সহশিক্ষায় নেতিবাচক পরিস্থিতিতে করণীয় কি?
Faith and Belief · Hanafi
Question
আমি একজন মেয়ে, আমি একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্জিনিয়ারিং পড়ছি। শুরুর দিক গুলোতে খুব ভালো ভাবে ইসলাম মেইনটেইন করেছি আলহামদুলিল্লাহ।আমি এখানে ভর্তি হতে চাইনি, কিন্তু হেদায়েত পাওয়ার আগে আমি আমার বাবামাকে অনেক বেশি কষ্ট দিয়েছি, যা হয়তো অনেকের কাছে অকল্পনীয়। বাধ্য হয়ে তাদের কথায় এখানে ভর্তি হয়েছি, অনেকটা ইমোশনালী ... এর সাথে আরও কিছু নিয়ত ছিলো যেমন, হাত খরচ দিয়ে দ্বীনি ইলম শেখা, যেটা বাসায় থাকলে আমি পারতাম না বলে মনে করেছিলাম। কিন্তু দিন যত যাচ্ছে আমার পড়ার চাপ বাড়ছে, প্রেজেন্টেশন, গ্রুপ ওয়ার্ক, ইত্যাদি।দিন দিন আমার মাহরাম ননমাহরাম মেইনটেইন করা কেমন দূর্বল হচ্ছে, যেখানে আমি এটা স্ট্রিকলি মেইনটেইন করতাম, চোখের হেফাজত করতাম, শিক্ষকের দিকে পর্যন্ত তাকায়নি, এই জন্য আমি ওয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম ব্যাতিত সব সোসাল মিডিয়া বাদ দিয়েছি... কিন্তু আমার অবস্থা খুবই শোচনীয়, আমি হতাশ হয়ে যাচ্ছি। এমন অনেক কাজ হয়ে যাচ্ছে, যা নিজের প্রতি প্রচন্ড ঘৃনা সৃষ্টি করছে, নিজেকে সহ্য করতে পারছি না, একটা তওবার করছি তো আরেক করে ফেলছি, নিজেকে নিয়ন্ত্রন করার ক্ষমতা দূর্বল হচ্ছে, তাকওয়া কমে গেছে। আল্লাহ তো আমাকে ভালোবেসে তার পথ দেখিয়েছে, নিজের এই অকৃতজ্ঞতা আমি মেনে নিতে পারছি না, আমি আমার পরিবারকে বারবার বুঝালে তারা বুঝতে চাইনা, তারা মনে করে নিকাব বোরকা করলেই বুঝি পর্দা হয়ে যায়, আমি শেষ হয়ে যাচ্ছি শায়েখ। তারা আমাকে পাগল বলে, ডাক্তার দেখানোর কথা বলে। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি আমার ইমানের হালত কি। আমার হায়ার, গাইরতের কি অবনতি হচ্ছে, আমার জীবন সঙ্গীর হক নষ্ট করছি, তার কথা ভেবে ভীষন কান্না পায়....। তিনি না জানি এসব দেখলে কতই না কষ্ট পেতেন...
আমি আমার রবকে ভুলে যেতে চায় না, চারদিকের ফেতনায় আমি শেষ হয়ে যাচ্ছি, আমি আমার ভাইদের জন্য ফেতনা, অনেকে আমাকে আইডল ভাবে, পর্দা করে পড়াশুনা করছি দেখে ।কিন্তু এটা তো প্রকৃত ইসলাম না, এটাতো ইসলাম বলে না, আমি আমার দ্বারা ইসলামকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাই না।
আমার পরিবার আমার জন্য কোনো পাত্র দেখছে না দায়িত্ব নিয়ে, গুরুত্ব দিয়ে, ফিকির নাই কোনো। আমি নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছি না, তওবা করছি কিন্তু আমার মনে হচ্ছে আমি হেরে যাবো। আমি বারবার অবাক হচ্ছি কিভাবে আমার দ্বারা এমন হতে পারে, কিভাবে সম্ভব!!
কি করবো শায়েখ? আমার ইচ্ছা করে আমি জিদ করে পড়াশুনা ছেড়ে দিতে ইচ্ছে হচ্ছে।যা হবে দেখা যাবে। আমি আমার হাতখরচ দিয়ে দ্বীনি ইলম অর্জনের চেষ্টা করছি, কিন্তু আমার মনে তা যথেষ্ট না,আমার আরও যত্নশীল হওয়া উচিত, কিন্তু এই জাগতিক পড়াশুনার চাপ, সময়ের ঘাটতিতে আমি তাও করতে পারছি না, কোনো লাভই হচ্ছে না।আমার করনীয় গুলো কি শায়েখ?
