ব্যবসা বা ব্যাক্তির অন্য কাজের জন্য টাকা বিনিয়োগ করে লাভের ৪৫% নেওয়া কি

Sunnah and Bid'ah · Hanafi

Question No: 7651
Questioner: Papry Rahman
Question Asked: 31 Oct 2026, 02:10 PM
Reviewed & Published: 31 Oct 2026, 04:03 PM
Views: 17
Tokens: 4,578
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমি একজন ব্যক্তিকে কিছু টাকা দিতে চাই। সে আমার টাকা কাজে লাগাবে এবং ৩–৪ দিন পর সেই টাকা থেকে যতটুকু প্রকৃত লাভ হবে, তার ৪৫% আমাকে দেবে। তবে সে ঠিক কী কাজে বা কীভাবে টাকাটি ব্যবহার করবে, তা আমি জানি না। এভাবে লাভের অংশ নেওয়া কি ইসলামের শরিয়ত অনুযায়ী জায়েজ ও হালাল হবে? টাকা দেওয়ার আগে আমার কী কী বিষয় নিশ্চিত হওয়া জরুরি?

Answer

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।

একজন ব্যক্তিকে টাকা দেওয়া এবং সে তা ব্যবসা বা কাজে লাগিয়ে অর্জিত প্রকৃত লাভের ৪৫% আপনাকে দেওয়ার এই লেনদেনটি ইসলামী ফিকহের পরিভাষায় 'মুদারাবা' (المضاربة - মূলধন ও শ্রমের যৌথ কারবার) চুক্তির অন্তর্ভুক্ত।

আপনার প্রশ্ন ও উদ্ভূত পরিস্থিতির ফিকহী সিদ্ধান্ত এবং টাকা দেওয়ার আগে নিশ্চিত হওয়ার মতো আবশ্যিক বিষয়গুলো ফাতাওয়া ও ফিকহের প্রামাণ্য কিতাবসমূহের আলোকে ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:


১. সরাসরি শরঈ সিদ্ধান্ত:

টাকাটি কী কাজে বা কীভাবে ব্যবহার করা হবে তা না জেনে অন্ধভাবে টাকা দেওয়া এবং তা থেকে লাভ গ্রহণ করা শরী'আতের দৃষ্টিতে ঝুঁকিপূর্ণ ও অনুচিত।

যদি ব্যবসাটি হালাল হয়, লাভ অর্জিত প্রকৃত লাভের ৪৫% (শতকরা হার) হয় এবং লোকসানের ঝুঁকি মূলধনদাতা হিসেবে আপনার ওপর থাকে, তবে লাভ নেওয়া সম্পূর্ণ হালাল হবে। কিন্তু ব্যবসা বা কাজের মাধ্যম না জেনে টাকা দিলে তাতে হারাম কারবার, সুদ, জুয়া বা প্রতারণামূলক কাজে জড়িয়ে পড়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে, যা আপনার উপার্জনকেও হারাম করে তুলতে পারে।


২. টাকা দেওয়ার পূর্বে আপনার যে ৪টি বিষয় নিশ্চিত হওয়া আবশ্যিক (ওয়াজিব):

১. ব্যবসা ও টাকা ব্যবহারের মাধ্যম শতভাগ হালাল হওয়া:

  • বিধান: টাকা প্রদান করার পূর্বে ব্যক্তিটি আপনার টাকা দিয়ে ঠিক কী কেনাবেচা বা ব্যবসা করবে, তা নিশ্চিত হওয়া আবশ্যক। ব্যবসাটি যদি শরীআতসম্মত ও হালাল হয় (যেমন: বৈধ পণ্য কেনাবেচা), তবেই লেনদেন বৈধ হবে। কিন্তু ব্যবসাটি যদি হারাম বা সন্দেহজনক হয় (যেমন: সুদী লেনদেন, জুয়া, এমএলএম, ফরেক্স স্পেকুলেশন বা অবৈধ কোনো কারবার), তবে সেই কারবারে টাকা দেওয়া এবং তা থেকে লাভ গ্রহণ করা সম্পূর্ণ হারাম ও গোনাহের কাজ হবে।
  • সংযুক্ত কিতাবের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):
    • ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (১৬শ খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৮৯–১৯০ (অধ্যায়: 'বাব মাইয়াতাআল্লাহু বিল হিসাস / কারবারে অংশীদারিত্ব — মূল ব্যবসা হালাল হওয়ার আবশ্যকতা সংক্রান্ত ফতোয়া') ।
    • দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা: ২৪০–২৪২ (অধ্যায়: 'অনৈতিক ও হারাম কারবারে অর্থ বিনিয়োগের ফিকহী হুকুম')।

