স্বামীর বোনের স্বামী কি মাহরাম? গায়রে মাহরামের সাথে কথা বলায় স্বামীর জবরদস্তি করলে স্ত্রীর করণীয় কী?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 7949
Questioner: Nowrin Nowal
Question Asked: 04 Nov 2026, 07:41 PM
Reviewed & Published: 04 Nov 2026, 08:15 PM
Views: 51
Tokens: 4,424
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমি পর্দা করার জন্য বরের বোনের স্বামির সাথে কথা বলতে চাই না। কিন্তু আমার স্বামি আমাকে কথা বলার জন্য জোর জবরদস্তি করে আর ঝগড়া করে। এ অবস্থায় আমার কি করা উচিত?

Answer

প্রশ্নের উত্তর: বরের বোনের স্বামীর সাথে কথা বলার ব্যাপারে স্বামীর জবরদস্তি

সংক্ষিপ্ত উত্তর

আপনার অবস্থান ইসলামী দৃষ্টিতে সঠিক। আপনার স্বামীর বোনের স্বামী আপনার জন্য নন-মাহরাম (গায়রে মাহরাম)। তাঁর সাথে বিনা প্রয়োজনে কথা বলা, দেখা-সাক্ষাৎ করা বা নির্জনে মেলা-মেশা করা শরীয়তসম্মত নয়। স্বামী জোর করলেও আপনি এই গুনাহের কাজে সম্মতি দিতে বাধ্য নন। তবে স্বামীর সাথে সম্পর্ক নষ্ট না করে ধৈর্য, নরম ভাষা ও হিকমতের সাথে বিষয়টি বুঝানোর চেষ্টা করুন এবং প্রয়োজনে বিশ্বস্ত আলেম/পরিবারের বড়দের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করুন।


বিস্তারিত আলোচনা

১. বরের বোনের স্বামী কি মাহরাম?

না। ইসলামী শরীয়তে মাহরাম সেই সমস্ত পুরুষ, যাদের সাথে বিবাহ চিরতরে হারাম (যেমন: বাবা, ভাই, চাচা, মামা, দুধ-সম্পর্কের আত্মীয় ইত্যাদি)। বোনের স্বামী বা বরের বোনের স্বামী — এরা কেউই মাহরাম নয়। বরং হাদীসে বিশেষভাবে সতর্ক করা হয়েছে:

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: «إِيَّاكُمْ وَالدُّخُولَ عَلَى النِّسَاءِ» فَقَالَ رَجُلٌ مِنَ الأَنْصَارِ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَفَرَأَيْتَ الْحَمْوَ؟ قَالَ: «الْحَمْوُ الْمَوْتُ»

— সহীহ বুখারী, হাদীস ৫২৩২; সহীহ মুসলিম, হাদীস ২১৭২

অর্থ: "নারীদের কাছে (বেগানা হয়ে) প্রবেশ করা থেকে সাবধান!" এক আনসারী বললেন, "হে আল্লাহর রাসূল! শ্যালক (হামূ)-এর ব্যাপারে কী বলেন?" তিনি বললেন: "শ্যালক হলো মৃত্যু (অর্থাৎ সর্বাধিক বিপদের কারণ)।"

এখানে "হামূ" বলতে স্বামীর ভাই বা নিকট আত্মীয়কে বোঝানো হয়েছে। একইভাবে স্ত্রীর বোনের স্বামী, বরের বোনের স্বামী—সবাই গায়রে মাহরাম। সুতরাং আপনার পর্দা রক্ষার ইচ্ছা সম্পূর্ণ শরীয়তসম্মত।

২. পর্দা ও গায়রে মাহরাম থেকে দূরত্বের বিধান

আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:

﴿وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا...﴾

— সূরা আন-নূর, আয়াত ৩১

আরও ইরশাদ করেন:

