রাসূলুল্লাহ ﷺ দুনিয়ার ব্যাপারে কী বলেছেন?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
Answer
দুনিয়ার ব্যাপারে হযরত মোহাম্মদ ﷺ যা বলেছেন
প্রশ্ন: দুনিয়ার ব্যাপারে হযরত মোহাম্মদ (সা.) কী বলেছেন?
উত্তর:
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন, ওয়াস-সালাতু ওয়াস-সালামু আলা রাসূলিহিল কারিম, আম্মা বাদ:
রাসূলুল্লাহ ﷺ দুনিয়ার ব্যাপারে বহু হাদীসে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। সংক্ষেপে কয়েকটি দিক তুলে ধরা হলো:
১. দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী ও পরীক্ষার স্থান
রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন—
«كُنْ فِي الدُّنْيَا كَأَنَّكَ غَرِيبٌ أَوْ عَابِرُ سَبِيلٍ»
“দুনিয়ায় তুমি এমনভাবে থাকো যেন তুমি একজন মুসাফির বা পথিক।” — সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৪১৬
অর্থাৎ দুনিয়াকে চিরস্থায়ী ঠিকানা মনে না করা, বরং আখিরাতের পাথেয় সংগ্রহের ক্ষেত্র হিসেবে দেখা।
২. দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার, কাফিরের জন্য জান্নাত
«الدُّنْيَا سِجْنُ الْمُؤْمِنِ وَجَنَّةُ الْكَافِرِ»
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” — সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৯৫৬
অর্থাৎ মুমিন দুনিয়ার আরাম-আয়েশে মগ্ন না হয়ে আখিরাতের অনন্ত সুখের জন্য প্রস্তুতি নেবে।
৩. দুনিয়ার মূল্য আল্লাহর কাছে অতি নগণ্য
«لَوْ كَانَتِ الدُّنْيَا تَعْدِلُ عِنْدَ اللَّهِ جَنَاحَ بَعُوضَةٍ مَا سَقَى كَافِرًا مِنْهَا شَرْبَةَ مَاءٍ»
“যদি দুনিয়ার মূল্য আল্লাহর কাছে একটি মশার ডানার সমানও হতো, তবে তিনি কাফিরকে এক ঢোকা পানিও দিতেন না।” — জামে তিরমিযী, হাদীস ২৩২০ (হাসান সহীহ)
৪. দুনিয়ার মোহ থেকে সতর্কতা
«مَا الدُّنْيَا فِي الْآخِرَةِ إِلَّا مِثْلُ مَا يَجْعَلُ أَحَدُكُمْ إِصْبَعَهُ فِي الْيَمِّ فَلْيَنْظُرْ بِمَ يَرْجِعُ»
“আখিরাতের তুলনায় দুনিয়ার উদাহরণ তেমন, যেমন তোমাদের কেউ সমুদ্রে আঙুল ডুবিয়ে দেখে কী নিয়ে ফিরে।” — সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৮৫৮
৫. হালাল উপার্জন ও পরিমিত জীবনযাপন
রাসূল ﷺ নিজে দুনিয়ার সম্পদ থেকে দূরে থাকলেও হালাল উপার্জন ও পরিমিত ভোগকে নিষিদ্ধ করেননি। তিনি বলেছেন—
«مَنْ أَصْبَحَ مِنْكُمْ آمِنًا فِي سِرْبِهِ، مُعَافًى فِي جَسَدِهِ، عِنْدَهُ قُوتُ يَوْمِهِ، فَكَأَنَّمَا حِيزَتْ لَهُ الدُّنْيَا»
“যে ব্যক্তি নিরাপদে সকালে উঠল, শরীর সুস্থ, আর দিনের খাবার তার কাছে আছে—সে যেন পুরো দুনিয়া পেয়ে গেল।” — জামে তিরমিযী, হাদীস ২৩৪৬ (হাসান)
৬. দুনিয়ার প্রতি আসক্তির পরিণতি
«فَوَاللَّهِ مَا الْفَقْرَ أَخْشَى عَلَيْكُمْ، وَلَكِنْ أَخْشَى أَنْ تُبْسَطَ عَلَيْكُمُ الدُّنْيَا كَمَا بُسِطَتْ عَلَى مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ، فَتَنَافَسُوهَا كَمَا تَنَافَسُوهَا، فَتُهْلِكَكُمْ كَمَا أَهْلَكَتْهُمْ»
“আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের ওপর দারিদ্র্যের ভয় করি না; বরং ভয় করি—তোমাদের জন্য দুনিয়া প্রশস্ত করে দেওয়া হবে, যেমন পূর্ববর্তীদের জন্য প্রশস্ত করা হয়েছিল। তখন তোমরা দুনিয়ার পেছনে দৌড়াবে, যেমন তারা দৌড়েছিল; ফলে দুনিয়া তোমাদেরও ধ্বংস করবে, যেমন তাদের ধ্বংস করেছিল।” — সহীহ বুখারী, হাদীস ৩১৫৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৯৬১
৭. দুনিয়ার সম্পদ আল্লাহর আমানত
রাসূল ﷺ বলেছেন—
«نِعْمَ الْمَالُ الصَّالِحُ لِلرَّجُلِ الصَّالِحِ»
“সৎ ব্যক্তির জন্য সৎ সম্পদ কতই না উত্তম।” — মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৭৭৬৩ (সহীহ)
অর্থাৎ দুনিয়ার সম্পদ নিন্দনীয় নয়; বরং তা আল্লাহর পথে ব্যবহার করলে তা ইবাদত হিসেবে গণ্য হয়।
ফিকহি ও তাসাউফের দৃষ্টিকোণ (হানাফি কিতাব)
- ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেছেন, দুনিয়ার নিন্দা তার প্রতি ভালোবাসা ও আসক্তির ক্ষেত্রে, দুনিয়ার সম্পদ নিজে নয়। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ১৬৬-এর প্রসঙ্গ)
- মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) «মা'আরিফুল কুরআন»-এ সূরা আলে ইমরানের «زُيِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّهَوَاتِ» আয়াতের তাফসীরে বলেন, দুনিয়ার প্রতি স্বাভাবিক ঝোঁক দোষণীয় নয়; বরং তা-ই দোষণীয় যা আখিরাতকে ভুলিয়ে দেয়।
- হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী (রহ.) «বেহেশতী জেওর»-এ দুনিয়ার মোহ পরিহার ও কনাআত (সন্তুষ্টি) অবলম্বনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
সারসংক্ষেপ
রাসূল ﷺ-এর শিক্ষা হলো—দুনিয়া হলো আখিরাতের শস্যক্ষেত্র; এখানে হালাল উপার্জন, পরিমিত ভোগ, দান-সদকা ও ইবাদতের মাধ্যমে আখিরাতের প্রস্তুতি নিতে হবে। দুনিয়াকে লক্ষ্য বানিয়ে নয়, বরং মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে দুনিয়ার মোহ থেকে হেফাজত করে আখিরাতের প্রস্তুতি নেওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।