বাজার সদাই কারীদের জন্য নাস্তার টাকা রাখতে ক্যাশ মেমোতে পণ্যর অতিরিক্ত মূল্য লিখে উপস্থাপন করা কি জায়েজ?
Halal and Haram · Hanafi
Question
এখন আমার প্রশ্ন হলো, আয়োজক কমিটি যে এই কিছু টাকা দোকান এর সঠিক ক্যাশ মেমো এর পরিবর্তে কিছু অতিরিক্ত টাকা যুক্ত করে নতুন ক্যাশ মেমো দিয়েছে, তবে এই টাকা কি হালাল হবে??
Answer
ক্যাশ মেমোতে অতিরিক্ত টাকা লিখে নেওয়া কি হালাল?
সংক্ষিপ্ত উত্তর: না, এভাবে অতিরিক্ত টাকা লিখে নেওয়া হালাল নয়। এটি আমানতের খিয়ানত ও প্রতারণার অন্তর্ভুক্ত। তবে সমাধানের পথ আছে — যা নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো।
১. মূল নীতি: আমানত রক্ষা করা ফরজ
হল কর্তৃপক্ষ যে টাকা খেলাধুলার খরচ ও পুরস্কারের জন্য দিয়েছে, তা একটি আমানত। আমানতে খিয়ানত করা হারাম।
আল্লাহ তাআলা বলেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের আদেশ দেন আমানতসমূহ তার মালিকদের কাছে প্রত্যার্পণ করতে..." (সূরা নিসা: ৫৮)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন: "যার মধ্যে আমানতদারি নেই, তার মধ্যে ঈমান নেই।" (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ১২৩৮৩)
অন্য হাদিসে: "যে ব্যক্তি প্রতারণা করে, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১০১)
২. ক্যাশ মেমোতে অতিরিক্ত টাকা লেখা = মিথ্যা + প্রতারণা
দোকানদাতাকে দিয়ে প্রকৃত মূল্যের চেয়ে বেশি টাকার মেমো বানানো এবং সেই মেমো হলের কাছে জমা দেওয়া দুটি হারাম কাজের সমন্বয়:
- মিথ্যা সাক্ষ্য/মিথ্যা দলিল তৈরি — যা কুরআনে নিষিদ্ধ: "মিথ্যা কথা থেকে দূরে থাকো" (সূরা হজ: ৩০)
- প্রতারণা (গিশ/তাগাল্লুব) — রাসূল ﷺ বলেছেন: "প্রতারণাকারী আমার উম্মতভুক্ত নয়।" (সহিহ মুসলিম)
ফতোয়ায়ে শামি (রদ্দুল মুহতার)-এ স্পষ্ট আছে যে, কারও সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রহণ করা বা ভুয়া দলিলের মাধ্যমে নেওয়া হারাম। (রদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, কিতাবুল গাসব ও কিতাবুল বুয়ু)
ফতোয়ায়ে উসমানি-তেও উল্লেখ আছে যে, প্রতিষ্ঠানের (হল/সংগঠন) তহবিলে ভুয়া বিল দিয়ে টাকা তোলা খিয়ানত, যা হারাম। (ফতোয়ায়ে উসমানি, খণ্ড ৩, কিতাবুল বুয়ু ও ইজারা অধ্যায়)
৩. "নাস্তার জন্য টাকা" — এটা কি বৈধতা দেয়?
না। কারণ:
- হল কর্তৃপক্ষ নাস্তার জন্য কিছু টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে — তাহলে সঠিকভাবে চেয়ে নেওয়া উচিত, ভুয়া মেমো বানিয়ে নয়।
- ভুয়া মেমোতে টাকা দেখানো মানে হলের টাকা থেকে অন্য খাতে (নাস্তা) ব্যবহার করা, যা অনুমোদিত খরচ নয় — এটি অনুমতিহীন ব্যবহার (তাসাররুফ বিলা ইজন)।
- যদি নাস্তার টাকা বৈধভাবে পাওয়া যায়, তাহলে সেটাই নেওয়া উচিত; আর না পেলে নিজ পকেট থেকে খাওয়া উচিত, প্রতিষ্ঠানের টাকা আত্মসাৎ নয়।
ইমদাদুল ফতোয়া-য় আছে: "কোনো প্রতিষ্ঠানের তহবিলে ভুয়া বিল দিয়ে টাকা উত্তোলন করা খিয়ানত, এবং তা ফেরত দেওয়া ওয়াজিব।" (ইমদাদুল ফতোয়া, খণ্ড ৪)
৪. যাতায়াত খরচ ও বাজার করার শ্রম
ছেলেরা বাজার করে, ঘুরে কম দামে জিনিস কিনেছে — এটা তাদের ইহসান ও খেদমত। কিন্তু এর বিনিময় হিসেবে ভুয়া মেমো বানানো জায়েজ নয়। যদি যাতায়াত খরচের প্রকৃত বিল থাকে, সেটা সত্যিকার বিল দিয়ে দাবি করা যাবে। আর শ্রমের পারিশ্রমিক চাইলে আগে থেকেই কমিটির অনুমোদন নিতে হবে — চুপচাপ মেমোতে বাড়িয়ে নেওয়া নয়।
৫. শরীয়তসম্মত সমাধান
১. প্রকৃত বিলই জমা দাও — দোকান থেকে সঠিক মেমো নাও। ২. নাস্তার টাকা — হল কর্তৃপক্ষের কাছে আলাদাভাবে আবেদন করো; অনুমোদন পেলে বৈধভাবে নাও। ৩. যাতায়াত খরচ — প্রকৃত ভাড়ার রশিদ/বিল থাকলে সেটা দাবি করো। ৪. ইতিমধ্যে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হয়ে গেলে — সেই টাকা হলের তহবিলে ফেরত দেওয়া ওয়াজিব। তাওবা করতে হবে। (রদ্দুল মুহতার, কিতাবুল গাসব) ৫. ভবিষ্যতে — কমিটি গঠন করে আগেই বাজেট অনুমোদন করাও, যাতে অনুমোদিত খরচের বাইরে কিছু না লাগে।
৬. একটি সতর্কতা
কেউ যদি মনে করে "সবাই মিলে নাস্তা করব, এতে তো সবার উপকার" — এ যুক্তি শরীয়তে গ্রহণযোগ্য নয়। উদ্দেশ্য ভালো হলেও উপায় হারাম হলে তা হালাল হয় না। হাদিসে এসেছে: "নিশ্চয়ই হালাল সুস্পষ্ট এবং হারাম সুস্পষ্ট..." (সহিহ বুখারি ও মুসলিম) — আর হারাম পথে হালাল উদ্দেশ্য হাসিল হয় না।
উপসংহার
প্রশ্নে উল্লিখিত পদ্ধতিতে ক্যাশ মেমোতে অতিরিক্ত টাকা লিখে নেওয়া হালাল নয় — বরং তা খিয়ানত ও প্রতারণা, যা কবিরা গুনাহ। কর্তব্য হলো: প্রকৃত বিল জমা দেওয়া, নাস্তা ও যাতায়াতের টাকা সঠিকভাবে অনুমোদন নিয়ে নেওয়া, এবং ইতিমধ্যে নেওয়া অতিরিক্ত টাকা ফেরত দেওয়া।
আল্লাহ ভালো জানেন।