নার্সিং পড়াশোনারত ছাত্রীর ঈমানি দুর্বলতা, নামাজে মন না বসা ও পড়াশোনা ছাড়ার সিদ্ধান্ত সম্পর্কীয় পরামর্শ চাই?

Family Life · Ahle Hadith / Salafi

Question No: 7629
Questioner: Sanzida Shanta
Question Asked: 30 Oct 2026, 10:12 PM
Reviewed & Published: 30 Oct 2026, 10:36 PM
Views: 54
Tokens: 5,088
This answer is according to the 'Ahle Hadith / Salafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম। আমার পরিবারে আমার দুই ভাই ছিলো। তাদের মধ্যে একজন মারা গেছেন। অন্য ভাই তার বউ নিয়ে অন্যত্র থাকে। এখন আমার মা চাচ্ছে আমি যেন চাকরি করে তার ভরণপোষণ দেই। আমার বাবা এখন ও জীবিত আছেন। এবং সংসার চালাচ্ছেন। আমি নার্সিং পড়াশোনা শেষ করে ইন্টার্নশিপ শুরু করেছি। বাইরে আসা যাওয়ার কারণে আমার মনে হচ্ছে দিন দিন হেদায়েত হারিয়ে ফেলছি। কোনো ভাবেই এখন সালাতে মন বসে না। নামাজ পড়ার প্রবনতা ও কমে গেছে। আগের মত এখন আর কুরআন পড়তেও ইচ্ছে করে না। আমার আসলে কি করা উচিত। আমি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছি। বুঝতে পারছি না আমার আসলে কি করা উচিত। আমার কি পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া উচিত?? নাকি অন্য কিছু

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করে নিতে চাই: আপনার বাবা জীবিত আছেন এবং সংসার চালাচ্ছেন। ইসলামী শরীয়তে সন্তানদের ভরণপোষণের দায়িত্ব প্রথমত বাবার উপর, মায়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব বাবার উপর। আপনি ইন্টার্নশিপে আছেন, এখনো নিজের আয়-উপার্জন শুরু হয়নি। এই অবস্থায় আপনার মায়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব আপনার উপর বাধ্যতামূলক নয় — বরং তা আপনার বাবার উপর। তবে স্বেচ্ছায় আপনি মাকে সাহায্য করতে পারেন, এটি সদকা ও সিলাতুর রহম হিসেবে গণ্য হবে।

এখন আসল সমস্যা — আপনার ঈমান ও ইবাদতের দুর্বলতা। এটি আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় ইস্যু, পড়াশোনা ছাড়ার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। নিচে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে দিকনির্দেশনা দিচ্ছি।


১. পড়াশোনা ছাড়া ইসলামে নিষিদ্ধ নয় — বরং বৈধ জ্ঞান অর্জন প্রশংসনীয়

নার্সিং একটি বৈধ পেশা, যেখানে মুসলিম নারীদের সেবা করা যায়, বিশেষত মুসলিম মহিলা রোগীদের। শর্ত হলো: পর্দা, নামাজ, হারাম থেকে বেঁচে থাকা। শাইখ ইবন বায (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, নার্সিং বা চিকিৎসা শিক্ষা বৈধ, যদি তাতে হারাম মিশ্রণ না থাকে এবং পর্দার বিধান রক্ষা করা যায়।

তাই শুধু "হেদায়েত হারিয়ে যাচ্ছে" মনে হওয়ার কারণে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া সঠিক সমাধান নয়। বরং সমস্যার মূল কারণ চিহ্নিত করে তা দূর করা প্রয়োজন।


২. ঈমানের দুর্বলতার কারণ ও সমাধান

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

"হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর..." (সূরা আনফাল: ২০)

আরও বলেন:

"নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।" (সূরা আনকাবুত: ৪৫)

আপনার অবস্থার কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ:

ক) পরিবেশ ও সঙ্গ: বাইরে আসা-যাওয়া, মিশ্র পরিবেশ, খারাপ সঙ্গ — এসব ঈমান দুর্বল করে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের উপর থাকে, তাই তোমাদের কেউ যেন লক্ষ্য করে সে কাকে বন্ধু বানায়।" (তিরমিজি: ২৩৭৮, আবু দাউদ: ৪৮৩৩ — শাইখ আলবানী সহীহ বলেছেন)

খ) গুনাহ ও অবহেলা: গুনাহ ঈমানকে দুর্বল করে। ইবনুল কাইয়িম (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, গুনাহ হলো ঈমানের রোগ, আর তাওবা হলো তার ঔষধ।

