তাবিজ পরা কি জায়েজ?

Sunnah and Bid'ah · Ahle Hadith / Salafi

Question No: 8046
Questioner: Hasna Hena
Question Asked: 06 Nov 2026, 08:03 AM
Reviewed & Published: 06 Nov 2026, 08:59 AM
Views: 60
Tokens: 4,151
This answer is according to the 'Ahle Hadith / Salafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম। আমাকে এক হুজুর পানি পড়া, তেল পড়া দিছে সাথে একটা কাগজে আরবি লেখা, সাথে কিছু চিহ্ন লেখা কাগজ দিছে যা তাবিজ করে পরতে বলছে, আমার প্রশ্ন এই তাবিজ পড়া কী জায়েজ আমার জন্য? আর প্রশ্ন হলো যে পানি ও তেল পড়া দিছে তার সাথে কী আরো পানি ও তেল মিক্স করে শরীরে নেওয়া যাবে

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

সংক্ষিপ্ত উত্তর

আপনার প্রশ্নের দুইটি অংশের উত্তর:

১. আরবি লেখা ও চিহ্নযুক্ত কাগজ তাবিজ হিসেবে পরা: যদি কাগজে শুধু কুরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম, বা বৈধ দুআ লেখা থাকে এবং কোনো শিরকি বাক্য, অজানা/বোধগম্য নয় এমন চিহ্ন বা জিন-শয়তানের নাম না থাকে — তবে সালাফি/আহলে হাদীস আলিমদের মধ্যে এ বিষয়ে মতভেদ আছে। তবে নিরাপদ ও উত্তম পথ হলো তাবিজ না পরা, বরং কুরআন তিলাওয়াত, দুআ ও রুকইয়াহ শরিয়াহর মাধ্যমে চিকিৎসা নেওয়া। আর যদি কাগজে অজানা চিহ্ন, সংখ্যা বা বোধগম্য নয় এমন কিছু থাকে — তাহলে তা হারাম ও শিরকের দিকে নিয়ে যাওয়া।

২. পানি ও তেল মিশিয়ে শরীরে নেওয়া: মূল পানি/তেলে আরও পানি/তেল মিশিয়ে ব্যবহার করা জায়েজ, যদি মূল পানি/তেল শরিয়াহসম্মতভাবে (কুরআন তিলাওয়াত/বৈধ দুআ দ্বারা) পড়া হয়ে থাকে।


বিস্তারিত আলোচনা

প্রথমত: তাবিজ পরার হুকুম

মূলনীতি: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«مَنْ عَلَّقَ تَمِيمَةً فَقَدْ أَشْرَكَ» "যে ব্যক্তি তামিমা (তাবিজ) ঝুলাল, সে শিরক করল।" — মুসনাদে আহমাদ (১৭৪২২), সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব (আলবানী: ৩৪৫৭), সহীহ বলেছেন

আরও ইরশাদ:

«إِنَّ الرُّقَى وَالتَّمَائِمَ وَالتِّوَلَةَ شِرْكٌ» "নিশ্চয়ই ঝাড়ফুঁক (শিরকি পদ্ধতির), তাবিজ ও প্রেম-মোহ সৃষ্টিকারী মন্ত্র শিরক।" — আবু দাউদ (৩৮৮৩), ইবনে মাজাহ (৩৫৩০), সহীহ

তবে সালাফদের মধ্যে পার্থক্য:

  • ইবনে মাসউদ, ইব্রাহীম নাখাঈ, ইবনে সীরিন (রহ.) — সব ধরনের তাবিজ নিষিদ্ধ বলেছেন।
  • ইমাম আহমাদ, ইবনে তাইমিয়্যাহ, ইবনে কাইয়্যিম (রহ.) — কুরআন/আল্লাহর নাম/বৈধ দুআর তাবিজকে জায়েজ বলেছেন, শর্তসহ।

শাইখ ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন:

"কুরআন ও আল্লাহর যিকর দ্বারা লেখা তাবিজ পরা একটি বিতর্কিত বিষয়... তবে ইমাম আহমাদ ও অন্যান্যরা এটি জায়েজ বলেছেন, আর ইবনে মাসউদ ও অন্যান্যরা নিষিদ্ধ বলেছেন।" — মাজমুউল ফাতাওয়া (১৯/৬৫)

শাইখ ইবনে উসাইমীন (রহ.)-এর ফতোয়া:

"কুরআন দিয়ে লেখা তাবিজ পরা জায়েজ নয় — এটি বর্জন করাই উত্তম, কারণ এতে কুরআনের অবমাননার আশঙ্কা আছে এবং এটি শিরকের দিকে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যম হতে পারে।" — ফাতাওয়া নূরুন আলাদ দারব (ফতোয়া নং ৩৯)

