স্ত্রীর হাতখরচ কি স্বামীর উপর শরয়ীভাবে ওয়াজিব?
Family Life · Hanafi
Question
একজন স্বামী তার স্ত্রীর জন্য শরিয়তের বাইরে কোনো দায়িত্ব পালন করে না। এবং করবেনা এটা স্পষ্টভাবে কয়েকবার স্ত্রীকে বলেছে। যেমন:
সে তার স্ত্রীর জন্য খাদ্য,বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা এর বাইরে খরচ করবেনা বলেছে ।
কিন্তু একজন মহিলার এর বাইরেও কিছু খরচ আছে। মা বাবা অথবা আত্মীয়স্বজন এর জন্য মাঝে মাঝে খরচ করা, নিজের পছন্দের কিছু কিনতে ইচ্ছা হয়, সাজসজ্জার জিনিস / বই পছন্দ হয়৷
যেহেতু স্বামীর সংসারে প্রচুর ব্যস্ততা থাকার কারনে ঐ মহিলার উপার্জনের সময় নেই তাই সে স্বামীর কাছে মাসে ৫০০/১০০০ টাকা হাতখরচ হিসেবে দাবী করে। স্বামীও আর্থিকভাবে যথেষ্ট সচ্ছল। এখন স্ত্রীকে কি স্বামী এই হাতখরচ দিতে বাধ্য? শরিয়ত এই ব্যাপারে কি বলে?
Answer
স্ত্রীর হাতখরচ ও স্বামীর ভরণপোষণের সীমা: শরয়ী দৃষ্টিভঙ্গি
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
আপনার জিজ্ঞাসিত পারিবারিক ও শরঈ বিষয়টির ফিকহে হানাফী ও প্রামাণ্য কিতাবসমূহের আলোকে ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট শরঈ ফয়সালা নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
১. মূল শরঈ সিদ্ধান্ত (সংক্ষেপে):
- আইনগত বাধ্যবাধকতা (ক্বাযা'আন / শরঈ ওয়াজিব): স্বামী যদি তার স্ত্রীর জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসার সমস্ত খরচ সঠিকভাবে বহন করে, তবে অতিরিক্ত হিসেবে নির্দিষ্ট কোনো "হাতখরচ" (Pocket Money) দেওয়া স্বামীর ওপর আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক বা ফরয/ওয়াজিব নয়।
- নৈতিক ও আখলাকী গুরুত্ব (দিয়ানাতান / ইহসান ও মা'রূফ): তবে স্বামী সচ্ছল হওয়া সত্ত্বেও স্ত্রীর সাজসজ্জা, পছন্দের জিনিস বা পিতা-মাতাকে সামান্য তোহফা দেওয়ার জন্য হাতখরচ না দেওয়া এবং কঠোরতা দেখানো ইসলামী শিষ্টাচার ও 'মা'রূফ' (ন্যায্য সৌহার্দ্যপূর্ণ জীবনযাপন)-এর পরিপন্থী।
২. বিস্তারিত ফিকহী ব্যাখ্যা:
ক. নফকা বা খোরপোষের শরঈ সীমানা:
ইসলামী শরীআত ও ফিকহে হানাফী অনুযায়ী স্বামীর ওপর স্ত্রীর যে খোরপোষ (নফকা) ওয়াজিব, তার সুনির্দিষ্ট পরিধি হলো: ১. পর্যাপ্ত ও সম্মানজনক খাদ্য (طعام) ২. ঋতুভিত্তিক প্রয়োজনীয় পোশাক ও পরিচ্ছদ (كسوة) ৩. নিরাপদ ও স্বতন্ত্র বাসস্থান (سكنى) ৪. প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পবিত্রীকরণের সরঞ্জাম
স্ত্রীর পিতামাতা/আত্মীয়দের উপহার দেওয়া, নিজস্ব বিলাসদ্রব্য, অতিরিক্ত বই বা শখের কেনাকাটার খরচ এই আবশ্যকীয় 'নফকা'-এর আইনি সীমানার অন্তর্ভুক্ত নয়। সুতরাং, স্বামী যদি উক্ত মূল আবশ্যকীয় বিষয়গুলো ঠিকমতো আদায় করে, তবে অতিরিক্ত হাতখরচ না দেওয়ার কারণে শরঈ বিচারে সে গোনাহগার বা আইন লঙ্ঘনকারী হিসেবে সাব্যস্ত হবে না।