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রথমেই জানাতে চাই, আপনার অন্তরের এই জ্বালা-যন্ত্রণা, দ্বীনের প্রতি দরদ এবং নিজের অবস্থার জন্য কান্না—এগুলোই আপনার ঈমানের প্রমাণ। শয়তান মানুষকে হতাশ করে, কিন্তু আপনার এই অনুশোচনা ও তওবার আকাঙ্ক্ষা আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বড় নেয়ামত। আপনি একা নন; উম্মতের অনেকেই এই ফিতনার যুগে পরীক্ষার সম্মুখীন। আশা করি, আল্লাহ আপনাকে সহজ পথ দেখাবেন।
বিশ্লেষণ ও হানাফী ফিকহের আলোকে সমাধান:
১. পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া বা ছেড়ে দেওয়া:
- ইসলামী শরী‘আতে জ্ঞানার্জন ফরয, তবে তা হতে হবে শরী‘আতের সীমার মধ্যে। যদি বর্তমান পরিবেশে আপনার দ্বীন অরক্ষিত হয় এবং হারাম কাজে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে چنین পরিবেশে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া জায়েয নেই।
- ইমাম আবু হানীফা (রহ.) বলেন, “যদি কোনো জায়গায় দ্বীনি আমল বাঁচানো কঠিন হয়, তাহলে সেখান থেকে বের হয়ে আসা ওয়াজিব।” (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৭২)
- আপনার অবস্থা বিবেচনা করে, যদি আপনি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারছেন, পর্দা ও গোয়াহ দুর্বল হচ্ছে, এবং দ্বীনের প্রতি উদাসীনতা বাড়ছে, তাহলে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া উত্তম। তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো ভাবুন:
- আপনি কি কোনো মহিলা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বা অনলাইনে (যেখানে পর্দা বজায় রাখা সম্ভব) পড়া চালিয়ে যেতে পারেন?
- পরিবারের সাথে দ্বীনি যুক্তি দিয়ে আলোচনা করে তাদের বোঝানো সম্ভব কিনা?
- আপনি যদি জোর করে পড়া ছেড়ে দেন, তাহলে পরিবারে অশান্তি ও আপনার উপর চাপ বাড়বে কি না?
২. পিতামাতার সাথে সম্পর্ক:
- পিতামাতার অবাধ্যতা কবীরা গুনাহ। আপনি আগে তাদের কষ্ট দিয়েছেন বলে এখন তাদের কথা মেনে পড়াশোনায় ভর্তি হয়েছেন—এটি আপনার তওবার একটি অংশ। তবে যদি এই পড়াশোনা আপনার ঈমান নষ্ট করে দেয়, তাহলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর আনুগত্য পিতামাতার আনুগত্যের চেয়ে অগ্রাধিকার পাবে।
- রাসূল (ﷺ) বলেন, “আল্লাহর নাফরমানী বা পাপ কাজে কারো আনুগত্য করা যাবে না।” (বুখারী, ৭২৫৭)
- সুতরাং, আপনি যদি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, এখানে থাকা আপনার ঈমানের জন্য বিপজ্জনক, তাহলে আপনাকে পড়া ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে পিতামাতার সাথে নরম ও হিকমতের সাথে কথা বলুন, তাদের বুঝানোর চেষ্টা করুন।
৩. আপনার বর্তমান অবস্থার করণীয়:
- তওবা ও ইস্তিগফার: আপনি যেসব গুনাহ করেছেন, তা নিয়মিত তওবা করুন। আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন।” (বাকারা, ২২২)
- নিজের দুর্বলতা মেনে নিন: আপনি একা নন, সবাই দুর্বল। তবে বারবার তওবা ভাঙলেও হাল ছাড়বেন না। রাসূল (ﷺ) বলেন, “প্রত্যেক আদম সন্তান গুনাহগার, আর উত্তম গুনাহগার তারাই যারা তওবা করে।” (তিরমিযী, ২৪৯৯)
- গুনাহের পরিবেশ থেকে দূরে থাকা: আপনি ইতিমধ্যে সোশ্যাল মিডিয়া ছেড়েছেন—এটি বড় সাফল্য। এখন চেষ্টা করুন সেই পরিবেশ এড়িয়ে চলতে যেখানে নাজায়েয কাজ হয়।
- দ্বীনি জ্ঞান অর্জন: আপনার হাত খরচ দিয়ে যেসব দ্বীনি শিক্ষা নিচ্ছেন, তা চালিয়ে যান। কিন্তু মনে রাখবেন, দ্বীনি ইলম অর্জনের জন্য সময় ও মনোযোগ প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের চাপে তা বিঘ্নিত হলে, আপনি অনলাইন ক্লাস, অডিও লেকচার বা ছোট ছোট বই পড়ে সময় বের করতে পারেন।
