স্বামীর ভাই চুমু দিলে হুরমত হবে কি
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
আমি একজন বিবাহিত নারী। আমার স্বামীর ছোট ভাই আমাকে আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে চুমু দিয়েছে। আমি বাধা দিয়েছিলাম, আমার কোনো সম্মতি ছিল না।
এখন আমার প্রশ্ন:
১. হানাফি মাজহাব অনুযায়ী এতে কি হুরমতে মুসাহারাত সৃষ্টি হয়েছে?
২. আমার স্বামীর সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক কি এখনো বৈধ আছে?
৩. যদি কোনো নিষেধাজ্ঞা সৃষ্টি হয়ে থাকে, তাহলে আমার করণীয় কী?
দয়া করে কোরআন-হাদিস ও হানাফি ফিকহ অনুযায়ী বিস্তারিত ফতোয়া দেবেন।
জাযাকাল্লাহ খাইরান।
Answer
وَعَلَيْكُمُ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ
সংক্ষিপ্ত উত্তর (উপসংহার আগে):
আপনার সাথে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ও কষ্টদায়ক ঘটনাটির জন্য গভীর সমবেদনা প্রকাশ করছি। ঘটনাটিতে আপনার কোনো সম্মতি বা ইচ্ছা ছিল না এবং আপনি বাধা দিয়েছিলেন, তাই শরীআতের দৃষ্টিতে আপনি সম্পূর্ণ নির্দোষ।
আপনার ৩টি প্রশ্নের ফিকহে হানাফী ও প্রামাণ্য কিতাবসমূহের আলোকে ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ সুনির্দিষ্ট শরঈ ফয়সালা নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
১. ১ম ও ২য় প্রশ্নের উত্তর: হুরমতে মুসাহারাত সৃষ্টি হয়েছে কি? এবং স্বামীর সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক বৈধ আছে কি না?
মূল সিদ্ধান্ত: ১. না, হানাফী মাযহাব অনুযায়ী এতে কোনো প্রকার 'হুরমতে মুসাহারাত' (বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম হওয়া) সৃষ্টি হয়নি। ২. আপনার স্বামীর সাথে আপনার বৈবাহিক সম্পর্ক শতভাগ সহীহ, বৈধ এবং সম্পূর্ণ হালাল রয়েছে। আপনাদের বিবাহের ওপর এর কোনো প্রভাব পড়েনি।
ফিকহী ব্যাখ্যা ও কারণ:
- হুরমতে মুসাহারাতের সুনির্দিষ্ট সীমানা: ফিকহে হানাফী অনুযায়ী, জিনা বা কামভাবের সাথে স্পর্শ/চুম্বনের মাধ্যমে হুরমতে মুসাহারাত কেবল তখনই সাব্যস্ত হয় এবং বৈবাহিক সম্পর্ক ভেঙে যায়, যখন উক্ত কাজ স্বামীর উসূল (উর্ধ্বতন পুরুষ, যেমন: শ্বশুর বা ভাসুর-শ্বশুর) অথবা স্বামীর ফুরূ (অধঃস্তন পুরুষ, যেমন: সতিন-পুত্র বা নাতি) দ্বারা ঘটে থাকে।
- দেবরের অবস্থান: স্বামীর ভাই বা দেবর শরীআতের দৃষ্টিতে উসূলও নন, ফুরূও নন; বরং তিনি পার্শ্বীয় আত্মীয় (হওয়াশী)।
- ফলাফল: দেবর বা স্বামীর ছোট ভাই ভাবীকে জোর করে স্পর্শ করলে বা চুমু দিলে দেবরের চরম গোনাহ ও কবিরা গোনাহ হলেও, ভাবী ও তাঁর স্বামীর বৈবাহিক সম্পর্কের ওপর কোনো হুরমত বা নিষেধাজ্ঞা সৃষ্টি হয় না।
২. ৩য় প্রশ্নের উত্তর: আপনার বর্তমান করণীয়
যেহেতু আপনার ও আপনার স্বামীর বিবাহ সম্পূর্ণ বহাল রয়েছে, তাই আপনাদের পৃথক হওয়া বা নতুন করে বিয়ে পড়ার কোনো প্রয়োজন নেই। তবে ভবিষ্যতে এই ধরণের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি থেকে বেঁচে থাকার জন্য নিম্নোক্ত শরঈ দায়িত্ব পালন করা আবশ্যক:
১. দেবরের সাথে কঠোর পর্দা ও দূরত্ব বজায় রাখা: ইসলামী শরীআতে দেবরের সাথে পর্দা করার বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ ﷺ স্পষ্টভাবে ইরশাদ করেছেন:
«الْحَمْوُ الْمَوْتُ» (অর্থ: "দেবর হলো মৃত্যুর সমতুল্য।")।
অতএব, দেবরের সামনে কোনোভাবেই সামনাসামনি না যাওয়া, তার সাথে একাকী নির্জন কক্ষে অবস্থান না করা (খলওয়াত না করা) এবং পূর্ণাঙ্গ শরঈ পর্দা বজায় রাখা আপনার জন্য ফরয ।
২. নিরাপত্তা নিশ্চিত করা: যেহেতু দেবর সীমালঙ্ঘন ও অন্যায় আচরণ করেছে, তাই নিজের ইজ্জত-আব্রু রক্ষার্থে তার কাছে বা আশেপাশে একাকী না থাকার ব্যবস্থা গ্রহণ করুন এবং প্রয়োজনবোধে স্বামী বা মুরুব্বীদের মাধ্যমে সতর্ক থাকুন।
৩. দেবরের ওপর গোনাহের দায়ভার: এই জঘন্য অন্যায়ের সম্পূর্ণ দায়ভার ও গোনাহ দেবরের নিজের ঘাড়ে বর্তাবে। তার জন্য দ্রুত আল্লাহর দরবারে খাঁটি তাওবা করা আবশ্যক।
সংযুক্ত কিতাবসমূহের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):
-
দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ১৫১, ১৫২, ১৫৩, ১৫৪ (অধ্যায়: 'হুরমাতে মুসাহারাত: কিছু জটিলতা ও সমাধান — হুরমতে মুসাহারাতের কারণে যাদের সাথে বিবাহ হারাম: উসূল ও ফুরূ; এবং দেবরের মাধ্যমে হুরমত সাব্যস্ত না হওয়ার ফিকহী তফশীল') ।
- পৃষ্ঠা: ১৪৪, ১৪৫, ১৪৬ (অধ্যায়: 'হুরমতে মুসাহারাতের পরিচিতি ও মানাত') ।
-
ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (২য় খণ্ড - বাংলা সংস্করণ):
- পৃষ্ঠা: ৩৭, ৩৮ (অধ্যায়: কিতাবুন নিকাহ, ৩য় পরিচ্ছেদ: মুহাররামাতের বিবরণ — 'মুসাহারাতজনিত কারণে হারাম হওয়া আত্মীয়দের বিবরণ')।
- পৃষ্ঠা: ৩৮, ৩ ৯ (অধ্যায়: কিতাবুন নিকাহ — 'কামভাবের সাথে স্পর্শ বা চুমু দেওয়ার ফিকহী আহকাম')।
-
ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (১৯শ খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ১৭৬, ১৭৭ (অধ্যায়: বাবুল হিজাব — 'الحمو الموت: দেবরের সাথে পর্দার কঠোর বাধ্যবাধকতা এবং নির্জনবাসের নিষেধাজ্ঞা')।
وَاللهُ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى أَعْلَمُ بِالصَّوَابِ