﴿وَإِذَا سَأَلْتُمُوهُنَّ مَتَاعًا فَاسْأَلُوهُنَّ مِن وَرَاءِ حِجَابٍ ۚ ذَٰلِكُمْ أَطْهَرُ لِقُلُوبِكُمْ وَقُلُوبِهِنَّ﴾

— সূরা আল-আহযাব, আয়াত ৫৩

অর্থ: "তোমরা তাদের (নবী-পত্নীগণ) কাছে কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাও; এটা তোমাদের ও তাদের অন্তরের জন্য অধিক পবিত্র।"

ফাতাওয়া শামী-তে উল্লেখ আছে, গায়রে মাহরামের সাথে বিনা প্রয়োজনে কথা বলা বা দেখা-সাক্ষাৎ করা নিষিদ্ধ; প্রয়োজনে কথা বললে পর্দার বিধান ও শালীনতা রক্ষা করতে হবে। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৯, পৃষ্ঠা ৫৫০-এর দিকে; ফাতাওয়া আলমগীরী, কিতাবুল কারাহিয়্যাহ)

বেহেশতি জেওর-এ হযরত আশরাফ আলী থানভী (রহ.) স্পষ্টভাবে লিখেছেন: গায়রে মাহরামের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ, কথা-বার্তা ও নির্জনে মেলা-মেশা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ; প্রয়োজনে পর্দার সাথে সংক্ষিপ্ত কথা বলা যেতে পারে, কিন্তু আপসহীনভাবে নয়। (বেহেশতি জেওর, পর্দার অধ্যায়)

৩. স্বামীর আনুগত্যের সীমা

ইসলামে স্ত্রীর উপর স্বামীর আনুগত্য ফরজ, তবে গুনাহের কাজে আনুগত্য নেই। হাদীসে এসেছে:

«لَا طَاعَةَ فِي مَعْصِيَةِ اللَّهِ، إِنَّمَا الطَّاعَةُ فِي الْمَعْرُوفِ»

— সহীহ বুখারী, হাদীস ৭২৫৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৮৪০

অর্থ: "আল্লাহর নাফরমানিতে কোনো আনুগত্য নেই; আনুগত্য কেবল নেক কাজে।"

সুতরাং স্বামী যদি গায়রে মাহরামের সাথে কথা বলতে বাধ্য করেন, তবে তা আল্লাহর নাফরমানির নির্দেশ—এতে আনুগত্য করা আপনার উপর ওয়াজিব নয়। বরং আপনি নরমভাবে অস্বীকার করে পর্দা রক্ষা করবেন।

৪. তবে স্বামীর সাথে ঝগড়া ও সম্পর্ক নষ্ট করা যাবে না

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

﴿وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ﴾

— সূরা আন-নিসা, আয়াত ১৯

আর স্ত্রীদের উদ্দেশ্যে:

﴿فَالصَّالِحَاتُ قَانِتَاتٌ حَافِظَاتٌ لِّلْغَيْبِ بِمَا حَفِظَ اللَّهُ﴾

— সূরা আন-নিসা, আয়াত ৩৪

সুতরাং স্বামীর অবাধ্যতা বা ঝগড়া নয়; বরং ধৈর্য, নরম ভাষা ও হিকমতের সাথে বিষয়টি বুঝানো কর্তব্য। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«إِنَّ الرِّفْقَ لَا يَكُونُ فِي شَيْءٍ إِلَّا زَانَهُ، وَلَا يُنْزَعُ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا شَانَهُ»

— সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৫৯৪

অর্থ: "নম্রতা যে জিনিসে থাকে, তা তাকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে; আর যে জিনিস থেকে তা চলে যায়, তা তাকে কলুষিত করে।"


করণীয় (ব্যবহারিক পরামর্শ)

