পেইজ মডারেটর হিসেবে ইউটিউবে মিউজিক, বেপর্দা নারী মডেল বা ফ্যাশন-শো ভিডিও আপলোড করা কি জায়েজ হবে?
Business and Job · Hanafi
Question
আমি পেইজ মডারেটর হিসেবে অনলাইনে কাজ করি। নতুন আরো কিছু কাজ যুক্ত হওয়াতে আমার দায়িত্বে ইউটিউবে ভিডিও আপলোড করতে হবে। এক্ষেত্রে ভিডিও তে মিউজিক বা কথা টাইপ মেয়ে মডেলের হিজাব বা বোরকার এ ধরনের ভিডিও আপলোড করতে হবে, যেটা কম্পানি দিয়ে দিবে। আমাকে শুধু আপলোড করতে হবে। এক্ষেত্রে এই ধরনের ভিডিও আপলোড করলে কি আমার গুনাহ হবে? যেহেতু কম্পানি কর্তৃপক্ষ এ কাজ আমার উপর দিয়েছেন। আমার আসলে খারাপ লাগছে কিন্তু কাজ করার ক্ষেত্রে এগুলো মেইনটেইন করা ও কষ্টকর বিষয়। অনুগ্রহ করে জানাবেন আমার করনীয় কি?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর: হ্যাঁ, এ ধরনের ভিডিও (যাতে মিউজিক/গান, নাচ-গান, বেপর্দা নারী মডেল, অশ্লীলতা বা ইসলামবিরোধী কনটেন্ট থাকে) আপলোড করা, শেয়ার করা বা প্রচার করা গুনাহ। কোম্পানির নির্দেশ এ গুনাহকে বৈধ করে না। তবে আপনার করণীয় হলো—এ ধরনের কাজ এড়িয়ে যাওয়া, সম্ভব হলে কোম্পানিকে ইসলামসম্মত কনটেন্টে কাজ করার প্রস্তাব দেওয়া, এবং না পারলে এ দায়িত্ব থেকে বিরত থাকা বা চাকরি পরিবর্তনের চেষ্টা করা। প্রয়োজনে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে হালাল রুজির জন্য অন্য উপায় খোঁজা।
বিস্তারিত ফতোয়া
১. মূল নীতি: গুনাহের কাজে সহযোগিতা করা হারাম
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ “নেকি ও তাকওয়ার কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো, আর গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা করো না।” — (সূরা আল-মায়িদা: ২)
যে ব্যক্তি গুনাহের কনটেন্ট আপলোড করে, শেয়ার করে বা প্রচার করে—সে ওই গুনাহের প্রচার-প্রসারে সরাসরি সহযোগিতা করে। এটা শুধু “দেখা” নয়; বরং নিজ হাতে গুনাহের মাধ্যম তৈরি ও বিস্তার করা।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
مَنْ دَلَّ عَلَى خَيْرٍ فَلَهُ مِثْلُ أَجْرِ فَاعِلِهِ “যে ব্যক্তি কোনো ভালো কাজের দিকে ডাকে, তার জন্য কাজটি করার সমান সওয়াব।” — (সহীহ মুসলিম: ১৮৯৩)
এর বিপরীতে—যে গুনাহের দিকে ডাকে বা গুনাহের প্রচার করে, তার উপরও সেই গুনাহের অংশ বর্তাবে। হাদীসে এসেছে:
مَنْ سَنَّ فِي الْإِسْلَامِ سُنَّةً سَيِّئَةً كَانَ عَلَيْهِ وِزْرُهَا وَوِزْرُ مَنْ عَمِلَ بِهَا “যে ব্যক্তি ইসলামে কোনো মন্দ রীতির প্রচলন করল, তার উপর তার ও তার অনুসরণকারীদের গুনাহের বোঝা বর্তাবে।” — (সহীহ মুসলিম: ১০১৭)
২. মিউজিক ও গান সম্পর্কে
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَيَكُونَنَّ مِنْ أُمَّتِي أَقْوَامٌ يَسْتَحِلُّونَ الْحِرَ وَالْحَرِيرَ وَالْخَمْرَ وَالْمَعَازِفَ “আমার উম্মতের মধ্যে এমন লোক হবে যারা ব্যভিচার, রেশম, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল মনে করবে।” — (সহীহ বুখারী: ৫৫৯০)
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ গান-বাদ্য সম্পর্কে বলেন, এটি লাহওয়াল-হাদীস (বাতিল কথাবার্তা), যা কুরআনে নিন্দিত। (রাদ্দুল মুহতার: ৬/৩৪৮)
৩. নারীদের বেপর্দা প্রদর্শন ও ফিতনার প্রচার
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَىٰ “আর তোমরা প্রাচীন জাহেলিয়াতের মতো নিজেদের প্রদর্শন করো না।” — (সূরা আল-আহযাব: ৩৩)
قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ “মুমিনদের বলো, তারা তাদের দৃষ্টি সংযত রাখবে ও লজ্জাস্থান হেফাজত করবে।” — (সূরা আন-নূর: ৩০)
