ির অন্য আত্মীয়দের সম্পৃক্ত করুন। আপনার স্বামী একা সব করতে যাওয়া ঠিক নয়; এতে সে ক্লান্ত হবে ও আপনার প্রতি অবিচার হবে।
৪. বাসা পরিবর্তনের বিষয়টি—আপনি বলেছেন সময় নেই; তবে দীর্ঘমেয়াদে স্বামীর সাথে আলাদা বাসায় থাকা ইসলামically বৈধ ও অনেক কলহ কমায়। শাশুড়ির সাথে থাকা ফরজ নয়; স্বামীর দায়িত্ব হলো স্ত্রীর জন্য উপযুক্ত আবাসন দেওয়া। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, কিতাবুন-নফাকা)
৫. মধ্যস্থতা—আপনার বাবা বা পরিবারের সম্মানিত কেউ স্বামীর সাথে শান্তভাবে কথা বলতে পারেন; সরাসরি অভিযোগ নয়, বরং সমাধানের পথ খুঁজতে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "সালিশ যে কলহ মিটিয়ে দেয়, সে সদকাকারীর মতো।" (সুনানে আবু দাউদ)
৬. ধৈর্য ও দুআ—এ পরিস্থিতি পরীক্ষা; আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন, বেশি বেশি দুআ করুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "মুমিনের ব্যাপার আশ্চর্যজনক—সব অবস্থায় তার কল্যাণ; সুখে শোকর করলে কল্যাণ, দুঃখে ধৈর্য ধরলে কল্যাণ।" (সহীহ মুসলিম: ২৯৯৯)
৭. সতর্কতা: কোনো অবস্থাতেই নিজের বা স্বামীর উপর জুলুম করবেন না, আর কারও প্ররোচনায় স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক নষ্ট হতে দেবেন না। তবে যদি স্বামী দীর্ঘদিন ভরণপোষণ না দেয় ও নির্যাতন করে, তাহলে পরিবারের বড়দের মাধ্যমে সমাধান; শেষ পর্যন্ত শরীয়তসম্মত পথে বিচারকের আশ্রয় নেওয়া যাবে। (রাদ্দুল মুহতার; ফাতাওয়া উসমানী)
সংক্ষেপে: আপনার স্বাস্থ্য ও ভরণপোষণের দায়িত্বে আপনার স্বামী অগ্রাধিকার দেবে; মায়ের সেবা তার দায়িত্ব, কিন্তু তা ভাইদের মধ্যে ভাগ হবে। আপনার প্রতি দুর্ব্যবহার ও অসুস্থ অবস্থায় ফেলে রাখা ঠিক নয়। শান্ত আলোচনা, মধ্যস্থতা ও ধৈর্য—এটাই এখন করণীয়।
আল্লাহ ভালো জানেন।