  1. স্বামীকে শান্তভাবে বুঝান: একান্তে, রাগ না করে, ভালোবাসার সাথে বলুন—"আমি তোমার আনুগত্য করতে চাই, কিন্তু গায়রে মাহরামের সাথে কথা বলা আল্লাহর হুকুমের খিলাফ। এতে আমার দ্বীন ও ইজ্জতের ক্ষতি হয়। তুমি আমার পর্দা রক্ষায় সহযোগিতা করো।"

  2. শরীয়তের দলিল পেশ করুন: উপরের হাদীস ও আয়াতগুলো স্বামীকে পড়ে শোনান বা কোনো নির্ভরযোগ্য ফতোয়ার কিতাব/আলেমের বয়ান শুনান।

  3. প্রয়োজনে পরিবারের বড়দের সহায়তা নিন: স্বামীর পিতা-মাতা, আপনার পিতা-মাতা বা বিশ্বস্ত আলেমকে মধ্যস্থতা করতে বলুন।

  4. কোনো অবস্থাতেই গুনাহের কাজে সম্মতি দেবেন না: জোর করলেও গায়রে মাহরামের সাথে বিনা প্রয়োজনে কথা বলা, নির্জনে দেখা করা বা মেলা-মেশা করবেন না। প্রয়োজনে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত, শালীন ও পর্দার সাথে কথা বলতে পারেন—কিন্তু আপসহীনভাবে নয়।

  5. ধৈর্য ও দু'আ: আল্লাহর কাছে স্বামীর হেদায়েত ও আপনার পর্দার হেফাজতের দু'আ করুন। রাসূল ﷺ-এর শেখানো দু'আ: «اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْهُدَى وَالتُّقَى وَالْعَفَافَ وَالْغِنَى» (সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৭২১)।

  6. যদি স্বামী নির্যাতন করে: শারীরিক নির্যাতন বা চরম জবরদস্তি হলে পারিবারিক সালিশ ও প্রয়োজনে শরীয়তসম্মত বিচারকের শরণাপন্ন হওয়া জায়েয। তবে প্রথমে ধৈর্য ও সদুপায় অবলম্বন করুন।


সারসংক্ষেপ

  • বরের বোনের স্বামী আপনার গায়রে মাহরাম; তাঁর সাথে বিনা প্রয়োজনে কথা বলা শরীয়তে নিষিদ্ধ।
  • স্বামীর আনুগত্য ফরজ, কিন্তু গুনাহের কাজে আনুগত্য নেই (সহীহ বুখারী ৭২৫৭)।
  • আপনি পর্দা রক্ষায় সঠিক পথে আছেন; জোর করলেও গুনাহে সম্মতি দেবেন না।
  • তবে স্বামীর সাথে ঝগড়া নয়; নম্রতা, হিকমত ও পরিবারের সহায়তায় সমাধানের চেষ্টা করুন।

আল্লাহ তা'আলা আপনার পর্দা হেফাজত করুন এবং স্বামীকে হেদায়েত দান করুন। আমীন।


References (মূল আরবি ও কিতাবি উদ্ধৃতি)

| বিষয় | দলিল | |---|---| | শ্যালক/গায়রে মাহরাম সম্পর্কে সতর্কতা | সহীহ বুখারী ৫২৩২; সহীহ মুসলিম ২১৭২ | | গুনাহে আনুগত্য নেই | সহীহ বুখারী ৭২৫৭; সহীহ মুসলিম ১৮৪০ | | পর্দার বিধান | সূরা আন-নূর ৩১; সূরা আল-আহযাব ৫৩ | | গায়রে মাহরামের সাথে কথা-বার্তার বিধান | রাদ্দুল মুহতার; ফাতাওয়া আলমগীরী (কিতাবুল কারাহিয়্যাহ); বাহিশতী যেওর (পর্দার অধ্যায়) | | নম্রতার ফজিলত | সহীহ মুসলিম ২৫৯৪ | | হেদায়েতের দু'আ | সহীহ মুসলিম ২৭২১ |


আল্লাহ ভালো জানেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.