তাবিজ পরা কি জায়েজ?
Sunnah and Bid'ah · Ahle Hadith / Salafi
Question
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর
আপনার প্রশ্নের দুইটি অংশের উত্তর:
১. আরবি লেখা ও চিহ্নযুক্ত কাগজ তাবিজ হিসেবে পরা: যদি কাগজে শুধু কুরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম, বা বৈধ দুআ লেখা থাকে এবং কোনো শিরকি বাক্য, অজানা/বোধগম্য নয় এমন চিহ্ন বা জিন-শয়তানের নাম না থাকে — তবে সালাফি/আহলে হাদীস আলিমদের মধ্যে এ বিষয়ে মতভেদ আছে। তবে নিরাপদ ও উত্তম পথ হলো তাবিজ না পরা, বরং কুরআন তিলাওয়াত, দুআ ও রুকইয়াহ শরিয়াহর মাধ্যমে চিকিৎসা নেওয়া। আর যদি কাগজে অজানা চিহ্ন, সংখ্যা বা বোধগম্য নয় এমন কিছু থাকে — তাহলে তা হারাম ও শিরকের দিকে নিয়ে যাওয়া।
২. পানি ও তেল মিশিয়ে শরীরে নেওয়া: মূল পানি/তেলে আরও পানি/তেল মিশিয়ে ব্যবহার করা জায়েজ, যদি মূল পানি/তেল শরিয়াহসম্মতভাবে (কুরআন তিলাওয়াত/বৈধ দুআ দ্বারা) পড়া হয়ে থাকে।
বিস্তারিত আলোচনা
প্রথমত: তাবিজ পরার হুকুম
মূলনীতি: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«مَنْ عَلَّقَ تَمِيمَةً فَقَدْ أَشْرَكَ» "যে ব্যক্তি তামিমা (তাবিজ) ঝুলাল, সে শিরক করল।" — মুসনাদে আহমাদ (১৭৪২২), সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব (আলবানী: ৩৪৫৭), সহীহ বলেছেন
আরও ইরশাদ:
«إِنَّ الرُّقَى وَالتَّمَائِمَ وَالتِّوَلَةَ شِرْكٌ» "নিশ্চয়ই ঝাড়ফুঁক (শিরকি পদ্ধতির), তাবিজ ও প্রেম-মোহ সৃষ্টিকারী মন্ত্র শিরক।" — আবু দাউদ (৩৮৮৩), ইবনে মাজাহ (৩৫৩০), সহীহ
তবে সালাফদের মধ্যে পার্থক্য:
- ইবনে মাসউদ, ইব্রাহীম নাখাঈ, ইবনে সীরিন (রহ.) — সব ধরনের তাবিজ নিষিদ্ধ বলেছেন।
- ইমাম আহমাদ, ইবনে তাইমিয়্যাহ, ইবনে কাইয়্যিম (রহ.) — কুরআন/আল্লাহর নাম/বৈধ দুআর তাবিজকে জায়েজ বলেছেন, শর্তসহ।
শাইখ ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন:
"কুরআন ও আল্লাহর যিকর দ্বারা লেখা তাবিজ পরা একটি বিতর্কিত বিষয়... তবে ইমাম আহমাদ ও অন্যান্যরা এটি জায়েজ বলেছেন, আর ইবনে মাসউদ ও অন্যান্যরা নিষিদ্ধ বলেছেন।" — মাজমুউল ফাতাওয়া (১৯/৬৫)
শাইখ ইবনে উসাইমীন (রহ.)-এর ফতোয়া:
"কুরআন দিয়ে লেখা তাবিজ পরা জায়েজ নয় — এটি বর্জন করাই উত্তম, কারণ এতে কুরআনের অবমাননার আশঙ্কা আছে এবং এটি শিরকের দিকে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যম হতে পারে।" — ফাতাওয়া নূরুন আলাদ দারব (ফতোয়া নং ৩৯)
শাইখ আল-আলবানী (রহ.) — সব ধরনের তাবিজ পরা থেকে বিরত থাকার প্রতি জোর দিয়েছেন, কারণ হাদীসে সাধারণভাবে নিষেধ এসেছে।
