পররাষ্ট্র ক্যাডার

Business and Job · Hanafi

Question No: 7955
Questioner: Sadikur Rahman Sadik
Question Asked: 04 Nov 2026, 09:38 PM
Reviewed & Published: 05 Nov 2026, 02:36 AM
Views: 43
Tokens: 5,207
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

বিসিএস পররাষ্ট্র ক্যাডারে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে হয় কাজের তাগিদে যেখানে মদ পরিবেশন করা হয়। আমি যদি না খাই এবং সেই অনুষ্ঠানে দেশের প্রতিনিধি হিসেবে অংশগ্রহণ করি তাহলে তা জায়েজ হবে? দেশের স্বার্থ রক্ষার্থে অনেক সময় অমুসলিম দেশগুলোর সাথে বিভিন্ন প্রকার সুদি চুক্তি বা অনেক কিছু করতে হয় এবং অনেক কৌশল অবলম্বন করতে হয়। অনেক দেশের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হয়। এক্ষেত্রে কি এই চাকরি করা জায়েজ হবে?

Answer

পররাষ্ট্র ক্যাডারে চাকরি ও মদ পরিবেশিত অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ: শরয়ি বিধান

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

বিসিএস (পররাষ্ট্র) ক্যাডারে কর্মরত ব্যক্তি কাজের প্রয়োজনে এমন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন যেখানে মদ পরিবেশন করা হয়; তিনি নিজে পান করেন না। এছাড়া দেশের স্বার্থে অমুসলিম দেশগুলোর সাথে সুদি চুক্তি ও কূটনৈতিক কৌশল অবলম্বন করতে হয়। এসব অবস্থায় চাকরিটি জায়েজ হবে কি?


১. মূল নীতি: মদ ও মজলিসে মদের বিধান

কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ

"হে ঈমানদারগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদি ও ভাগ্য নির্ণয়ের তীর—এসব অপবিত্র, শয়তানের কাজ; সুতরাং এগুলো থেকে বেঁচে থাকো, যাতে তোমরা সফলকাম হও।" (সূরা মায়িদা: ৯০)

হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:

مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلَا يَجْلِسْ عَلَى مَائِدَةٍ يُدَارُ عَلَيْهَا الْخَمْرُ

"যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনে বিশ্বাস রাখে, সে যেন এমন দস্তরখানে না বসে যেখানে মদ আবর্তিত (পরিবেশিত) হয়।" (তিরমিজি: ২৮০১; মুসনাদে আহমাদ: ১৪২৪১ — হাসান)

ফিকহি মূলনীতি: মদ পরিবেশনকারী মজলিসে উপস্থিত থাকা নিজে পান না করলেও নিষিদ্ধ; কারণ এতে মদকে স্বীকৃতি ও সমর্থন দেওয়া হয় এবং গুনাহের মজলিসে উপস্থিতি ঘটে। ইমাম ইবন আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেন যে, খামর পরিবেশিত মজলিসে বসা জায়েজ নয়, যদিও সে না খায়। (রাদ্দুল মুহতার: ৬/৩৯০-এর কাছাকাছি; «আল-বাহরুর রায়িক» দ্র.)

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে:

  • খাওয়া/পান করা বা মদের প্রতি সম্মতি প্রকাশ → সম্পূর্ণ হারাম।
  • নিজে না খেয়ে, শুধু দায়িত্বপালনের জন্য উপস্থিত থাকা → এ বিষয়ে ফুকাহায়ে কেরামের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে, যা নিচে বর্ণিত হলো।

২. মদ পরিবেশিত অনুষ্ঠানে উপস্থিতির বিস্তারিত বিধান

(ক) সাধারণ অবস্থায় নিষেধ

মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) «মাআরিফুল কুরআন»-এ সূরা মায়িদার ৯০ নং আয়াতের তাফসিরে বলেন, খামর শুধু পান করা নয়; বরং এর পরিবেশন, ক্রয়-বিক্রয়, বহন ও মজলিসে উপস্থিতি—সবই নিষিদ্ধ। (মাআরিফুল কুরআন: ৩/২৩৫-২৪০)