খ. 'মা'রূফ' ও 'ইহসান' (সৌহার্দ্য ও উদারতা):
ইসলাম কেবল শুষ্ক আইন দিয়ে সংসার পরিচালনার নির্দেশ দেয় না; বরং কুরআন মাজীদে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:
﴿وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ﴾ (অর্থ: "তোমরা স্ত্রীদের সাথে সদ্ভাবে ও সৌজন্যের সাথে জীবনযাপন করো।" —সূরা নিসা: ১৯)।
- স্ত্রীর অবদান ও অধিকার: যেহেতু স্ত্রী দিন-রাত স্বামীর সংসার, ঘরদোর ও পরিবারের সেবা সামলাতে ব্যস্ত থাকে এবং নিজের উপার্জনের সময় পায় না, তাই একজন সচ্ছল স্বামীর উচিত স্ত্রীকে কেবল মৌলিক খাবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তার মানসিক সন্তুষ্টি ও সাধারণ সাজসজ্জার জন্য সাধ্যমতো কিছু অর্থ হাতখরচ হিসেবে দেওয়া।
- হাদীস শরীফের নির্দেশনা: রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন, কোনো মুসলিম ব্যক্তি নিজের পরিবার-পরিজনের সুখ-শান্তির জন্য যে অর্থ ব্যয় করে, তা আল্লাহর কাছে অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাদকা ও সওয়াব হিসেবে গণ্য হয়।
৩. আপনার জন্য পরামর্শ ও করণীয়:
১. স্ত্রীর করণীয়: হাতখরচকে নিজের "আইনগত কড়াকড়ি পাওনা" বানিয়ে স্বামীর সাথে ঝগড়া বা দাবি-দাওয়ার মানসিকতা প্রকাশ করা শরীআতসম্মত নয়। স্ত্রীর উচিত স্বামীর কড়াকড়িকে এড়িয়ে প্রজ্ঞা, ভালোবাসা ও সুন্দর আলোচনার মাধ্যমে স্বামীর কাছে নিজের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা। ২. স্বামীর করণীয়: স্বামীর উচিত একজন সচ্ছল ব্যক্তি হিসেবে কেবল আইনি দোহাই দিয়ে স্ত্রীকে সংকুচিত না রাখা। স্ত্রীর মানসিক প্রশান্তি, সাজসজ্জা এবং পিতামাতাকে সামান্য হাদিয়া দেওয়ার জন্য প্রতি মাসে সাধ্য অনুযায়ী ৫০০-১০০০ টাকা বা সুবিধাজনক হাতখরচ দেওয়া তার সুন্দর আখলাক ও সওয়াবের মাধ্যম হবে।
সংযুক্ত কিতাবসমূহের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):
-
দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ২৬১, ২৬২, ২৬৩ (দরসুল ফিকহ ১/২৬১-২৬৩) (অধ্যায়: 'সংসারে স্ত্রীর দায়িত্ব ও কর্তব্য — নাফাকা (খোরপোষ), কিফায়াত ও মা'রূফ অনুযায়ী খোরপোষ নির্ধারণের ফিকহী সীমানা')।
-
ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (২য় খণ্ড - বাংলা সংস্করণ):
- পৃষ্ঠা: ৮২ (হিন্দিয়াহ ১/৫৪১, ৫৪২) (অধ্যায়: কিতাবুন নিকাহ, ১৭শ পরিচ্ছেদ: খোরপোষের বর্ণনা — 'স্বামীর ওপর স্ত্রীর প্রাত্যহিক আবশ্যকীয় খোরপোষের ফিকহী আহকাম')।
-
ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (১৯শ খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ১৮১ (মাহমুদিয়া ১৯/১৮১) (অধ্যায়: বাবুল হিজাব/সহবাস ও নফকা — 'পরিবার-পরিজনের পেছনে খরচ করার সওয়াব ও উত্তম আচরণের শরঈ আদেশ')।
আল্লাহ ভালো জানেন।