কসম করে বিয়ে করার পর তা পূরণ না হলে অন্য কাউকে বিয়ে করা যাবে কি?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে এই বিষয়টির বিস্তারিত উত্তর নিচে প্রদান করা হলো।
সংক্ষিপ্ত উত্তর: হ্যাঁ, আপনি অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারবেন। আপনার সেই কসম (শপথ) পূরণ করা সম্ভব না হলে তা ভঙ্গ করা ছাড়া উপায় নেই। তবে কসম ভঙ্গের কারণে আপনাকে কাফফারা আদায় করতে হবে। আর কসম ভঙ্গ করে অন্যত্র বিবাহ করলে আপনার ওপর "যেনার গুনাহ" বর্তাবে না, বরং এটি শুধুমাত্র একটি কসম ভঙ্গের গুনাহ হবে, যা কাফফারা আদায়ের মাধ্যমে মিটে যাবে।
বিস্তারিত ব্যাখ্যা:
১. কসমের প্রকৃতি ও বিধান: আপনি আল্লাহর নাম নিয়ে যে কসম করেছেন, তা ইসলামে "ইয়ামিন" (শপথ) হিসেবে গণ্য। ইসলামী শরীয়তে কোনো ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট করে বিয়ে করার কসম করা জায়েজ আছে, তবে তা পূরণ করা সম্ভব না হলে বা তাতে কোনো কল্যাণ না থাকলে কসম ভঙ্গ করার অনুমতি রয়েছে। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আল্লাহ তোমাদেরকে পাপের কসমের জন্য পাকড়াও করেন না, কিন্তু তিনি পাকড়াও করেন সেই কসমের জন্য যা তোমরা ইচ্ছাকৃতভাবে করো।" (সূরা আল-মায়িদা: ৮৯)
২. কসম ভঙ্গের কাফফারা: কসম ভঙ্গ করলে কাফফারা হিসেবে নিম্নলিখিত তিনটি কাজের যেকোনো একটি করতে হবে:
- দশজন মিসকিনকে দুই বেলা খাবার খাওয়ানো বা তাদেরকে বস্ত্র দান করা।
- অথবা একজন দাস মুক্ত করা (বর্তমানে অপ্রযোজ্য)।
- যদি উপরোক্ত কোনোটি করার সামর্থ্য না থাকে, তবে তিন দিন রোজা রাখা।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"তোমাদের কসমের কাফফারা হলো: দশজন মিসকিনকে মধ্যম মানের খাবার খাওয়ানো, অথবা তাদেরকে বস্ত্র দান করা, অথবা একজন দাস মুক্ত করা। কিন্তু যে সামর্থ্য না রাখে, তার কাফফারা তিন দিন রোজা রাখা।" (সূরা আল-মায়িদা: ৮৯)
৩. "যেনার গুনাহ হবে" মর্মে কসমের বিধান: আপনি কসমে বলেছেন যে, অন্য কাউকে বিয়ে করলে "সারাজীবন যেনা করার মতো গুনাহ হবে"। ইসলামী শরীয়তে এই ধরনের শর্তযুক্ত কসমকে "ইয়ামিনে লাগভ" বা "ইয়ামিনে গামুস" এর অন্তর্ভুক্ত করা হয় না, বরং এটি একটি সাধারণ কসম। এর অর্থ হলো, আপনি যদি অন্য কাউকে বিয়ে করেন, তাহলে আপনি প্রকৃতপক্ষে যেনা করবেন না; বরং আপনি শুধু আপনার কসম ভঙ্গ করবেন। কসম ভঙ্গের গুনাহ কাফফারা আদায়ের মাধ্যমে দূর হয়ে যায়। সুতরাং, অন্য কাউকে বিয়ে করলে আপনার ওপর যেনার গুনাহ বর্তাবে না।
৪. হানাফী ফিকহের দলিল:
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): কিতাবুল আইমান, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৭০০-এ উল্লেখ আছে যে, কেউ যদি বলে "আমি অমুককে বিয়ে করবো, নইলে আমার ওপর যেনার গুনাহ হবে", তবে এটি একটি কসম। তা ভঙ্গ করলে কাফফারা ওয়াজিব হবে, কিন্তু যেনার গুনাহ হবে না।
- ফাতাওয়া আলমগীরী: কিতাবুল আইমান, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৫০-এ বলা হয়েছে, কসম ভঙ্গ করলে কাফফারা আদায় করতে হবে এবং কসমের শর্ত পূরণ না হলে গুনাহ হবে না।
- বাদায়েউস সানায়ে (ইমাম কাসানী): খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ১০-এ কসমের কাফফারার বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।
৫. করণীয়:
- আপনি আপনার কসম ভঙ্গ করে অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারেন।
- কসম ভঙ্গের কাফফারা হিসেবে দশজন মিসকিনকে দুই বেলা খাবার খাওয়ান অথবা তাদেরকে বস্ত্র দান করুন। যদি সামর্থ্য না থাকে, তবে তিন দিন রোজা রাখুন।
- কাফফারা আদায় করার পর আপনার কোনো গুনাহ থাকবে না এবং নতুন বিবাহ বৈধ হবে।
উপদেশ: ভবিষ্যতে এ ধরনের কসম করা থেকে বিরত থাকুন, কারণ এটি মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তোলে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "যে ব্যক্তি কসম করে এবং তাতে কল্যাণ না দেখে, সে যেন কাফফারা আদায় করে এবং যা কল্যাণকর তা করে।" (সহীহ মুসলিম: ১৬৫০)
আল্লাহ ভালো জানেন।