যে ভিডিওতে নারীর আকর্ষণীয় উপস্থাপন, হিজাব-বোরকা পরেও ফ্যাশন-শো বা মডেলিংয়ের মাধ্যমে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়—তা ফিতনার প্রচার। আর যে ব্যক্তি তা আপলোড করে, সে এই ফিতনা ছড়ানোর মাধ্যম হয়।
৪. “কোম্পানির নির্দেশ” দায়মুক্ত করে না
ইসলামে কারো নির্দেশে গুনাহ করা জায়েজ হয় না। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
لَا طَاعَةَ فِي مَعْصِيَةِ اللَّهِ، إِنَّمَا الطَّاعَةُ فِي الْمَعْرُوفِ “আল্লাহর নাফরমানিতে কোনো আনুগত্য নেই; আনুগত্য কেবল নেক কাজে।” — (সহীহ বুখারী: ৭২৫৭; সহীহ মুসলিম: ১৮৪০)
ইমাম আনোয়ার শাহ কাশ্মীরি (রহ.) ও মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.)-এর আলোচনা অনুযায়ী, চাকরির প্রয়োজনে হারাম কাজ করা বৈধ নয়; বরং হালাল রুজির জন্য অন্য পথ তালাশ করা কর্তব্য। (ইমদাদুল ফাতাওয়া: ৪/২৭০-এর আলোচনা দ্রষ্টব্য)
৫. ফতোয়া ওয়ালাদের মত
ফাতাওয়া উসমানি ও ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে স্পষ্ট করা হয়েছে—কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার শর্ত যদি হারাম কাজ করা হয়, তবে ওই চাকরি নেওয়া জায়েজ নয়; আর যদি ইতিমধ্যে নেওয়া হয়ে থাকে, তবে হারাম অংশ থেকে বিরত থাকা ও তাওবা করা আবশ্যক। (ফাতাওয়া উসমানি: ৩/৪৫৫-এর আলোচনা; ইমদাদুল ফাতাওয়া: ৪/২৭০)
আপনার করণীয় (ধাপে ধাপে)
-
প্রথমে আল্লাহর উপর ভরসা করে এই কাজ থেকে বিরত থাকার সংকল্প করুন। মনে রাখবেন, রিযিকের মালিক আল্লাহ; তিনি হারাম ছাড়ার বিনিময়ে হালাল রিযিকের নিশ্চয়তা দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
مَنْ تَرَكَ شَيْئًا لِلَّهِ عَزَّ وَجَلَّ عَوَّضَهُ اللَّهُ خَيْرًا مِنْهُ “যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য কোনো কিছু ছাড়ে, আল্লাহ তাকে তার চেয়ে উত্তম বিনিময় দান করেন।” — (মুসনাদ আহমাদ: ২৩১২৩)
-
কোম্পানিকে ইসলামসম্মত বিকল্পের প্রস্তাব দিন—যেমন: ইসলামি শিক্ষামূলক ভিডিও, হালাল ব্যবসার প্রচার, নৈতিক কনটেন্ট, বা এমন কনটেন্ট যাতে গান-বাদ্য ও বেপর্দা নেই। সম্ভব হলে এ দায়িত্ব অন্যদের কাছে হস্তান্তরের অনুরোধ করুন।
-
যদি কোম্পানি না মানে, তবে এই নির্দিষ্ট কাজ (হারাম কনটেন্ট আপলোড) করা থেকে বিরত থাকুন। প্রয়োজনে চাকরি ছাড়ার বা অন্য হালাল কাজ খোঁজার প্রস্তুতি নিন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ “যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন এবং এমন জায়গা থেকে রিযিক দেন যা সে কল্পনাও করেনি।” — (সূরা আত-তালাক: ২-৩)
-
তাওবা করুন—যদি ইতিমধ্যে এ ধরনের ভিডিও আপলোড করে থাকেন, তবে আন্তরিক তাওবা করুন, ভবিষ্যতে বিরত থাকুন, এবং সম্ভব হলে সেই কনটেন্ট সরিয়ে ফেলুন বা ডিলিট করুন।
-
দুআ করুন—আল্লাহর কাছে হালাল রিযিক ও গুনাহ থেকে হেফাজতের দুআ করুন। বিশেষ করে এই দুআটি পড়ুন:
اللَّهُمَّ اكْفِنِي بِحَلَالِكَ عَنْ حَرَامِكَ، وَأَغْنِنِي بِفَضْلِكَ عَمَّنْ سِوَاكَ “হে আল্লাহ! আপনার হালাল দিয়ে আমাকে হারাম থেকে বাঁচান, এবং আপনার অনুগ্রহে আমাকে অন্য সবার থেকে মুখাপেক্ষীহীন করুন।” — (তিরমিজি: ৩৫৬৩)
উপসংহার
কোম্পানির চাপ বা চাকরির প্রয়োজনে গুনাহের কাজ করা জায়েজ নয়। মিউজিক, বেপর্দা নারী মডেল, ফ্যাশন-শো ইত্যাদি সম্বলিত ভিডিও আপলোড করা সরাসরি গুনাহ ও ফিতনা প্রচারের অন্তর্ভুক্ত। আপনার কর্তব্য—এ কাজ থেকে বিরত থাকা, ইসলামসম্মত বিকল্পের চেষ্টা করা, এবং প্রয়োজনে হালাল রুজির জন্য অন্য পথ তালাশ করা। আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য হালাল ও বরকতময় রিযিকের ব্যবস্থা করুন। আমিন।
والله أعلم بالصواب