গ) দুনিয়ার চিন্তা ও দুশ্চিন্তা: মায়ের ভরণপোষণ, ভবিষ্যৎ, ক্যারিয়ার — এসব চিন্তা মনকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।


৩. করণীয় (প্রায়োগিক পদক্ষেপ)

১. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ কখনো ছাড়বেন না। নামাজে মন না বসলেও নামাজ আদায় করুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো নামাজকে তার নির্ধারিত সময়ে আদায় করা।" (বুখারি: ৫২৭, মুসলিম: ৮৫)

শাইখ ইবন উসাইমিন (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, শয়তান মানুষকে "তোমার নামাজ কবুল হচ্ছে না" বলে নামাজ ছাড়াতে প্ররোচিত করে — এটি শয়তানের ধোঁকা। নামাজ আদায় করতে থাকুন, ইনশাআল্লাহ আল্লাহ কবুল করবেন।

২. প্রতিদিন অন্তত কিছু কুরআন তিলাওয়াত করুন — অল্প হলেও। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো তা, যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা অল্প হয়।" (বুখারি: ৬৪৬৪, মুসলিম: ৭৮৩)

৩. দুআ করুন, বিশেষত এই দুআটি:

"ইয়া মুক্বাল্লিবাল কুলুব, সাব্বিত ক্বালবি আলা দ্বীনিক" — হে হৃদয় পরিবর্তনকারী, আমার হৃদয়কে তোমার দ্বীনের উপর অবিচল রাখো। (তিরমিজি: ৩৫২২ — সহীহ)

৪. হারাম পরিবেশ ও মিশ্রণ থেকে দূরে থাকুন। নার্সিং ইন্টার্নশিপে যেখানে সম্ভব পর্দা রক্ষা করুন, পুরুষ রোগীদের সেবা এড়িয়ে চলুন যতটা সম্ভব, এবং সহকর্মীদের সাথে শরীয়তের সীমা রক্ষা করুন।

৫. সালাফদের সাথে সম্পর্ক রাখুন — স্থানীয় মসজিদের আহলে হাদীস/সালাফি উলামা ও দ্বীনি বোনদের সাথে যোগাযোগ রাখুন।

৬. মাকে সাহায্য করুন — তবে বাবার দায়িত্বের কথা স্মরণ করান। আপনি স্বেচ্ছায় মাকে কিছু দিতে পারেন, কিন্তু পড়াশোনা ছেড়ে চাকরিতে ঢুকে মায়ের ভরণপোষণের বোঝা নেওয়া আপনার উপর শরীয়তগত বাধ্যতামূলক নয়। বাবা জীবিত থাকলে মায়ের ভরণপোষণ বাবার দায়িত্ব। আপনি বাবার সাথে কথা বলে বিষয়টি সমাধান করুন।


৪. পড়াশোনা ছাড়া উচিত নয়

শাইখ ইবন বায (রহিমাহুল্লাহ) ও শাইখ ইবন উসাইমিন (রহিমাহুল্লাহ) উভয়েই বলেছেন, বৈধ পেশা শিক্ষা করা জায়েয, যদি দ্বীন রক্ষা করা যায়। আপনার সমস্যা পড়াশোনায় নয় — সমস্যা ঈমানি দুর্বলতায়। তাই পড়াশোনা চালিয়ে যান, পাশাপাশি দ্বীন মজবুত করুন।

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

"আর যারা আমার পথে সংগ্রাম করে, আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথ দেখাব।" (সূরা আনকাবুত: ৬৯)


সারসংক্ষেপ

  • পড়াশোনা ছাড়বেন না — এটি সমাধান নয়, বরং ক্ষতি।
  • নামাজ কখনো ছাড়বেন না — মন না বসলেও আদায় করুন।
  • দুআ, যিকির, কুরআন তিলাওয়াত নিয়মিত করুন, অল্প হলেও।
  • খারাপ সঙ্গ ও মিশ্র পরিবেশ থেকে দূরে থাকুন।
  • মায়ের ভরণপোষণ — বাবার সাথে আলোচনা করুন; আপনি স্বেচ্ছায় সাহায্য করতে পারেন, কিন্তু বাধ্যতামূলক নয়।
  • আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করুন এবং ধৈর্য ধরুন।

আল্লাহ তা'আলা আপনার ঈমানকে মজবুত করুন এবং আপনার পড়াশোনায় বরকত দান করুন। আমিন।


আল্লাহ ভালো জানেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.