শাইখ আল-আলবানী (রহ.) — সব ধরনের তাবিজ পরা থেকে বিরত থাকার প্রতি জোর দিয়েছেন, কারণ হাদীসে সাধারণভাবে নিষেধ এসেছে।

শাইখ ইবনে বায (রহ.)-এর ফতোয়া:

"কুরআন বা আল্লাহর নাম দিয়ে লেখা তাবিজ পরা থেকে বিরত থাকাই উত্তম, কারণ হাদীসে সাধারণভাবে নিষেধ এসেছে এবং এতে শিরকের দরজা খুলে যায়।" — মাজমুউ ফাতাওয়া ইবনে বায (৬/২৩৫)

আপনার কাগজের বিষয়ে সতর্কতা

আপনি বলেছেন কাগজে আরবি লেখা + কিছু চিহ্ন আছে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ:

  • যদি চিহ্নগুলো অজানা, বোধগম্য নয়, সংখ্যা বা তাবিজি প্রতীক হয় — তাহলে তা স্পষ্ট হারাম, কারণ এগুলো জিন-শয়তানের নাম বা কালো জাদুর চিহ্ন হতে পারে।
  • রাসূল ﷺ বলেছেন: «مَنْ عَقَدَ عُقْدَةً ثُمَّ نَفَثَ فِيهَا فَقَدْ سَحَرَ» — "যে গিঁট বাঁধল ও তাতে ফুঁ দিল, সে জাদু করল।" (নাসাঈ, সহীহ)

সিদ্ধান্ত: আপনার বর্ণনা অনুযায়ী কাগজে অজানা চিহ্ন থাকায় এটি পরা থেকে বিরত থাকুন। এটি নিরাপদ ও দ্বীনি দৃষ্টিতে সঠিক সিদ্ধান্ত।

দ্বিতীয়ত: পানি ও তেল মিশিয়ে ব্যবহার

মূলনীতি: রুকইয়াহ শরিয়াহ (কুরআন তিলাওয়াত করে পানিতে ফুঁ দেওয়া) জায়েজ ও সুন্নাহসম্মত। রাসূল ﷺ নিজে কুরআন পড়ে ফুঁ দিতেন (বুখারী: ৫০১৭; মুসলিম: ২১৯২)।

পানি/তেল মিশানো সম্পর্কে:

  • মূল পড়া পানি/তেলে আরও সাধারণ পানি/তেল মিশিয়ে ব্যবহার করা জায়েজ — এতে কোনো নিষেধ নেই।
  • শাইখ ইবনে উসাইমীন (রহ.) বলেছেন: "পড়া পানিতে আরও পানি মিশিয়ে ব্যবহার করা দোষের নয়, কারণ মূল বরকত আল্লাহর তরফ থেকে।" (ফাতাওয়া নূরুন আলাদ দারব)
  • তবে শর্ত: মূল পানি/তেল অবশ্যই শরিয়াহসম্মত পদ্ধতিতে পড়া হতে হবে — অর্থাৎ কুরআন, আল্লাহর নাম, বৈধ দুআ দিয়ে। যদি তাতে অজানা মন্ত্র, জিনের নাম বা শিরকি কিছু থাকে — তাহলে তা ব্যবহার করা হারাম।

করণীয়

১. তাবিজটি পরবেন না — বিশেষত অজানা চিহ্ন থাকলে। এটি ফেলে দিন বা পুড়িয়ে ফেলুন (যদি কুরআনের আয়াত থাকে, সম্মানের সাথে মাটিতে পুঁতে ফেলুন)।

২. পানি ও তেল — যদি হুজুর শুধু কুরআন/বৈধ দুআ পড়ে থাকেন, তবে তা ব্যবহার করা ও মিশিয়ে নেওয়া জায়েজ। সন্দেহ থাকলে জিজ্ঞেস করুন তিনি কী পড়েছেন।

৩. সর্বোত্তম পথ: নিজে সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস পড়ে নিজের ও পরিবারের জন্য দুআ করুন এবং পানিতে ফুঁ দিয়ে ব্যবহার করুন — এটি সুন্নাহসম্মত ও নিরাপদ।

৪. রুকইয়াহ শরিয়াহর শর্ত: (ক) কুরআন/আল্লাহর নাম/বৈধ দুআ দ্বারা হতে হবে, (খ) আরবি বা বোধগম্য ভাষায় হতে হবে, (গ) বিশ্বাস রাখতে হবে যে আরোগ্য আল্লাহর তরফ থেকে, রুকইয়াহ নিজে নয়।


আল্লাহই সর্বজ্ঞ। আল্লাহ আমাদের সবাইকে শিরক ও বিদআত থেকে হেফাজত করুন এবং সুন্নাহসম্মত পথে চিকিৎসা গ্রহণের তাওফিক দিন। আমীন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.