চাকরি ও পর্দা, স্বামীর হক, হালাল-হারাম ও ওয়াসওয়াসা নিয়ে ইসলামি দিকনির্দেশনা জানতে চাই?
Business and Job · Hanafi
Question
কাজ করে কিন্তু আব্বুর financial সমস্যা চলছে .তাদের ইনকাম হালাল হারাম নিয়ে চিন্তায় তাই চাকরিতে যোগ দেওয়া! কি করণীয় আমার?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
আপনার চাকরি করা নিজে থেকে হারাম নয়; বরং প্রয়োজন ও শরীয়তের সীমা রক্ষা করে হালাল উপায়ে উপার্জন করা জায়েয, বরং অনেক ক্ষেত্রে প্রশংসনীয়। তবে যে বিষয়গুলোতে আপনার ওয়াসওয়াসা ও দ্বিধা তৈরি হচ্ছে, সেগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করা দরকার:
-
চাকরির পরিবেশ ও পর্দা:
একই প্রতিষ্ঠানে পুরুষ-মহিলা উভয়ের কর্মস্থল থাকা নিজে থেকে নিষিদ্ধ নয়। নিষিদ্ধ হলো—নিরিবিলি মেলা-মেশা, দৃষ্টি অবনত না করা, কোমল কণ্ঠে কথা বলা, নির্জনে (খালওয়া) মিলিত হওয়া ইত্যাদি। যদি আপনার শিফট আলাদা হয়, হুজুর ও মিসদের সঙ্গে কাজের প্রয়োজনে শরীয়তসম্মত পর্দা ও শালীনতা রক্ষা হয়, তাহলে এ কারণে চাকরি ছাড়া আবশ্যক নয়।
কুরআনে আছে:“মুমিন নারীদের বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত করে এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করে…” (সূরা আন-নূর: ৩০–৩১)
আরও আছে:
“তোমরা নিজেদের ঘরে অবস্থান করো এবং প্রাচীন জাহেলিয়াতের মতো সাজসজ্জা প্রদর্শন করো না…” (সূরা আল-আহযাব: ৩৩)
তবে এ আয়াত বিশেষ প্রেক্ষাপটে নাজিল হলেও এর মূল শিক্ষা হলো—নারীকে পর্দা, শালীনতা ও ফিতনা এড়িয়ে চলতে হবে।
হাদিসে রাসূল ﷺ বলেছেন:
“নারীদের সঙ্গে নির্জনে মিলিত হয়ো না।” (সহীহ বুখারী: ৫২৩৩; সহীহ মুসলিম: ১৩৪১)
অন্য হাদিসে:
“যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনে বিশ্বাস রাখে, সে যেন কোনো নারীর সঙ্গে নির্জনে না বসে; কেননা তাদের তৃতীয়জন হবে শয়তান।” (মুসনাদ আহমাদ: ২২৩৪; তিরমিজি: ১১৭১)
সুতরাং খালওয়া ও বেপর্দা মেলামেশা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা আপনার জন্য আবশ্যক। শিফট আলাদা থাকলেও কাজের প্রয়োজনে দেখা-সাক্ষাৎ হলে পর্দা, দৃষ্টি সংযত রাখা ও সংক্ষিপ্ত-শালীন কথাবার্তার বিধান মানতে হবে। -
স্বামীর হক ও সময়:
স্বামী প্রবাসে থাকলে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ, তাঁর অনুমতি ও সন্তুষ্টি রক্ষা করা জরুরি। ইসলামে স্ত্রীর ওপর স্বামীর হক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসূল ﷺ বলেছেন:“স্ত্রী যদি স্বামীর ঘরে থাকা অবস্থায় তাঁর অনুমতি ছাড়া (নফল) রোজা রাখে, তবে তা গ্রহণযোগ্য নয়…” (সহীহ বুখারী: ৫১৯৫)
এটি প্রমাণ করে স্বামীর অনুমতি ও সন্তুষ্টির গুরুত্ব।
তবে চাকরি করার কারণে স্বামীকে সময় দিতে না পারা যদি বাস্তব সমস্যা হয়, তাহলে সমাধান হলো—সময় ব্যবস্থাপনা, ছুটির দিনে যোগাযোগ, প্রয়োজনে চাকরির সময় কমিয়ে নেওয়া বা স্বামীর সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া। স্বামীর অনুমতি ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে বাইরে চাকরি করা থেকে বিরত থাকা উত্তম, বিশেষত যদি তাঁর হক নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
