সেনাবাহীনির চাকরি বেছে নেওয়া কি উত্তম পথ হবে?
Business and Job · Hanafi
Question
Answer
সেনাবাহিনীর চাকরি বেছে নেওয়া কি উত্তম পথ হবে?
সংক্ষিপ্ত উত্তর (খুলাসা)
সেনাবাহিনীতে চাকরি করা নিজে থেকে হারাম নয় — বরং প্রয়োজনের সময় (জিহাদ বা দেশরক্ষা) এটি সওয়াবের কাজ হতে পারে। তবে শর্ত হলো: চাকরির দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে শরীয়তবিরোধী কোনো কাজ (দাড়ি কামানো, নামাজ ত্যাগ, গান-বাজনা, বেপর্দা, অন্যায়ে সহযোগিতা ইত্যাদি) করতে বাধ্য হওয়া যাবে না। যদি বাধ্যতামূলকভাবে শরীয়তবিরোধী কাজ করতে হয়, তাহলে সে চাকরি সচেতন মুসলিমের জন্য উপযুক্ত নয় — বরং অন্য হালাল পথ অবলম্বন করা কর্তব্য।
বিস্তারিত ফতোয়া
১. মূলনীতি: সেনাবাহিনী নিজে হারাম নয়
ইসলামে সেনাবাহিনী বা সামরিক চাকরি একটি বৈধ পেশা। রাসূলুল্লাহ ﷺ ও সাহাবায়ে কিরাম যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন, সেনাবাহিনী পরিচালনা করেছেন। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
"তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে এবং ধৈর্য ধারণ করে..." (সূরা আলে ইমরান: ১৪২)
তবে "আল্লাহর পথে" হওয়া শর্ত। যদি রাষ্ট্রীয় নীতিমালা ইসলামবিরোধী হয় বা অন্যায় যুদ্ধে বাধ্য করা হয়, তাহলে সেখানে অংশগ্রহণ করা জায়েয হবে না।
২. দাড়ি কামানোর বিষয়টি
দাড়ি রাখা ওয়াজিব, কামানো গুনাহ — এটি হানাফি মাযহাবের সুস্পষ্ট ফতোয়া।
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন) — খতমে লিহিয়ার আলোচনায়: দাড়ি এক মুষ্টি পরিমাণ রাখা ওয়াজিব, কামানো বা এক মুষ্টির কম করা নাজায়েয।
- ফতোয়ায়ে আলমগিরি ও ফতোয়ায়ে উসমানি-তেও দাড়ি কামানোকে গুনাহ বলা হয়েছে।
সুতরাং: যদি চাকরির শর্ত হিসেবে দাড়ি কামানো বাধ্যতামূলক হয়, তাহলে সেটি হারাম কাজে বাধ্য হওয়া — যা জায়েয নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"তোমরা নিজেদের হত্যা করো না।" (সূরা নিসা: ২৯)
এবং রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন: "আনুগত্য কেবল নেক কাজে; গুনাহের কাজে আনুগত্য নেই।" (সহিহ বুখারি: ৭২৫৭, সহিহ মুসলিম: ১৮৪০)
৩. জাতিসংঘের পক্ষে কাজ করা
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ নিয়ে দুটি দিক বিবেচ্য:
- যদি মিশনটি মুসলিমদের ওপর অন্যায়, জুলুম বা ইসলামবিরোধী কার্যক্রমে সহযোগিতা করে — তাহলে সেখানে অংশগ্রহণ জায়েয নয়। আল্লাহ বলেন: "তোমরা পাপ ও সীমালঙ্ঘনে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।" (সূরা মায়িদা: ২)
- যদি মিশনটি নিরপেক্ষভাবে নিরপরাধ মানুষ রক্ষা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজ করে এবং শরীয়তবিরোধী কিছু করতে বাধ্য না হয় — তাহলে মূলত জায়েয, তবে সতর্কতা অবলম্বন জরুরি।
তবে বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে জাতিসংঘের মিশনে ইসলামবিরোধী নীতিমালা ও মুসলিমবিরোধী অবস্থানের আশঙ্কা থাকে — তাই সাধারণভাবে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত, এবং নির্দিষ্ট মিশনের প্রকৃতি জেনে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
৪. সচেতন মুসলিমের জন্য করণীয়
আপনার প্রশ্নের মূল কথা: "এখানে চাকরি করা কি সচেতন মুসলিমের ঠিক হবে?"