(খ) দ্বীনি জরুরত ও দাওয়াতি উদ্দেশ্য

ইমাম আত-তাহাবি (রহ.) «শারহু মাআনিল আসার»-এ এবং ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর বর্ণনায় এসেছে, কেউ যদি দ্বীনি প্রয়োজন বা দাওয়াতের উদ্দেশ্যে এমন মজলিসে যায় এবং মদকে ঘৃণা করে, তবে তা ভিন্ন। কিন্তু নিছক চাকরি বা প্রোটোকল রক্ষার উদ্দেশ্যে তা জরুরতের অন্তর্ভুক্ত নয়।

(খ-২) জরুরতের সীমা

«আল-আশবাহ ওয়ান নাযাইর» ও «মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যাহ»-এর মূলনীতি:

الضَّرُورَةُ تُقَدَّرُ بِقَدَرِهَا

"ضرুরত তার প্রকৃত পরিমাণ অনুযায়ী অনুমান করা হয়।"

অর্থাৎ জরুরতের অজুহাতে হারামের বিস্তার ঘটানো যাবে না। পররাষ্ট্র ক্যাডারে চাকরি ছাড়া জীবিকার অন্য কোনো পথ না থাকলে এবং মদ পরিবেশিত অনুষ্ঠানে উপস্থিতি এড়ানোর কোনো বিকল্প না থাকলে—তখন জরুরতের বিধান প্রযোজ্য হতে পারে; কিন্তু সাধারণত এ ধরনের অনুষ্ঠান এড়ানোর সুযোগ থাকে (যেমন: অসুস্থতার অজুহাত, প্রতিনিধি প্রেরণ, আগে থেকে জানিয়ে না যাওয়া ইত্যাদি)।


৩. সুদি চুক্তি ও কূটনৈতিক কৌশলের বিধান

(ক) সুদ সম্পূর্ণ হারাম

وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

"আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।" (সূরা বাকারা: ২৭৫)

রাসূলুল্লাহ ﷺ সুদ গ্রহণকারী, প্রদানকারী, লেখক ও সাক্ষী—সবাইকে লানত করেছেন। (মুসলিম: ১৫৯৮)

(খ) অমুসলিম রাষ্ট্রের সাথে চুক্তি

ইসলামি রাষ্ট্র ও অমুসলিম রাষ্ট্রের মধ্যে সন্ধি ও চুক্তি জায়েজ—এটি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হুদাইবিয়ার সন্ধি দ্বারা প্রমাণিত। কিন্তু চুক্তিতে সুদি লেনদেন অন্তর্ভুক্ত হলে তা হারাম; কারণ জরুরতের অজুহাতে সুদ বৈধ হয় না। ইমাম ইবন আবিদিন (রহ.) বলেন, «الضرورة لا تبيح الربا»—ضرুরত সুদকে হালাল করে না। (রাদ্দুল মুহতার: ৫/১৮৭-এর কাছাকাছি; «ফাতাওয়া উসমানি»: ৩/৩৩৫-৩৪০ দ্র.)

(গ) কূটনৈতিক কৌশল (হিয়াল)

শরিয়তের অনুমোদিত কৌশল (হিলা শরইয়্যা) জায়েজ; কিন্তু হারামকে হালাল করার কৌশল (হিলা বাতিলা) নিষিদ্ধ। মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) «ফাতাওয়া উসমানি»-তে স্পষ্ট করেছেন, সুদ এড়ানোর বৈধ উপায় অবলম্বন করা যাবে, কিন্তু সুদি চুক্তিকে কৌশলে বৈধ বলা যাবে না। (ফাতাওয়া উসমানি: ৩/৩৩৫)


৪. চাকরিটি জায়েজ হবে কি? — সমন্বিত ফতোয়া

সারাংশ:

  1. চাকরি করা মূলত জায়েজ—পররাষ্ট্র ক্যাডারে দেশের প্রতিনিধিত্ব করা, কূটনীতি পরিচালনা করা বৈধ পেশা; এতে দেশ ও উম্মতের কল্যাণ রয়েছে।
  2. তবে শর্ত হলো: চাকরির দায়িত্বপালনে হারাম কাজ (মদ পরিবেশন, সুদি লেনদেনে সরাসরি অংশগ্রহণ, সুদি চুক্তিতে স্বাক্ষর) নিজে করা বা তাতে সম্মতি দেওয়া যাবে না।
  3. মদ পরিবেশিত অনুষ্ঠানে উপস্থিতি: নিজে না খেলেও সাধারণভাবে নিষিদ্ধ। যদি এমন অনুষ্ঠানে উপস্থিতি এড়ানো একেবারেই অসম্ভব হয় এবং চাকরি ছাড়া জীবিকার কোনো পথ না থাকে—তাহলে জরুরতের বিধান প্রযোজ্য হবে; তবে সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে:
    • অনুষ্ঠানে না যাওয়ার বৈধ অজুহাত খোঁজা (অসুস্থতা, অন্য প্রতিনিধি প্রেরণ)।
    • মদ পরিবেশিত অংশ থেকে দূরে থাকা, শুধু প্রয়োজনীয় প্রোটোকল অংশে সীমাবদ্ধ থাকা।
    • মদের প্রতি অন্তরে ঘৃণা রাখা ও মুখে অস্বীকৃতি জানানো।
  4. সুদি চুক্তি: সরাসরি সুদি চুক্তিতে স্বাক্ষর করা বা সুদি লেনদেন পরিচালনা করা জায়েজ নয়। যদি চাকরির শর্তেই তা থাকে এবং এড়ানোর কোনো উপায় না থাকে—তাহলে এমন চাকরি ত্যাগ করা বা বৈধ বিকল্প খোঁজা উত্তম; জরুরতের অজুহাতে সুদ বৈধ হবে না।
  5. কৌশল: বৈধ কৌশল (হিলা শরইয়্যা) জায়েজ; হারামকে হালাল করার কৌশল নিষিদ্ধ।

চূড়ান্ত পরামর্শ:

  • সম্ভব হলে এমন পদে/বিভাগে বদলি নিন যেখানে মদ ও সুদি লেনদেনের সংস্পর্শ কম।
  • প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজের নিয়ত পরিষ্কার রাখুন—দেশের স্বার্থ ও দ্বীনের স্বার্থ একসাথে রক্ষার চেষ্টা করুন।
  • সন্দেহজনক ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য মুফতির সাথে সরাসরি পরামর্শ করুন; কারণ পররাষ্ট্র ক্যাডারের প্রকৃত দায়িত্বের ধরন জানা ছাড়া চূড়ান্ত ফতোয়া দেওয়া কঠিন।

মূলনীতি: «الضرورة لا تبيح الحرام المطلق»—ضرুরত চিরস্থায়ী হারামকে বৈধ করে না; বরং ضرুরতের পরিমাণ অনুযায়ীই ছাড় দেওয়া হয়।


তথ্যসূত্র

  • সূরা মায়িদা: ৯০; সূরা বাকারা: ২৭৫
  • তিরমিজি: ২৮০১; মুসলিম: ১৫৯৮; মুসনাদে আহমাদ: ১৪২৪১
  • মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি): ৩/২৩৫-২৪০
  • রাদ্দুল মুহতার (ইবন আবিদিন): ৫/১৮৭; ৬/৩৯০
  • ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি): ৩/৩৩৫-৩৪০
  • আল-আশবাহ ওয়ান নাযাইর; মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যাহ (মূলনীতি নং ১৭)
  • শারহু মাআনিল আসার (ইমাম আত-তাহাবি)
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভি): ৪/২৭০-এর কাছাকাছি

আল্লাহ সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.