হাদিসে আছে:
“তোমরা নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো…” (সহীহ মুসলিম: ১৪৬৮)
এবং স্ত্রীর ওপর স্বামীর আনুগত্য ও সদাচরণের গুরুত্ব বহু হাদিসে বর্ণিত। -
হালাল-হারাম ও আর্থিক সংকট:
আব্বু-হাসব্যান্ড কাজ করলেও আর্থিক সংকট চলছে—এ কারণে চাকরিতে যোগ দেওয়া নিজে থেকে গুনাহ নয়। হালাল উপায়ে উপার্জন করা ফরজ পর্যায়ের দায়িত্ব। কুরআনে আছে:“তোমরা হালাল ও পবিত্র বস্তু থেকে আহার করো…” (সূরা আল-বাকারা: ১৬৮)
আরও আছে:
“আল্লাহ তোমাদের জন্য যা হালাল করেছেন, তা কেন হারাম করছ?” (সূরা আল-মায়িদা: ৮৭)
হাদিসে রাসূল ﷺ বলেছেন:
“হালাল সুস্পষ্ট এবং হারামও সুস্পষ্ট; আর এ দুয়ের মাঝে অনেক সন্দেহজনক বিষয় আছে…” (সহীহ বুখারী: ৫২; সহীহ মুসলিম: ১৫৯৯)
সুতরাং সন্দেহজনক বিষয় এড়িয়ে চলুন, কিন্তু ওয়াসওয়াসায় পড়ে হালাল চাকরিকে হারাম ভাববেন না।
ইমাম ইবন আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ ওয়াসওয়াসা সম্পর্কে বলেন, শয়তানের ওয়াসওয়াসা দ্বীনের সন্দেহ সৃষ্টি করে; এতে পড়ে ইবাদত-কর্ম বন্ধ করা ঠিক নয়। (রাদ্দুল মুহতার: ১/১৩০-এর কাছাকাছি আলোচনা)
মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) «বেহেশতী জেওর»-এ নারীদের পর্দা ও স্বামীর হক সম্পর্কে গুরুত্বারোপ করেছেন এবং শরীয়তের সীমা রক্ষা করে প্রয়োজনীয় কাজ করার অনুমতি দিয়েছেন।
করণীয় (বাস্তব পরামর্শ):
- স্বামীর সঙ্গে খোলাখুলি পরামর্শ করুন। তাঁর অনুমতি ও সন্তুষ্টি নিয়ে চাকরি চালান। প্রবাসে থাকলেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখুন; ছুটিতে তাঁর হক পূরণ করুন।
- কর্মক্ষেত্রে পর্দা কঠোরভাবে মানুন: নির্জনে কোনো পুরুষের সঙ্গে দেখা নয়, অপ্রয়োজনীয় কথা নয়, দৃষ্টি সংযত, শালীন পোশাক ও ওড়না।
- শিফট আলাদা থাকলে কাজের সময় এমনভাবে সাজান যেন পুরুষদের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় মেলামেশা না হয়; প্রয়োজনে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলুন।
- ওয়াসওয়াসা দূর করতে: সন্দেহ হলে নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ নিন; প্রতিবার সন্দেহে চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেবেন না। ওয়াসওয়াসা শয়তানের প্ররোচনা; আল্লাহর ওপর ভরসা করুন এবং যিকির বাড়ান।
- আর্থিক সংকটে বৈধ উপায়ে উপার্জন চালিয়ে যান; তবে পরিবারের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যয় কমিয়ে আনার চেষ্টা করুন।
- যদি চাকরির কারণে স্বামীর হক স্পষ্টভাবে নষ্ট হয় বা পর্দা রক্ষা করা সম্ভব না হয়, তাহলে চাকরি পরিবর্তন বা সময় কমানোর কথা ভাবুন; তবে শুধু ওয়াসওয়াসার কারণে নয়।
উপরোক্ত আলোচনার সারমর্ম:
আপনার চাকরি নিজে থেকে নাজায়েয নয়; বরং হালাল উপার্জন ও পরিবারকে সহায়তা করা ভালো কাজ। কিন্তু পর্দা, স্বামীর হক ও সন্দেহজনক বিষয় এড়ানো আবশ্যক। এগুলো রক্ষা করে চালিয়ে যান; যদি রক্ষা করা সম্ভব না হয়, তাহলে স্বামীর সঙ্গে পরামর্শ করে বিকল্প ব্যবস্থা নিন। আল্লাহ তাওফিক দিন।
والله أعلم بالصواب