উত্তর: শর্তসাপেক্ষে হ্যাঁ, শর্ত ভঙ্গ হলে না। নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনা করুন:
| বিষয় | বিধান | |---|---| | দাড়ি কামানো বাধ্যতামূলক | জায়েয নয় — অন্য পথ খুঁজুন | | নামাজ ত্যাগ করতে বাধ্য করা | জায়েয নয় | | অন্যায় যুদ্ধে বাধ্য করা | জায়েয নয় | | গান-বাজনা, বেপর্দা বাধ্যতামূলক | সতর্কতা জরুরি | | শুধু দেশরক্ষা ও শৃঙ্খলা রক্ষা | জায়েয, বরং সওয়াবের কাজ |
৫. হানাফি ফকীহদের বক্তব্য
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে, জিহাদ ও সেনাবাহিনীতে যোগদান বৈধ — তবে ন্যায়ের পক্ষে।
- ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর বক্তব্য: অন্যায় যুদ্ধে অংশগ্রহণ নাজায়েয।
- মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) — মাআরিফুল কুরআন-এ সূরা নিসার ৭৫ নং আয়াতের তাফসীরে বলেন: দুর্বল ও মজলুমদের রক্ষার জন্য যুদ্ধ করা বৈধ, কিন্তু জুলুমের জন্য নয়।
- মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) — ফতোয়ায়ে উসমানি-তে বলেন: চাকরির শর্ত যদি শরীয়তবিরোধী হয়, তাহলে সে চাকরি ত্যাগ করা বা শর্ত এড়ানোর উপায় খোঁজা কর্তব্য।
৬. আপনার জন্য পরামর্শ
১. প্রথমে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করুন — রিযিকের মালিক আল্লাহ। তিনি বলেন: "যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন।" (সূরা তালাক: ২)
২. সেনাবাহিনীর ভেতরে যদি এমন পদ বা শাখা থাকে যেখানে দাড়ি রাখা ও নামাজ আদায়ের সুযোগ আছে (যেমন: মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রশাসনিক, শিক্ষা শাখা) — সেগুলো বিবেচনা করুন।
৩. বিকল্প পেশা — পুলিশ, আনসার, ফায়ার সার্ভিস, শিক্ষা, ব্যবসা, সরকারি-বেসরকারি চাকরি — যেখানে দ্বীন পালনের স্বাধীনতা আছে।
৪. স্থানীয় নির্ভরযোগ্য মুফতি-র সাথে সরাসরি পরামর্শ করুন, কারণ নির্দিষ্ট দেশের সেনাবাহিনীর নীতিমালা ভিন্ন।
স্পষ্ট ফতোয়া কোথায় পাবেন?
আপনি নিম্নোক্ত নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে ফতোয়া পেতে পারেন:
অনলাইন ফতোয়া সাইট (হানাফি):
- darulifta-deoband.com — দারুল ইফতা দেবন্দ (হানাফি, নির্ভরযোগ্য)
- ifatwa.info — ইফতোয়া (হানাফি ফতোয়া ডেটাবেস)
- askimam.org — মুফতি ইব্রাহিম দেসাই (হানাফি)
- daruliftaa.com — মুফতি তাকি উসমানি ও মুফতি ইব্রাহিম দেসাই
- banuri.edu.pk — জামিয়া বানুরিয়া টাউন (হানাফি)
কিতাব:
- ফতোয়ায়ে উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি) — ৩ খণ্ড
- ইমদাদুল ফতোয়া (আশরাফ আলী থানভী)
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন) — দাড়ি ও চাকরির আলোচনা
- বাহিশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী) — পেশা ও হালাল-হারাম অধ্যায়
- ফতোয়ায়ে আলমগিরি — জিহাদ ও সেনাবাহিনী অধ্যায়
স্থানীয়:
- আপনার নিকটস্থ দারুল ইফতা (মাদরাসা) — সরাসরি প্রশ্ন করুন
- হেফাজত/দেওবন্দি মাদরাসার মুফতি — নির্ভরযোগ্য ফতোয়ার জন্য
উপসংহার
সেনাবাহিনীতে চাকরি নিজে হারাম নয়, কিন্তু শরীয়তবিরোধী কাজে বাধ্য হওয়া জায়েয নয়। যদি দাড়ি কামানো, নামাজ ত্যাগ বা অন্যায়ে সহযোগিতা বাধ্যতামূলক হয় — তাহলে সচেতন মুসলিমের জন্য সে চাকরি পরিত্যাগ করা বা বিকল্প খোঁজা উত্তম। আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য উত্তম পথ সহজ করে দিন। আমিন।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।