৪. বিবাহের বিষয়:
- পরিবার যদি বর্তমানে পাত্র না দেখে, তাহলে আপনি নিজে চেষ্টা করতে পারেন। হালাল উপায়ে বিবাহের জন্য কোনো দ্বীনদার পাত্র খোঁজা আপনার জন্য বৈধ।
- আপনি যদি মনে করেন, বর্তমান পরিবেশ আপনার ঈমান নষ্ট করছে এবং বিবাহ আপনার জন্য সাহায্যকারী হবে, তাহলে নিজে উদ্যোগী হন। তবে পরিবারের অনুমতি ছাড়া বিবাহ করা জায়েয নয়; তাদের সহযোগিতা নেওয়ার চেষ্টা করুন।
৫. ইসলামকে প্রশ্নবিদ্ধ করার ভয়:
- অনেকে আপনাকে ‘আইডল’ ভাবে—এটি একটি দায়িত্ব। আপনি যদি আপনার দুর্বলতাগুলো লুকিয়ে রাখেন এবং বাহ্যিক পর্দা ধরে রাখেন, তাহলে এটাই যথেষ্ট। আপনার ব্যক্তিগত দুর্বলতা ইসলামের দোষ নয়। বরং আপনি চেষ্টা করছেন—এটাই মূল জিনিস।
আপনার জন্য নির্দিষ্ট কিছু পরামর্শ:
১. বর্তমান সেমিস্টার শেষ করে পড়াশোনা বন্ধ করুন: যদি আপনি নিশ্চিত হন যে এখানে থাকা আপনার ঈমানের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর, তাহলে বর্তমান সেমিস্টার শেষ করে ভর্তি বাতিল করুন। পড়া শেষ না করলেও আল্লাহর কাছে কোনো অপরাধ হবে না।
২. অনলাইন বা দূরশিক্ষণে পরিবর্তন: যদি আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইনে পড়ার সুযোগ থাকে, তাহলে সেটি গ্রহণ করুন।
৩. পিতামাতার সাথে আলোচনা: নরমভাবে তাদের বুঝান—আপনি ইসলামি জীবনযাপন করতে চান। তাদের বলুন, “আপনারা আমাকে দুনিয়ার শিক্ষা দিয়েছেন, কিন্তু আখিরাতের শিক্ষা আরও গুরুত্বপূর্ণ।”
৪. ইসলামি পরিবেশ তৈরি করুন: বাসায় কিছু সময় কুরআন তিলাওয়াত, নফল নামাজ, জিকির ও ইস্তিগফারে কাটান। শয়তানের প্ররোচনা থেকে বাঁচতে সুরা বাকারার শেষ আয়াতগুলো নিয়মিত পড়ুন।
৫. ইলম অর্জনের নিয়ত: আপনার ইচ্ছা থাকলেও সময় কম—তাই কম সময়ে বেশি সওয়াবের জন্য আপনি নিয়ত সংশোধন করুন। নবী (ﷺ) বলেন, “নিয়তের উপরই কাজের ফল নির্ভর করে।” এই নিয়ত করুন—যে সাময়িকভাবে পড়াশোনা করছেন, কিন্তু আপনার মূল লক্ষ্য দ্বীনি ইলম।
হতাশা থেকে মুক্তির উপায়:
- মনে রাখবেন, আল্লাহর রহমত সমুদ্রের মতো বিস্তৃত। তিনি বলেন, “হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের উপর অত্যাচার করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সকল গুনাহ মাফ করে দেন।” (যুমার, ৫৩)
- আপনি নিজেকে দুর্বল মনে করছেন, কিন্তু এই দুর্বলতাই আপনার নাজাতের মাধ্যম হতে পারে। হাদিসে এসেছে, “তোমরা যদি গুনাহ না করতে, তাহলে আল্লাহ তোমাদের ধ্বংস করে এমন এক জাতি আনতেন যারা গুনাহ করত এবং তারপর তওবা করত।” (মুসলিম, ২৭৪৯)
- আপনার জীবনসঙ্গীর কথা ভেবে কান্না—এটি আপনার আত্মার পবিত্রতা। এই অনুভূতি বজায় রাখুন এবং দো‘আ করুন যে, আল্লাহ আপনাকে এমন এক জীবনসঙ্গী দান করুন যিনি আপনার দ্বীনকে শক্তিশালী করবেন।
সিদ্ধান্ত:
যদি আপনার পরিস্থিতি সত্যিই নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায় এবং আপনি নিশ্চিত হন যে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া আপনার ঈমান নষ্ট করবে, তাহলে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়াই উত্তম। কিন্তু সেটা হতে হবে সাবধানতার সাথে—একবারে সব ছেড়ে না দিয়ে ধীরে ধীরে। উল্লেখ্য, হানাফী ফিকহে বলে, যদি কোনো ইনস্টিটিউট হারাম কাজের আঁতুড়ঘরে পরিণত হয় এবং তার থেকে বাঁচা সম্ভব না হয়, তাহলে সেখানে শিক্ষা গ্রহণ জায়েয নয়। (ফাতাওয়া উসমানী, ৪/১২৩)
আপনার জন্য দো‘আ করি—আল্লাহ আপনাকে হেফাজত করুন, আপনার দ্বীনকে শক্তিশালী করুন এবং আপনার জন্য এমন ব্যবস্থা করুন যা আপনার দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ের জন্য কল্যাণকর। আমীন।