২. লাভের অংশ প্রকৃত নিট লাভের শতকরা হার হওয়া:

  • বিধান: আপনার প্রশ্নে উল্লিখিত— "প্রকৃত লাভ যতটুকু হবে তার ৪৫%"—এই শর্তটি ফিকহের বিচারে সঠিক ও নিয়মানুগ। তবে শর্ত হলো, এই ৪৫% যেন অর্জিত প্রকৃত নিট লাভের ওপর হয়। যদি মূলধনের (টাকার) ওপর শতকরা হিসাব করা হয় কিংবা নির্দিষ্ট কোনো অঙ্কের টাকা (যেমন: প্রতিদিন ১০০০ টাকা) দেওয়ার চুক্তি করা হয়, তবে তা সরাসরি সুদে পরিণত হবে এবং চুক্তিটি বাতিল (ফাসিদ) হয়ে যাবে।
  • সংযুক্ত কিতাবের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):
    • ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (১৪শ খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৮৭–১৮৮ (অধ্যায়: 'কিতাবুশ শিরকাতি ওয়াল মুদারাবাহ — মুদারাবার মধ্যে লাভের অংশ নির্দিষ্ট শতকরা বা হারে হওয়া')।
    • ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (৪র্থ খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১২৪–১২৫ (অধ্যায়: 'যৌথ মালিকানা ও ব্যবসা-বাণিজ্য — লাভ বন্টনের ফিকহী শর্তাবলী')।

৩. লোকসানের দায়ভার ও ঝুঁকি গ্রহণ করা:

  • বিধান: মুদারাবা কারবারের শরঈ নিয়ম হলো— ব্যবসায় যদি স্বাভাবিক কোনো আর্থিক ক্ষতি বা লোকসান হয় (এবং তাতে ওই ব্যক্তির কোনো অবহেলা বা খেয়ানত না থাকে), তবে সমুদয় আর্থিক লোকসান মূলধনদাতা হিসেবে আপনাকে বহন করতে হবে; আর ওই ব্যক্তি তার শ্রম ও সময়ের লোকসান বহন করবে। যদি চুক্তি করা হয় যে— "লোকসান হলেও আসল টাকা ফেরত দিতে হবে" বা "লোকসান সে বহন করবে", তবে চুক্তিটি শরী'আতের দৃষ্টিতে ফাসিদ (নাজায়েয) হয়ে যাবে।
  • সংযুক্ত কিতাবের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):
    • ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (১৪শ খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৮৩–১৮৪ (অধ্যায়: 'কিতাবুশ শিরকাতি ওয়াল মুদারাবাহ — মুদারাবার লোকসান কেবল মূলধনদাতা বহন করা এবং লোকসান শ্রমিকের ওপর চাপানোর নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত ফতোয়া')।
    • ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (৪র্থ খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৫২–১৫৩ (অধ্যায়: 'শিরকাতুল ইনান ও মুদারাবা — লোকসান ও দায়ের ফিকহী বিধান')।

৪. ধোঁকা, অনিশ্চয়তা (গরর) ও অস্পষ্টতা দূর করা:

  • বিধান: ৩–৪ দিনের স্বল্পমেয়াদে টাকা খাটিয়ে কীভাবে লাভ আসছে, তা স্পষ্ট ও স্বচ্ছ হওয়া দরকার। কোনো প্রকার ধোঁকা বা ফটকাবাজি (গরর) থাকলে সে কারবার শরীআতে নিষিদ্ধ ।
  • সংযুক্ত কিতাবের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):
    • দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ৩০৬–৩০৮ (অধ্যায়: 'ধোঁকা, অনিশ্চয়তা ও ঝুকিমুক্ত ব্যবসার ফিকহী মূলনীতি')।

৩. আপনার জন্য চূড়ান্ত পরামর্শ:

টাকা হস্তান্তর করার আগেই উক্ত ব্যক্তির কাছ থেকে স্পষ্ট জেনে নিন সে টাকা দিয়ে ঠিক কী কাজ করবে।

যদি নিশ্চিত হন যে— ১. ব্যবসাটি শতভাগ হালাল, ২. ৪৫% লাভ কেবল প্রকৃত অর্জিত নিট লাভের অংশ, এবং ৩. প্রকৃত লোকসান হলে তা আপনার মূলধন থেকে কাটা যাবে—

তবেই তাকে টাকা দেওয়া এবং তা থেকে লাভের অংশ নেওয়া আপনার জন্য হালাল ও বৈধ হবে। অন্যথায় ব্যবসা না জেনে টাকা দেওয়া থেকে বিরত থাকাই ঈমান ও হালাল উপার্জনের জন্য অপরিহার্য।


আল্লাহ সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.