শাইখ ইবনে বায (রহ.)-এর ফতোয়া:
"কুরআন বা আল্লাহর নাম দিয়ে লেখা তাবিজ পরা থেকে বিরত থাকাই উত্তম, কারণ হাদীসে সাধারণভাবে নিষেধ এসেছে এবং এতে শিরকের দরজা খুলে যায়।" — মাজমুউ ফাতাওয়া ইবনে বায (৬/২৩৫)
আপনার কাগজের বিষয়ে সতর্কতা
আপনি বলেছেন কাগজে আরবি লেখা + কিছু চিহ্ন আছে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ:
- যদি চিহ্নগুলো অজানা, বোধগম্য নয়, সংখ্যা বা তাবিজি প্রতীক হয় — তাহলে তা স্পষ্ট হারাম, কারণ এগুলো জিন-শয়তানের নাম বা কালো জাদুর চিহ্ন হতে পারে।
- রাসূল ﷺ বলেছেন: «مَنْ عَقَدَ عُقْدَةً ثُمَّ نَفَثَ فِيهَا فَقَدْ سَحَرَ» — "যে গিঁট বাঁধল ও তাতে ফুঁ দিল, সে জাদু করল।" (নাসাঈ, সহীহ)
সিদ্ধান্ত: আপনার বর্ণনা অনুযায়ী কাগজে অজানা চিহ্ন থাকায় এটি পরা থেকে বিরত থাকুন। এটি নিরাপদ ও দ্বীনি দৃষ্টিতে সঠিক সিদ্ধান্ত।
দ্বিতীয়ত: পানি ও তেল মিশিয়ে ব্যবহার
মূলনীতি: রুকইয়াহ শরিয়াহ (কুরআন তিলাওয়াত করে পানিতে ফুঁ দেওয়া) জায়েজ ও সুন্নাহসম্মত। রাসূল ﷺ নিজে কুরআন পড়ে ফুঁ দিতেন (বুখারী: ৫০১৭; মুসলিম: ২১৯২)।
পানি/তেল মিশানো সম্পর্কে:
- মূল পড়া পানি/তেলে আরও সাধারণ পানি/তেল মিশিয়ে ব্যবহার করা জায়েজ — এতে কোনো নিষেধ নেই।
- শাইখ ইবনে উসাইমীন (রহ.) বলেছেন: "পড়া পানিতে আরও পানি মিশিয়ে ব্যবহার করা দোষের নয়, কারণ মূল বরকত আল্লাহর তরফ থেকে।" (ফাতাওয়া নূরুন আলাদ দারব)
- তবে শর্ত: মূল পানি/তেল অবশ্যই শরিয়াহসম্মত পদ্ধতিতে পড়া হতে হবে — অর্থাৎ কুরআন, আল্লাহর নাম, বৈধ দুআ দিয়ে। যদি তাতে অজানা মন্ত্র, জিনের নাম বা শিরকি কিছু থাকে — তাহলে তা ব্যবহার করা হারাম।
করণীয়
১. তাবিজটি পরবেন না — বিশেষত অজানা চিহ্ন থাকলে। এটি ফেলে দিন বা পুড়িয়ে ফেলুন (যদি কুরআনের আয়াত থাকে, সম্মানের সাথে মাটিতে পুঁতে ফেলুন)।
২. পানি ও তেল — যদি হুজুর শুধু কুরআন/বৈধ দুআ পড়ে থাকেন, তবে তা ব্যবহার করা ও মিশিয়ে নেওয়া জায়েজ। সন্দেহ থাকলে জিজ্ঞেস করুন তিনি কী পড়েছেন।
৩. সর্বোত্তম পথ: নিজে সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস পড়ে নিজের ও পরিবারের জন্য দুআ করুন এবং পানিতে ফুঁ দিয়ে ব্যবহার করুন — এটি সুন্নাহসম্মত ও নিরাপদ।
৪. রুকইয়াহ শরিয়াহর শর্ত: (ক) কুরআন/আল্লাহর নাম/বৈধ দুআ দ্বারা হতে হবে, (খ) আরবি বা বোধগম্য ভাষায় হতে হবে, (গ) বিশ্বাস রাখতে হবে যে আরোগ্য আল্লাহর তরফ থেকে, রুকইয়াহ নিজে নয়।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ। আল্লাহ আমাদের সবাইকে শিরক ও বিদআত থেকে হেফাজত করুন এবং সুন্নাহসম্মত পথে চিকিৎসা গ্রহণের তাওফিক দিন। আমীন।